kalerkantho

অন্য কোনোখানে

বর্ণিল ঘুড়ি উত্সবে

আতিফ আতাউর   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বর্ণিল ঘুড়ি উত্সবে

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

একপাশে সবুজ ঝাউবন, অন্যদিকে দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র। মাঝখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত। যেন আকাশ নেমে এসেছে এখানে। সেই আকাশে উড়ে বেড়াল নানা আকৃতির রংবেরঙের বাহারি সব ঘুড়ি। দিনের শেষে রাতের কালো আকাশও ঝলমলিয়ে ওঠে ফানুসের আলোয়! কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের এমন বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জাতীয় ঘুড়ি উত্সব ২০১৯। শহুরে জীবনের বেড়াজাল ভেঙে নানা বয়সের শত শত ঘুড়িপ্রেমী জড়ো হয়েছিলেন সেখানে। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল স্থানীয় লোকজন ও ঘুরতে আসা পর্যটকরা।

উত্সব উপলক্ষে আগে থেকেই সাজানো ছিল সুগন্ধা সমুদ্রসৈকত। একপাশে আগত অতিথিদের জন্য বসার মঞ্চ। সম্মুখে বিশাল একটি জায়গা দড়ি দিয়ে ঘেরা। এখানেই ওড়ানো হবে ঘুড়ি। জায়গাটিতে ঢোকার গেট ২৫ ফুট দীর্ঘ বিরাট টেরাকোটা টেপা পুতুল দিয়ে সাজানো। তার দুই পাশে বিশালাকৃতির ভয়ংকর ড্রাগন। যেন গেটের সতর্ক প্রহরী!

ছুটির দিন বলে সৈকতে ছিল ভ্রমণপিপাসুদের উপচেপড়া ভিড়। ঘুরতে এসে দুই থেকে শুরু করে দুই শ ফুট লম্বা একেকটি ঘুড়ি দেখে একসঙ্গে দুইটি উপলক্ষ মিলে যায় তাদের। ঘুড়িগুলো দেখতে যেমন বাহারি, তেমনি তার নাম—বেসাতি, ড্রাগন, ডেল্টা, বহুবিধ বক্স, মাছরাঙা, ইগল, ডলফিন, অক্টোপাস, সাপ, ব্যাঙ, মৌচাক, কামরাঙা, গুবরেপোকা, আগুনপাখি, প্যাঁচা, ফিনিক্স, জেমিনি, চরকি, পালতোলা নৌকা, সাইকেল, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুকুর, হাতি, ফুটবলসহ আরো কত কী!

এমন আয়োজন দেখে সবার চোখেমুখে তখন একটাই জিজ্ঞাসা, কখব উড়বে ঘুড়ি? দুপুর ২টা ৩০ মিনিটের পর শুরু হয় ঘুড়ি উড়ানোর তোড়জোড়। বিশালাকৃতির একটি ঘুড়ি মাটিতে শোয়ানো। সেটি আকাশে উড়াতে ঝাউগাছে বাঁধা কপিকলের দড়ি টানতে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে যান স্বেচ্ছাসেবকরা। দেখে সবার চক্ষুচড়কগাছ! ততক্ষণে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল। তারপরই ঘুড়িপ্রেমীদের ঘুড়ি নিয়ে কাড়াকাড়ি! যেন এক প্রতিযোগিতা—কে কার আগে আকাশে ঘুড়ি উড়াবে। ঘুড়ি নেওয়ার জন্য লাইন বেঁধে নাম নিবন্ধনের জন্য দাঁড়িয়ে যান সবাই। এর খানিক পরেই সৈকতে আসা সবার চোখ সমুদ্র থেকে আকাশে। নীল আকাশ তখন আর শুধু নীল নেই, শত শত রংবেরঙের ঘুড়ির রঙে বর্ণিল হয়ে উঠেছে। পাঁচ বছরের মারিয়া ইসলাম ঘুড়ি নিয়ে বালুর মধ্যে দৌড়াচ্ছিল। হঠাত্ শুনতে পেল, বাঘের ছানা নাচছে। ঘুড়ির নাটাই অন্যের হাতে দিয়েই দে ছুট সে। ততক্ষণে উত্সব প্রাঙ্গণের এক জায়গায় শুরু হয়েছে বাংলার বাঘ ছানার নৃত্য। সত্যিকারের বাঘের ছানা না হলেও তাতে আনন্দে কমতি হয়নি দর্শনার্থীদের।

সন্ধ্যা নামতেই শীতে সৈকতে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করে। অনেকের গায়ে শীতের কাপড় না থাকলেও ফানুস জ্বলার আগুনেই উবে যায় শীত। একে একে ফানুস উড়তে শুরু করে। শত শত ফানুসে ছেয়ে যায় সৈকতের রাতের আকাশ। সেগুলো আরেকটু ওপরে উঠে গেলে মনে হয়, দূর আকাশের রাতের তারা নেমে এসেছে অনেক নিচে। ফানুস মিলিয়ে যেতে না যেতেই শুরু হয় আলো অলঙ্কৃত ঘুড়ি উড্ডয়ন। সেগুলো উপরে উঠে যেতেই মনে হয়, যেন রঙিন তারা ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। একটু পরই প্রথম দিনের উত্সবের রেশ টানা হয়। পরদিনও থাকছে আরো চমক—আয়োজকদের এমন ঘোষণায় দর্শনার্থীরা উল্লাস ধ্বনি দিয়ে ওঠে।

পরদিন সকালে উত্সব শুরু হয় সমুদ্রসৈকতে জলক্রীড়া দিয়ে। তারপর ঘুড়ি কাটাকাটি প্রতিযোগিতা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঘুড়ি প্রতিযোগীরা লড়েন একে অন্যের বিরুদ্ধে। বিজয়ী দুই প্রতিযোগী জিতে নেন ২০ এপ্রিল থেকে চীনের ওয়েফাংয়ে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উত্সবে অংশগ্রহণের সুযোগ।

এদিনও রংবেরঙের ঘুড়িতে ছেয়ে যায় আকাশ। বিকেলে শুরু হয় বাঘছানার নৃত্য। সন্ধ্যায় শুরু হয় আলোকময় ঘুড়ি ও মঙ্গল প্রদীপে আলপনা। শেষদিন বলেই একটু বলে-কয়েই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানলেন আয়োজকরা। তার রেশ পাওয়া গেল অনেক দূর থেকেও। পুরাণ ঢাকার বাবর আলীর সমন্বয়ে এদিন রাতে কক্সবাজারের আকাশ ছেয়ে যায় আতশবাজির ছটায়। দুদিনব্যাপী এই উত্সবের আয়োজন করে বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারেশন। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর আরো জমকালোভাবে জাতীয় ঘুড়ি উত্সব উদ্যাপনের ঘোষণা দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মৃধা বেনু।

মন্তব্য