kalerkantho

সোমবার। ১৭ জুন ২০১৯। ৩ আষাঢ় ১৪২৬। ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

ইয়ানুর অপেরা হাউসে

সোহাগ ভূইঁয়া

২৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইয়ানুর অপেরা হাউসে

কলকাতা থেকে শাশুড়ি আসায় ঠিক হলো এবার সিডনির অপেরা হাউস দেখতে যাব। মেলবোর্ন থেকে গাড়ি করে ওখানে যেতে সময় লাগবে ৮ ঘণ্টা। এত লম্বা সময় ধরে গাড়ি চালাতে চালাতে ঘুম চলে আসে। আর যে বেচারা গাড়ি চালায়, আশপাশে ভালো করে দেখার উপায়ও থাকে না তার। বউয়ের সঙ্গে গাঁইগুঁই করে উড়োজাহাজে করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।

গাঁটরি-বোঁচকা গুছিয়ে পরের দিন সকাল ৭টায় রওনা দিলাম মেলবোর্নের টুলামারিন বিমানবন্দরের উদ্দেশে। সব মিলিয়ে আড়াই ঘণ্টায় সিডনির হোটেল রেডিসনে পৌঁছে গেলাম। এখান থেকে অপেরা হাউস কাছেই। আধা ঘণ্টা হাঁটলেই অপেরা হাউসের সঙ্গে হারবার ব্রিজটাও দেখা হয়ে যাবে। রিশিপশন থেকে একটা ম্যাপ ও পর্যটন গাইড বই নিয়ে নিলাম।

পাহাড়ি এলাকা বলে এখানকার পথঘাটও বেশ উঁচু-নিচু। চারপাশে মানুষজনের ছোটাছুটি আর ব্যস্ততা ব্যাপক হলেও তাদের রয়েছে এক অদ্ভুত শৃঙ্খলাবোধ। কিন্তু মেলবোর্নে সাত বছর ধরে থাকলেও সিডনিকে বেশ ব্যস্তই মনে হলো। অবশ্য ঢাকা থেকে যে কেউ সরাসরি সিডনিতে এলে তার কাছে সিডনিই ভালো লাগবে। ভালো লাগবে এখানের দিন ও রাতের ব্যস্ততাকেও। মেলবোর্নে সন্ধ্যা ৭টার দিকেই আবাসিক এলাকাগুলো চুপচাপ হয়ে যায়। মানুষ ঘুমাতে চলে যায় রাত ৮টার মধ্যে। সিডনিকে দেখলাম তার উল্টো। রাত ১২টার সময়ও হইহুল্লোড় শুনেছি হোটেল থেকে।

সিডনিতে যানজট ঢাকার মতো না হলেও কম যায় না। সিডনিতে স্থায়ী না হওয়ার পেছনে এটাও অন্যতম কারণ ছিল আমার। হয়তো যানজট সমস্যার জন্যই এখানে দুই চাকার বাহন বেশ প্রিয়। শুধু তা-ই নয়, মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা করে এখানে পার্কিংয়ের জায়গাও দেখলাম। আর এখানে গরমে সাইকেল চালানোর মজাই অন্য রকম।

অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া পুরোপুরি বাংলাদেশের বিপরীত। বাংলাদেশে যদি শীত থাকে, এখানে গরম। আর বাংলাদেশে গরম থাকলে এখানে তীব্র শীত। সে সময় অস্ট্রেলিয়ায় চলছিল গ্রীষ্মকাল। তাই নাশতা শেষ করে পাতলা একটা টি-শার্ট, জিন্স প্যান্ট আর দৌড়ানোর জুতা পরেই হাঁটিহাঁটি পা পা করে পৌঁছে গেলাম অপেরা হাউস।

ওটাকে দেখে মনে হলো অনেক নৌকার পাল একসঙ্গে বসানো হয়েছে বোধ হয়। পুরো দুনিয়া থেকে অগুনতি মানুষ আসে এটাকে দেখতে। কেউ একজন এই অপেরা হাউসকে দেখে বলেছিলেন, ‘অসাধারণ স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এই স্থাপনা দেখলে মনে হয় পানির ওপর ভাসমান কয়েকটি নৌকার সফেদ পাল। আবার মনে হতে পারে শ্বেতশুভ্র বিশাল রাজহাঁসের ঝাঁক!’ খুব একটা ভুল বলেননি ভদ্রলোক।

তেইশ তলা সমান উঁচু এই অপূর্ব ভবনটিতে আছে দুই হাজার ৬৯০টি আসনসহ একটি কনসার্ট হল, একটি ড্রামা থিয়েটার ও একটি প্লে-হাউস। ভবনটির বাইরের চত্বরটিও বিশাল।

ইয়ানু উডসান নামের এক ড্যানিশ ভদ্রলোক এটার নকশা করেন। কোথায় যেন পড়েছিলাম, ইয়ানু মারা গিয়েছিলেন একরাশ অভিমান বুকে নিয়ে। নিজের সৃষ্টিকে একবারের জন্যও নিজ চোখে দেখে যেতে পারেননি। নিজের অসাধারণ এই সৃষ্টি থেকে বহু দূরে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন অতৃপ্ত এক বাসনা নিয়ে।

এই ভবনে আছে সাতটি প্রেক্ষাগৃহ। এখানে বছরে গড়ে দেড় হাজার অনুষ্ঠান হয়। ভেতরে গিয়ে দেখলাম মানুষের লম্বা লাইন। সবাই টিকিট কিনছেন কোনো না কোনো অনুষ্ঠান দেখার জন্য।

এই অপেরা হাউসটি একসময় ম্যাককুইরি বন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৮১৭ সালে বন্দরটি তৈরি হয়। এখানে ট্রামের রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য ছোটখাটো এক কারখানা তৈরি করা হয়েছিল সেই সময়েই। এরপর ১৯৫৯ সালে এখনকার অপেরা হাউস তৈরির কাজ শুরু হয়। উদ্বোধন করা হয় ১৯৭৩ সালের ২০ অক্টোবর। এখানে দাঁড়িয়ে হারবার ব্রিজটাও দেখা যায়।

অপেরা হাউসের দর্শনপর্বের ইতি টেনে হাঁটা দিই মাদাম তুসোর জাদুঘরে। পৃথিবীর বড় বড় শহরে এই জাদুঘরের শাখা আছে। অস্ট্রেলিয়ার মাদাম তুসোর জাদুঘরটা আছে এই সিডনিতেই।

এখানে স্থান পেয়েছে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ও রাজকীয় ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্র তারকা, তারকা খেলোয়াড় থেকে শুরু করে কুখ্যাত খুনি ব্যক্তিদের মূর্তি। দেখলাম ইংল্যান্ডের রাজপরিবার থেকে মহাত্মা গান্ধীর মানব আকারের পুতুল। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে, সত্যিই যেন মাইকেল জ্যাকসন কিংবা অ্যাঞ্জেলিনা জোলি দাঁড়িয়ে আছে। কতবার যে মোমের পুতুলগুলোর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ‘দুঃখিত’ বলে ফেলেছি, তার ইয়ত্তা নেই!

এরপর মোমের রাজ্য থেকে গেলাম জলের রাজ্যে। বিশাল এক ভবন, ভেতরে সব কাচের দেয়াল। টিকিট কেটে সিঁড়ি দিয়ে সোজা নিচে চলে গেলাম। চারদিকে নীল পানি। সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে হরেক জাতের মাছ। হঠাৎ করে কানের পাশ দিয়ে একটা বিশাল স্টিং রে চলে যাওয়ায় আঁেক উঠলাম। কিছুক্ষণ পর একটা হাতুড়ি-মাথার হাঙর এলো। বেশখানিকটা সময় ধরে আমাকে দেখল। কাচের দেয়ালের ওপাশ থেকে কামড় দেওয়া যাবে না বলে হয়তো মন খারাপ করে চলে গেল। চমৎকার এই জলের রাজ্যে আরো কিছুক্ষণ সময় কাটিয়েছিলাম।

সেবার দিন তিনেক ছিলাম সিডনিতে। কিন্তু মনে হলো, সিডনি দেখার জন্য এটা যথেষ্ট সময় না। ঠিকমতো দেখতে হলে কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় নিয়ে আসা উচিত। মেলবোর্ন ফেরার জন্য প্লেনে উঠতে যাওয়ার সময় মনে হলো একটা ছবি তুলে রাখি। যেই না ফোন বের করে ছবি তুলতে যাব, অমনি বিমানরক্ষীরা হা হা করে তেড়ে এলো। জানাল, বিমানের কাছ থেকে ছবি তোলা মহা অপরাধ। পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। খাইছে, পাঁচ হাজার ডলার! দরকার নেই ভাই ছবি তোলার। মানে মানে মেলবোর্নে ফিরতে পারলেই হলো।

 

ছবি: লেখক

মন্তব্য