kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

আপনার শিশু

অভিভাবক মনে রাখুন

মেরীনা চৌধুরী   

৮ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অভিভাবক

মনে রাখুন

সব অভিভাবক সন্তানকে অবলম্বন করেই বেঁচে থাকেন। প্রত্যেকেই চান, তাঁর সন্তান সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক। এর জন্য অভিভাবকদেরও কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে।

 

ভালো অভিভাবক হোন

একটি সন্তানের জন্য প্রয়োজন এক পথপ্রদর্শক। মা-বাবাই সেই পথপ্রদর্শক। ছোট থেকে সন্তানের সঙ্গে আচার-আচরণ সংযত করে তাদের সঙ্গে এমন কথা বলা উচিত, যা তাদের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে। বয়স অনুযায়ী কথা বলা, যাতে মা-বাবা কী বোঝাতে চাইছেন, তা বুঝতে পারে। অভিভাবকের কাজ হলো সীমাবদ্ধতা, আদব-কায়দা, নিয়ম-নীতি ও সংস্কার শেখানো।

 

শৃঙ্খলা বজায় রাখা

এক গবেষক তাঁর চার বছরের বাচ্চা সম্পর্কে বলেন, ‘যখন আমি তার ব্যবহার অপছন্দ করি, তখন তাকে বলি—আমি তোমার এখনকার আচরণ পছন্দ করছি না। তখন সে শান্ত হয়ে আসে ও ক্ষমা চায়। এভাবে বকাবকি না করে তাকে বুঝতে দিতে হবে যে সে যা করেছে তা সঠিক নয়।’ তেমনই চার-পাঁচ বছর থেকে তাদের ছোটখাটো কাজের দায়িত্ব দেওয়া। যেমন—বিছানা ঝাড়া, বইয়ের টেবিল গোছানো, নিজের স্কুলব্যাগ গোছানো ইত্যাদি কাজ করতে দিতে হবে। এতে তারা দায়িত্বশীল ও কর্মঠ হয়ে ওঠে। অনেক অভিভাবক নিজেরাই ওসব কাজ করে দেন। পরে যখন তাদের এসব কাজ করতে বলা হয়, তখন তারা সহজে করতে চায় না। প্রথম দিকে যেসব মা-বাবা একটু ছাড় দেন, পরে চাপ দেন, তাদের ক্ষেত্রে বেশি অসুবিধা হয়। আবার কখনো মা-বাবা বাচ্চাদের শর্ত দেন—ভালোভাবে পড়াশোনা করলে অথবা ভালো রেজাল্ট করলে কিংবা এই কাজটি করলে তাদের পুরস্কৃত করা হবে অথবা সে যা চাইবে, তা-ই দেওয়া হবে। এটা উচিত নয়। এতে বাচ্চারা বায়না করতে শেখে। সুতরাং বাচ্চাদের শর্ত দেওয়া যেমন উচিত নয়, তেমনি বায়নাও অগ্রাহ্য করা উচিত। ফলে বাচ্চারা আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখে।

 

বাচ্চাদের সময় দিন

বাচ্চাদের কিছুটা সময় দিন। যেসব বাচ্চা মা-বাবার সঙ্গ বেশিক্ষণ পায়, তারা অধিকতর উন্নত চরিত্রের হয়। উঠতি বয়সের বাচ্চাদের যখন কোনো সমস্যা হয়, তখন তারা মা-বাবার সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে চায়; কিন্তু মা-বাবা দুজনেই যদি বাইরে থাকেন, তবে অপেক্ষা করতে করতে বাচ্চাদের আশাভঙ্গ হয়। বাচ্চারা মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটাতে চায়; কিন্তু সমস্যা হয় যখন, তারা মা-বাবাকে কাছে পায় না। এতে বাচ্চাদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

 

টিভি দেখা নিয়ন্ত্রণ করুন

যখন বাচ্চারা একটু-আধটু যৌনতা সম্পর্কে কথা বলে, তখন মা-বাবা মর্মাহত হন। হয়তো তারা স্কুলে এসব শেখে। সাধারণত মিডিয়া থেকেই তারা এসব বেশি শেখে। টেলিভিশনে কোনো কোনো চ্যানেল আজকাল এমন কিছু আপত্তিকর দৃশ্য বা বিষয় প্রদর্শন করে, যা শিশুমনে কুপ্রভাব ফেলে। কিছু মা-বাবা টিভির বিকল্প হিসেবে কম্পিউটারকে গণ্য করে থাকেন; কিন্তু এরও খারাপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। উচিত কাজ হচ্ছে প্রতিদিন শুধু দুই ঘণ্টা বাচ্চাদের টিভি দেখতে দেওয়া। তা-ও মা-বাবার সামনে। আবার কিছু মা-বাবা নিজেরা টিভি দেখছেন আর বাচ্চাকে বলেন, ‘যাও তুমি পড়াশোনা করো।’ এতে বাচ্চাদের পড়ায় মন তো বসেই না, উপরন্তু তাদের মনে একটা বিদ্রোহ দানা বাঁধে।

 

জেনে রাখুন বাচ্চারা কী করছে

অনেক সময় সাপ্তাহিক বা অন্য কোনো ছুটিতে বাচ্চারা একা বাসায় কী করবে বুঝতে পারে না, তাদের মাথায় অনেক দুষ্টু বুদ্ধি দেখা দেয়। কখনো প্রতিবেশীর বাসায় উঁকিঝুঁকি মারে কিংবা ঢিল ছুড়ে জানালার কাচ ভাঙে, পথচারীদের গায়ে পানি ছিটায়, বাগানের ফুল ছিঁড়ে আনন্দ পায়। ঘরে থাকা বাচ্চারা নির্দেশনাবিহীন, নিঃসঙ্গ সময় কাটানোর ফলে এসব কাজ করে। এতে দেখা যায়, এসব বাচ্চাই বেশি ধূমপান, মাদকসেবন, মদ্যপান ও যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা যদি স্কুলের ও পরের কাজকর্ম কী তা নির্ধারণ করে রুটিন বেঁধে দেন, এতে বাচ্চাদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

 

শিশুকে তার যোগ্যতার পরিমাপ করতে শেখান

অনেক মা-বাবা সারাক্ষণ বাচ্চাদের প্রতিটি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। এতে তারা নিজের যোগ্যতার পরিমাপ করতে শেখে না। তাই তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিন। লক্ষ রাখুন, কাজটি ঠিকমতো হচ্ছে কি না। ভালো হলে প্রশংসা করুন, খারাপ হলে বুঝিয়ে দিন। এভাবে তারা তাদের যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে।

 

বৈবাহিক বন্ধন ও সম্পর্ক সুষ্ঠুভাবে বজায় রাখুন

যদি মা-বাবার মধ্যে সুন্দর বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় থাকে তাহলে সন্তান সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠে। কিন্তু সন্তান যদি বাবা অথবা মা যেকোনো একজন অভিভাবকের সঙ্গে থাকে তাহলে তাদের মধ্যে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। হয়তো স্কুলে খারাপ রেজাল্ট করে, কখনো পড়াশোনাও শেষ করতে পারে না। অথবা চাকরিজীবনেও উন্নতি করতে পারে না। বড় হয়েও অনেক সময় তারা কারো সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না।

সুতরাং সন্তানের সর্বপ্রকার মঙ্গলের জন্য অভিভাবকদের উচিত নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। কখনো মতানৈক্য হলে তা সন্তানের সামনে প্রকাশ না করাই শ্রেয়।

লেখক : প্রাক্তন শিক্ষক, ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল

মন্তব্য