kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৪ অক্টোবর ২০১৯। ৮ কাতির্ক ১৪২৬। ২৪ সফর ১৪৪১       

অন্য কোনোখানে

ইউরোপযাত্রী

মোস্তফা মহসীন   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইউরোপযাত্রী

ডুসেলডর্ফ

রাত ১টায় ঢাকা থেকে ইমেরিটাস এয়ারলাইনসে রওনা দিয়েছিলাম। পরের দিন স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় আমাদের বিমান ল্যান্ড করল পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরে। শহরটায় ঢাকার মতো ভিড়ভাট্টা নেই, চিত্কার-চেঁচামেচি নেই, গরমও নেই। সুন্দর ছবির মতো গোছানো! ভাবলাম, রাজধানীর লোকজন কি এত্ত বেলাতেও আদুরে বিড়ালের মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে নাকি? ওরা ঘুমাক! কিন্তু আমার তো আয়েশের সময় নেই। এখনই ছুটতে হবে সুফিটেল ওয়ারশ ভিক্টোরিয়ায়। আইনজীবীদের একটি বৈশ্বিক সম্মেলনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ওখানে যাচ্ছি।

তখন বিকেল ৫টা। পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড় অটোবাস টার্মিনালে এসে নামলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে ইউরোতে ভাড়া মিটিয়ে দিলেও বিপত্তি ঘটল জলবিয়োগ করা নিয়ে। ওখানে বিনা পয়সায় জলবিয়োগ করার নিয়ম নেই। দায়িত্বরত স্টাফ ইউরোতে পেমেন্ট নিতে রাজি না। যা আছে কপালে বলে—এক প্রকার দৌড়ে ছোট কর্মটি সেরে নিলাম। এ ছাড়া কিছু করারও ছিল না। পাসপোর্ট দেখিয়ে জার্মানির টিকিট কাটতে গেলাম। এখানেও বিপত্তি। পোল্যান্ডের মুদ্রা পিএলএন ছাড়া ম্যানেজার টিকিট দিতে রাজি নন। অগত্যা মানিএক্সচেঞ্জ খুঁজতেই হলো। সেখানেও বিপত্তি। ইংরেজি এরা বুঝেই না। বেশ কসরত করে ৬০ ইউরো কনভার্ট করে উঠে পড়লাম দুর্দান্ত এক ইউরো বাসে। বাস ছুটছে সবুজাভ মাঠ, বনবাদাড় পেরিয়ে। যাত্রাপথে প্রতি দুই ঘণ্টায় পাঁচ মিনিটের ব্রেক। কথা হলো, দুই সহযাত্রী রবার্ট আর মারিয়ার সঙ্গে। হাই-হ্যালোর সীমানা পেরিয়ে খোশগল্প। দুজনেই জাতিতে পোলিশ আর পেশায় ডেন্টিস্ট। কর্মক্ষেত্র জার্মানি। একটি প্রত্যন্ত জায়গায় যাত্রাবিরতির মুহূর্তে তাঁরা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ‘এই গ্রামটার নাম আউশফিত্জ। সারা ইউরোপ থেকে হাজার হাজার ইহুদিকে ধরে এনে এখানে হত্যা করা হয়েছিল।

শ্লস বেনরার্থের পেছনের দিক

খানিক পরে এক জায়গায় বাস বদল করতে হলো। জার্মানির শহর ডুসেলডর্ফগামী নতুন বাসে উঠলাম। এতক্ষণ গল্পে মগ্ন ছিলাম। পেটে ছুঁচোদের নাচুনিতে ক্ষুধার কথা মনে হলো। আবারও যাত্রাবিরতি। আকাশে আজ চাঁদ নেই, আছে নয়নজুড়ানো সড়কবাতির আলো। সেই আলো শরীরে মেখে জার্মান সীমান্তের কাছাকাছি পোল্যান্ডের একটি ফাস্ট ফুডের দোকানে ঢুকলাম। খাওয়ার জন্য নিলাম বার্গার, বিস্কুট, জুস, পানি। এখানেও ইউরো অচল! কাঠখোট্টা ম্যানেজার যেই আমার খাদ্যদ্রব্য ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন; তখনই পেছন থেকে কেউ একজন আমার বিলটা শোধ করে দিলেন। টের পেলাম ইউরোপের মানবতা! না হলে যে আমাকে ওই রাতে উপবাসই থাকতে হতো। কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠল। মুখ থেকে বাংলা বের হয়ে এলো—‘ধন্যবাদ’। মাথা ঝাঁকিয়ে দুধসাদা রঙের পোলিশ মেয়েটি নিমিষে আলো-আঁধারিতে হারিয়ে গেল।

বাসে গান শুনতে শুনতে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর ভান করি। হঠাৎ বিপ্লবদার ফোন। হোয়াটস-আপে জানিয়ে দিলাম, গন্তব্যের কাছাকাছিই প্রায় এসেছি। বাস পৌঁছবে ৯টায়। হরেক রকম বাস ছুটছে, এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। জার্মানির বিস্তীর্ণ জনবসতিহীন ভূমি। হামবুর্গ, বন পেরোতে পেরোতে ডাকল ডুসেলডর্ফ। গাড়ি থেকে নামতেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, জার্মান মুলুকে স্থিতু হওয়া আমাদের কুলাউড়ার ছেলে বিপ্লব চক্রবর্তী। ব্রেকফাস্ট করে শুরু হলো ঘোরাঘুরি। প্রথমেই গেলাম ‘ডুসেলডর্ফ বাঁধ’ দেখতে। এটি পর্যটকদের জাদুর মতো আকর্ষণ করে। একদিকে শক্তিশালী নদী রাইন, অন্যদিকে ডুসেলডর্ফ ওল্ড টাউন। নদীর দুই পাশে অনেক পুরনো গির্জা, চকোলেট তৈরির কারখানা, জাহাজ মেরামত কারখানা, ভাসমান রেস্তোরাঁ। এখানে মাত্র এক কিলোমিটারের ভেতর ২৬০টি বার, ভাবা যায়! ডুসেলডর্ফ আরো একটি কারণে বিখ্যাত, এখানেই জন্মেছেন জার্মানির বিখ্যাত কবি হাইনে। নানা ব্যাঞ্জনের সুগন্ধিময় খাবারের জন্যও শহরটির জুড়ি নেই। ভোজনবিলাসী হলে আপনি অনায়াসে গিলে নিতে পারেন সরিষা মিশ্রিত শুয়োরের মাংস, কিশমিশ মিশ্রিত গরুর মাংস, ক্ষীরা ফালি, পনির, মটর স্যুপ...আরো কত কী!

প্যারিসে, আইফেল টাওয়ারের সামনে

পাপিয়া বউদির হাতে তৈরি বাংলা খাবার ও ট্রাডিশনাল খাবার খেয়ে দিলাম একটা ভাতঘুম। ততক্ষণে বিপ্লবদা কাজ থেকে ফিরেছেন। এবার এক রাজার বাড়ি দেখার পরিকল্পনা হলো। ছোট্ট অনুরাধা চক্রবর্তী, আরোহী চক্রবর্তীরও আগ্রহের কমতি নেই তাতে। প্রবল উত্সাহে গোটা পরিবারটিই এখন আমার যাত্রাসঙ্গী। শ্লস বেনরার্থ (স্থাপনকাল ১৭৫৫-১৭৭০) একটি চমত্কার প্রাসাদ। প্রাসাদটি ১৮ শতকের জার্মান রাজা-বাদশাহদের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। প্রধান প্রাসাদটি এখন জাদুঘর। পাশাপাশি আরো কয়েকটি রাজপ্রাসাদও ঘুরে দেখলাম। প্রাসাদগুলোর সংলগ্ন বিশাল মাঠ আর বাগানগুলোতে সবাই মিলে খানিকটা ছোটাছুটি করলাম। এরই ফাঁকে তোলা হলো কিছু ছবি।

এরই মধ্যে বিপ্লবদা প্যারিসের টিকিট কেটে ফেলেছেন। রাতেই রওনা দিলাম ‘সিটি অব লাভ’, ‘সিটি অব রেভল্যুশন’ আর পর্যটকের চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক নগরী প্যারিস অভিমুখে। সকাল ৮টা নাগাদ ওখানে পৌঁছে গেলাম। প্রথমেই প্যারিসের বুক চিরে বেরিয়ে যাওয়া সেন নদী দেখলাম মুগ্ধচিত্তে। এদিকে আমাকে রিসিভ করতে আসা শাহজাহান ভাইয়ের গাড়িটি যাত্রাপথে রাগ করে বসে পড়ল। অনেক কষ্টে সেটার মান ভাঙিয়ে বাসায় পৌঁছানো গেল। ভাবির হাতের খাবার গ্রহণ করে, শপিং সেরে, মেট্রোতে চড়ে যেই না আইফেল টাওয়ার অভিমুখে ঢুকব, সেই মুহূর্তে আমাদের সব পরিকল্পনা স্থগিত করে দিতেই নামল ঝুমবৃষ্টি! সেই বৃষ্টিমাথায় রাত ৮টায় আমার সঙ্গে দৈবক্রমে দেখা হলো এলাকার সন্তান সৌমিত্র তুহিন, প্রিয় অনুজ। নাছোড়বান্দা বৃষ্টি, থামছেই না। ওই দিকে ফিরতি টিকিট কাটা জার্মানির বাস আমার অপেক্ষায়। তুহিন বলল, মহসীন ভাই, সারা গায়ে বুষ্টি মেখে দাঁড়ান! আর শাহজাহান ভাই এই অবস্থায় মুঠোফোন বের করলেন!

বার্লিন প্রাচীরের ভগ্নাংশটুকু ছুঁয়ে দেখা হলো না। কার্ল মার্ক্সের জন্মভিটায় পা রাখা গেল না, আবার প্যারিসখ্যাত ‘লুভর মিউজিয়ামের দর্শনার্থীও হওয়া গেল না। আহারে সময়স্বল্পতা! তবু বহু বছর পরও হয়তো ছুঁয়ে থাকা এই সময় ও সফর আমাকে জানিয়ে দেবে, একদিন আমিও মজেছিলাম দুটি ঋতুর দেশ ইউরোপের রূপ সাগরে। ভরদুপুরে ডুসেলডর্ফ বিমানবন্দরে বিপ্লবদা, পাপিয়া বউদি সপরিবারে আমাকে বিদায় জানালেন হূদয়ের ভালোবাসায় সিক্ত করে।

 

 

মন্তব্য