kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

নকল মানুষের রাজ্যে

জেড সেলিম   

৩০ জুন, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নকল মানুষের রাজ্যে

লন্ডনে পাঁচ দিন হয়ে গেল। টাওয়ার অব লন্ডন, বিগবেন, পিকাডেলি, ওয়ারউইক ক্যাসল আর চিড়িয়াখানা দেখা সারা। সব কিছু ছাপিয়ে প্রতিবছর ১০ মিলিয়ন (এক কোটি) বিদেশি দেখতে আসে লন্ডনের মাদাম তুসো। এদের মধ্যে ২০ লাখ মার্কিন, ৫০ লাখ ইউরোপীয়, পাঁচ লাখ জাপানি এবং অন্যরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের। বিখ্যাত সব মানুষ আছেন এখানে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বা বসে। নাচছেন কেউ কেউ, গাইছেনও অনেকে। গরাদে বন্দি আছেন কয়েকজন। এঁরা সবাই মূর্তি, কিন্তু মজাটা হলো, সবাইকে আসল মনে হয়। ভাবটা এমন, উসাইন বোল্ট এক্ষুনি দৌড় শুরু করবেন বা গোয়ের্নিকায় শেষ আঁচড় দেবেন পিকাসো। কেট উইন্সলেটকে দেখে মনে হবে, ওঁর চুলটা একটু গুছিয়ে দিই। মহাত্মা গান্ধীর চরকার কাছে বসে থাকতে মন চাইবে। স্টিভ জবসের জিন্সে হাত পুরে দিয়ে একটা আইফোন বের করে আনতে ইচ্ছা হবে। মেসিকে হয়তো বলে ফেলবেন- ভাই, আপনি একটা বস। মনে হবে, অমিতাভ বচ্চনই আপনাকে বলছেন, আরে ইয়ার, ইধার আও। মাদাম তুসো বিভ্রান্ত করেন বলেই এত মজার, এত জনপ্রিয়!

প্রতিকৃতি সবই মোমের। তুসো মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা মেরি গ্রজহোলজ। শৈশবে বাবাকে হারান। মা কাজ করতেন ডাক্তার ফিলিপ কার্টিয়াসের বাড়িতে। তিনি মোমের ভাস্কর্য তৈরি করতেন। ১৭৬৭ সালে কার্টিয়াস প্যারিসে চলে যান। মায়ের সঙ্গে মেরিও যান। কার্টিয়াসের কাছে মেরি মোমের ভাস্কর্য বানানো শেখেন। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে অল্প দিনেই। রাজা লুইয়ের বোন এলিজাবেথের শখ হয় মোমের ভাস্কর্য বানানোর। মেরি হন তাঁর শিক্ষক। ভার্সাইয়ের অতিথিশালায় তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়। রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর ভালো সখ্য গড়ে ওঠে। ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে শুরু হয় বিপ্লব। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মূর্তি তৈরির কাজ পান মেরি। কিন্তু রানি আঁতোয়ানেতের কোনো ছবি পাওয়া যাচ্ছিল না। বিপ্লবীরা তাই মেরিকে নিয়ে যায় মেডিলিনের বধ্যভূমিতে। অনেক চেষ্টার পর লাশের স্তূপ থেকে রানির কাটা মুণ্ডু খুঁজে বের করেন মেরি। তৈরি করেন প্রতিকৃতি। বিপ্লবীরা একদিন জানতে পারে, মেরির সঙ্গে রানির সুসম্পর্ক ছিল। তাই ১৭৯৪ সালে তাঁকে হত্যার আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু শিল্পী বলে মাফ পেয়ে যান। পরে ইঞ্জিনিয়ার তুসোর সঙ্গে মেরির বিয়ে হয়। সেই সুবাদে মেরি গ্রজহোলজ পরিচিত হন মাদাম তুসো নামে। ফরাসি বিপ্লবের পর ১৮০২ সালে তুসো জ্যেষ্ঠ পুত্র জোসেফকে নিয়ে ব্রিটেনে চলে যান। মা ও ছেলে মিলে ২৩ বছর ধরে মোমের মূর্তির ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী চালিয়ে যান। বেকার স্ট্রিটে একটি মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৩৫ সালে। ১৮৫০ সালে ৮৯ বছর বয়সে মারা যান মাদাম তুসো। মিউজিয়ামটি এখন আছে বেকার স্ট্রিটের কাছে মেরিলিবোন রোডে।

ট্রেন থেকে নামলাম বেকার স্ট্রিট স্টেশনে। স্টেশন থেকেই গম্বুজটি দেখা যায়। প্রবেশপথের ওপরে আছে এটি। ভবনের ছবি দেখেছিলাম আগেই। গথিক স্থাপনারীতির কয়েকটি ভবন মিলিয়ে মাদাম তুসো কম্পাউন্ড। ভবনগুলোর দেয়ালে আকর্ষণীয় কারুকাজ। বাইরে দর্শনার্থীদের বিরাট লাইন না দেখে একটু অবাক হলাম। শঙ্কা হলো, তুসো আজ বন্ধ নয় তো? আসলে মিউজিয়ামটি সপ্তাহের সাত দিনই খোলা থাকে। প্রথমে পেলাম ছাত্রছাত্রী এবং দলবদ্ধ দর্শনার্থীদের কাউন্টার। আরেকটু এগিয়ে সাধারণ দর্শনার্থী কাউন্টার পেলাম। প্রবেশমুখে একজন মিউজিয়ামকর্মী ওয়েলকাম বললেন। তিনি ইঙ্গিতে লাইনে দাঁড়ানোর জায়গা দেখিয়ে দিলেন। দুটি বিশাল স্ক্রিনে ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনা দেখানো হচ্ছে। প্রায় ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলাম। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে পেলাম তিনটি টিকেট কাউন্টার। ১২ পাউন্ডে টিকিট কাটলাম।

মিউজিয়ামটি আটটি বড় হলে বিভক্ত। গার্ডেন পার্টি, স্পোর্টিং গ্রেটস, টু হানড্রেড ইয়ারস, সুপারস্টার ও লেজেন্ডস, গ্র্যান্ড হল, ক্রিয়েটিভ আর্টস, চেম্বার অব হরর এবং স্পিরিট অব লন্ডন। আরো আছে প্ল্যানেটরিয়াম। গার্ডেন পার্টিতে ঢুকে মাথা আউলে গেল। দর্শনার্থী আর দ্রষ্টব্য একাকার। দর্শনার্থীরা একই ভাব করে পোজ দিচ্ছেন। সুপার মডেল নওমি ক্যাম্পবেল সবুজ ইভনিং গাউন পরে দাঁড়িয়ে আছেন। গার্ডেন পার্টিতে আরো আছেন আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, ব্রাড পিট, পিয়ার্স ব্রসনান, শন কনারি। স্পোর্টর্িং গ্রেটস হলে প্রথমেই দেখলাম মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীকে। খালি গা, হাতে গ্লাভস। অলিম্পিকের সময় গড়া উসাইন বোল্টের প্রতিকৃতি খুব দেখানো হয়েছিল টেলিভিশনে। এই হলে আরো আছেন শচীন টেন্ডুলকার, লিওনেল মেসি, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, ডেভিড বেকহাম প্রমুখ। টু হানড্রেড ইয়ারস হলে আছেন সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট, ডিউক অব ওয়েলিংটন প্রমুখ। ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের স্ত্রী ঘুমিয়ে আছেন একটি খাটে। তুসোর গড়া পুরনো প্রতিমূর্তিগুলোর এটি একটি। এই হলে মাদাম তুসোর প্রতিমূর্তিও আছে। রানি আঁতোয়ানেতের মুখাবয়ব তৈরি করছেন তিনি। সুপারস্টার ও লেজেন্ডস হলে আছেন মার্লোন ব্রান্ডো। গিটার হাতে আছেন এলভিস প্রিসলি, গোঁফে তা দিচ্ছেন চার্লি চ্যাপলিন, কাঁধে বন্দুক নিয়ে জেমস ডিন, মাইক্রোফোন হাতে মাইকেল জ্যাকসন ও টম জোনস এবং আরো অনেকে। গ্র্যান্ড হল মাদাম তুসোর প্রধান আকর্ষণ। এখানে আছে ছয়টি গ্যালারি- মডার্ন ইংলিশ রয়ালস, হিস্টরিক ইংলিশ রয়ালস, ব্রিটিশ প্রাইম মিনিস্টার্স, ওয়ার্ল্ড লিডারস, আমেরিকান প্রেসিডেন্টস ও ওয়ার্ল্ড স্পিরিচুয়াল লিডারস।

চেম্বার অব হররে ঢুকলেই গা ছমছম। দুর্বল চিত্তের লোক এবং শিশুদের এখানে না ঢুকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এখানে আছে দি ইম্পেলারের প্রতিকৃতি। ড্রাকুলা নামে পরিচিত কুখ্যাত এই লোকটি চতুর্দশ শতকে ছয় বছরে প্রায় এক লাখ নারী-পুরুষকে হত্যা করেছিল। ফ্রান্সের বিপ্লবী নারী জোয়ান অব আর্ককে ১৪৩১ সালে আগুনে পুড়িয়ে মারার দৃশ্যটি আছে এখানে।

দুই আসনের চাকাবিহীন ছোট ছোট ট্যাক্সি ঘুরছিল ধারেকাছে। বিদ্যুৎচালিত এসব ট্যাক্সি কোথায় নিয়ে যায় ভাবছি। অন্যরা যেখানে যাচ্ছে, সেখানেই যাব ভেবে একটিতে উঠে পড়লাম। ট্যাক্সিটি হেলেদুলে, ডানে-বাঁয়ে কাত হয়ে চলতে লাগল। পরে জেনেছি, এর নাম মুভিং এক্সপেরিয়েন্স। ট্যাক্সিওয়ের দুই পাশে আছে চার শ বছরের পুরনো লন্ডন মহানগরী গড়ে ওঠার ইতিহাস। এতে চাপিয়ে ১০ মিনিটে দেখানো হয় সেসব। যেমন- লন্ডনের রূপকার স্যার ক্রিস্টোফার ওয়ারেন বিল্ডিং তৈরির কাজ তদারক করছেন, কেরানিরা হিসাব কষছে, উইলিয়াম শেক্সপিয়ার লিখছেন।

এরপর প্ল্যানেটরিয়ামের দিকে গেলাম। স্থান সংকট, অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এরই মধ্যে যথেষ্ট ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তাই ফেরার পথ ধরলাম।