kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি

ভার্চুয়াল রিয়ালিটি

এস এম হাবিব উল্লাহ, মাস্টার ট্রেনার, প্রভাষক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, রাউজান সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম

২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভার্চুয়াল রিয়ালিটি

এই পাঠ শেষে যা শিখতে পারবে—

 

১। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ধারণা লাভ করবে।

২। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি সিস্টেম তৈরির উপাদান সম্পর্কে জানতে পারবে।

৩। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির প্রয়োগক্ষেত্র বা ব্যবহার জানতে পারবে।

৪। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে।

ভার্চুয়াল রিয়ালিটি : হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার সমন্বয়ে কম্পিউটার সিস্টেমের মাধ্যমে কোনো একটি পরিবেশ বা ঘটনার বাস্তবভিত্তিক বা ত্রিমাত্রিক চিত্রভিত্তিক রূপায়ণ হলো ভার্চুয়াল রিয়ালিটি। অন্যভাবে বলা যায়, কৃত্রিম পরিবেশ থেকে প্রায় বাস্তবের মতো অনুভব করাকে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বলে। কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিম পরিবেশকে এমনভাবে তৈরি ও উপস্থাপন করা হয়, যা ব্যবহারকারীর কাছে সত্য ও বাস্তব বলে মনে হয়।

১৯৬২ সালে মর্টন এল হেলগি প্রথম ভার্চুয়াল রিয়ালিটির আত্মপ্রকাশ করেন তাঁর তৈরি সেন্সোরামা স্টিমুলেটর নামের যন্ত্রের মাধ্যমে।

ভার্চুয়াল রিয়ালিটিতে বাস্তব অনুভব করার জন্য তথ্য আদান-প্রদানকারী বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস যেমন—মাথায় হেড মাউন্টেড ডিসপ্লে (Head Mounted Displaু), হাতে একটি ডাটা গ্লোভ (Data Glove), শরীরে একটি পূর্ণাঙ্গ বডি স্যুইট (Body Suit) ইত্যাদি পরতে হয়।

 

ভার্চুয়াল রিয়ালিটি সিস্টেম তৈরির উপাদান

১। ইফেক্টর—এটি হলো বিশেষ ধরনের ইন্টারফেস ডিভাইস, যা ভার্চুয়াল রিয়ালিটি পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ সাধন করে। যেমন—হেড মাউন্টেড ডিসপ্লে।

২। রিয়ালিটি সিমুলেটর—এটি এক ধরনের হার্ডওয়্যার, যা ইফেক্টরকে সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহ করে। যেমন—বিভিন্ন ধরনের সেন্সর।

৩। অ্যাপ্লিকেশন—বিভিন্ন সিমুলেশন সফটওয়্যার। যেমন অটোডেস্কের ‘উরারংরড়হ’।

৪। জিওমেট্রি—জিওমেট্রি হলো ভার্চুয়াল পরিবেশের বিভিন্ন বস্তুর বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত তথ্যাবলি।

 

ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ব্যবহার

প্রকৌশল ও বিজ্ঞান—বিজ্ঞানের জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণা। দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের ব্যবহার বৃদ্ধি ও সহজীকরণ। গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। প্রয়োগবিধি ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রসেসের সিমুলেশন তৈরি।

খেলাধুলা ও বিনোদন—ভার্চুয়াল রিয়ালিটির কল্যাণে বিভিন্ন খেলাধুলার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জানা যাচ্ছে। কম্পিউটারের সঙ্গে কোন খেলায় অংশগ্রহণ সহজ হচ্ছে। দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক সিমুলেশনের মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে ঐতিহাসিক সব ছবি। সবার কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বা পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর ছবি।

কম্পিউটার ও যোগাযোগ—সার্কিট বা ডায়াগ্রাম ডিজাইন। কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার তৈরি।

ব্যবসা ও বাণিজ্যে—এর মাধ্যমে ক্রেতারা পণ্যের গুণগত মান যাচাই এবং পণ্য ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিরূপণ করতে পারে। ভোক্তা ও ক্রেতার কাছে পণ্যের ব্যবহারপদ্ধতি ও সুবিধাদি উপস্থাপন, ব্যাবসায়িক কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, উত্পাদিত বা প্রস্তাবিত পণ্যের কৌণিক উপস্থাপন।

শিক্ষাক্ষেত্রে—এর মাধ্যমে শিক্ষার জটিল ও কঠিন বিষয়গুলো সহজে উপস্থাপন করা। পাঠদানের বিষয়টি সহজে চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়গ্রাহী করা।

স্বাস্থ্যসেবা—ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যবহারের অন্যতম বৃহত্ ক্ষেত্র হচ্ছে চিকিত্সাবিজ্ঞান। এই প্রযুক্তিতে সিমুলেশনের মাধ্যমে জটিল সার্জারি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। চিকিত্সকদের নতুন চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা অর্জন বা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে।

গেমস তৈরি—ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ব্যাপক প্রয়োগ হচ্ছে গেমস তৈরি করতে। বাজারে প্রচলিত বেশির ভাগ গেমসই এ মডেল অনুসরণ করে তৈরি। যেমন—ভার্চুয়াল স্পোর্টস, ভার্চুয়াল পুলিশ কপ ইত্যাদি

ড্রাইভিং নির্দেশনা—ভার্চুয়াল রিয়ভলিটির মাধ্যমে গাড়ি চালনা প্রশিক্ষণ নিতে পারছে। গাড়ি চালনার বিভিন্ন বিষয়ে বাস্তব ধারণা লাভ করতে পারছে, ফলে প্রশিক্ষণার্থী দ্রুত গাড়ি চালনা শিখতে পারছে।

সেনাবাহিনী প্রশিক্ষণে—ভার্চুয়াল রিয়ালিটির প্রয়োগ করে সেনাবাহিনীতে অস্ত্র চালনা এবং আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার। রাতে যুদ্ধ পরিচালনা এবং শত্রুর অবস্থান নির্ণয়। উন্নত যুদ্ধসামগ্রীর ব্যবহার কম সময়ে নিখুঁতভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান।

বিমানবাহিনী প্রশিক্ষণে—বিমানবাহিনীতে বিমান চালনা প্রশিক্ষণ এবং প্যারাশুট ব্যবহার। মনুষ্যবিহীন বিমান পরিচালনা এবং রাডার দিয়ে শত্রু-মিত্র বিমান শনাক্তকরণ।

নৌবাহিনী প্রশিক্ষণে—নৌবাহিনীতে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ ও ডুবোজাহাজ চালনা। শত্রুর জাহাজের অবস্থান নির্ণয় ও রাত্রিকালীন যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যাপকভাবে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যবহার করা হয়।

নগর পরিকল্পনায়—নগর পরিকল্পনায় ত্রিমাত্রিক ভার্চুয়াল রিয়ালিটির প্রয়োগ ঘটিয়ে নগর উন্নয়নের রূপরেখা, যাতায়াতব্যবস্থা ইত্যাদি সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে বর্ণনা করা যায়।

মহাশূন্য অভিযান—ভার্চুয়াল রিয়ালিটি প্রযুক্তি প্রয়োগ করে ত্রিমাত্রিক সিমুলেশন তৈরির মাধ্যমে মহাকাশ বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ছাত্র-শিক্ষকরা সৌরজগত্ মহাকাশের গ্রহ বা গ্রহাণুপুঞ্জের অবস্থান গঠন-প্রকৃতি ও গতিবিধি গ্রহের মধ্যস্থিত বিভিন্ন বস্তু বা প্রাণের অস্তিত্ব ও উপস্থিতি সম্পর্কে সহজেই ধারণা অর্জন করতে পারে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষা—ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার জন্য জাদুঘরে ভার্চুয়াল রিয়ালিটির প্রয়োগ হচ্ছে, ফলে আগত দর্শনার্থীরা তা দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন ও বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করছেন।

 

ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ইতিবাচক প্রভাব

১। বাস্তবায়নের আগেই বাস্তবকে অনুভব করা যায়।

২। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে জটিল বিষয়গুলো ত্রিমাত্রিক চিত্রের মাধ্যমে আকর্ষণীয় ও হূদয়গ্রাহী করা যায়।

৩। ঝুঁকিপূর্ণ উত্পাদনব্যবস্থায় ভার্চুয়াল রিয়ালিটি প্রয়োগ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সহজ ও সরল করা সম্ভব।

৪। বাস্তবায়নের আগে ভার্চুয়াল রিয়ালিটির সিমুলেশনের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে খরচ কমানো যায়।

নেতিবাচক প্রভাব

১। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যবস্থায় মানুষ বাস্তবের চেয়ে অনেক ভালো পরিবেশ পায়। ফলে মনুষ্যত্বহীনতা সৃষ্টি হতে পারে।

২। বাস্তবের স্বাদ পাওয়ায় কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করতে পারে।

৩। যেহেতু ভার্চুয়াল রিয়ালিটি একটি কম্পিউটার সিস্টেম; তাই এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

৪। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ব্যয়বহুল হওয়ায় সবাই এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সুবিধা পায় না। ফলে ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হয়।

মন্তব্য