kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

সংকটেও টিকে থাকার লড়াই বেসরকারি এয়ারলাইনসের

মাসুদ রুমী    

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সংকটেও টিকে থাকার লড়াই বেসরকারি এয়ারলাইনসের

-           ২০ বছরে বন্ধ হয়েছে সাতটি বেসরকারি এয়ারলাইনস

-           আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী প্রবৃদ্ধি ২২.১০ শতাংশ, যার ৭০ শতাংশই বহন করছে বিদেশি এয়ারলাইনস

-           দেশি এয়ারলাইনসের বাজার মাত্র ৩০ শতাংশ, যার মধ্যে ২৫ শতাংশই বিমানের

-           অভ্যন্তরীণ রুটে পাঁচ বছর যাত্রী বেড়েছে চার লাখ ১৯ হাজার ৫১৮ জন। এই বৃদ্ধির হার ৬৪.৭৩ শতাংশ

উচ্চ পরিচালন ব্যয় ও তীব্র প্রতিযোগিতায় হিমশিম খাচ্ছে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো। গত ২০ বছরে ১২টি এয়ারলাইনস অনুমতি পেলেও পরিচালনা করার পর বন্ধ হয়ে যায় সাতটি। আর দুটি প্রতিষ্ঠান অনুমতি নিলেও কখনোই পরিচালনায় আসেনি। বন্ধ হয়ে গেছে অ্যারো বেঙ্গল, এয়ার পারাবাত, এয়ার বাংলাদেশ, রয়েল বেঙ্গল এয়ার, বেস্ট এয়ার, জিএমজি এয়ারলাইনস এবং ইউনাইটেড এয়ার। টিকে আছে তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইনস। ভুল পরিকল্পনা, উচ্চ হারের অ্যারোনটিক্যাল চার্জ, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বিপুল অর্থের জোগান না দিতে পেরে তারা বিদায় নিয়েছে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন বিমান সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা জানান, বাংলাদেশে বিমান চলাচল খাতের অনেক সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে টিকে থাকতে পারছে না বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো। বিমান বাংলাদেশ ও বিদেশি এয়ারলাইনসের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় হিমশিম খাচ্ছে তারা। এয়ারক্রাফট ক্রয়ে উচ্চ সুদের অর্থায়ন, বেশি দামের জেট ফুয়েল, এয়ারপোর্ট চার্জ, ভাড়ার প্রতিযোগিতা, যন্ত্রাংশ আমদানি, ব্যয়বহুল রক্ষণাবেক্ষণ, হ্যাঙ্গার, বন্ডেড ওয়্যারহাউসসহ বিভিন্ন বৈষম্যে নানা সংকট তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত নীতি সহায়তা, আর্থিক সক্ষমতার অভাব, ব্যবস্থাপনার ত্রুটি, যুগোপযোগী ব্যাবসায়িক কৌশলের অভাবসহ আরো নানা কারণে বিদেশি এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে গত ২২ বছরে লাইসেন্স পাওয়া অনেক এয়ারলাইনসকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হয়েছে। বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর সক্ষমতার ঘাটতি কাজে লাগিয়ে দেশের এভিয়েশন শিল্পের বেশির ভাগই দখল করে আছে বিদেশি এয়ারলাইনস।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানায়, দেশে প্রথম ১৯৯৫ সালে বেসরকারি এয়ারলাইনস অ্যারো বেঙ্গলকে আকাশপথে চলাচলের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে অনুমতি পেলেও যাত্রা শুরু করতে অ্যারো বেঙ্গলের দুই বছর সময় লাগে। ১৯৯৭ সালে প্রথম যাত্রী পরিবহন শুরু করলেও ১৯৯৮ সালে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় কর্তৃৃপক্ষ। অ্যারো বেঙ্গলের পর পর চালু হয়েছিল এয়ার বাংলাদেশ, জিএমজি, এয়ার পারাবত, রয়েল বেঙ্গল এয়ার, বেস্ট এয়ার ও ইউনাইটেড এয়ার। এই সাতটি এয়ারলাইনস অর্থসংকট দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১০ সাল থেকে রিজেন্ট এয়ার, ২০১৫ সাল থেকে নভো এবং ইউএস-বাংলা এয়ার ফ্লাইট অপারেশন করে এখনো টিকে আছে।

বেবিচক জানায়, বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩১টি বিদেশি এয়ারলাইনস ৩৭টি গন্তব্যে ফ্লাইট ও কার্গো সেবা পরিচালনা করছে। আর প্রতিবছর ৬০ লাখের বেশি যাত্রী বিমান পরিবহন সেবা নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী বৃদ্ধির হার ২২.১০ শতাংশ। তবে বহির্গামী যাত্রীদের ৭০ শতাংশই বহন করছে বিদেশি এয়ারলাইনস। বিকাশমান এ বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

এদিকে অভ্যন্তরীণ রুটে পাঁচ বছরে যাত্রী বেড়েছে চার লাখ ১৯ হাজার ৫১৮ জন। এই বৃদ্ধির হার ৬৪.৭৩ শতাংশ। বছরে প্রায় ১২ লাখের মতো যাত্রী পরিবহন করছে চারটি এয়ারলাইনস।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উড়োজাহাজের তেলের মূল্য, পার্কিং চার্জ, অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ অনেক বেশি। বিদেশি এয়ারলাইনসকে সেসব দেশের সরকার প্রদত্ত সুবিধা দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোকে দিতে সরকারের কিছু সহায়তা প্রয়োজন। এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এ সেবার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে এয়ারলাইনসের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদহার বেশি। উড়োজাহাজের জ্বালানি তেলের দাম অতিরিক্ত। আন্তর্জাতিক পথে যে দামে জেট ফুয়েল কেনা যায়, অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটে একই তেল কিনতে বেশি টাকা দিতে হয়। সারচার্জ ও তেলের দামের এ বৈষম্যের জন্য ব্যবসা করা কঠিন। তেলের দাম বিশ্ববাজারে কমে গেছে অথচ বাংলাদেশে কমেনি। এত খরচ দিয়ে দেশি এয়ারলাইনসগুলোর ব্যবসা করে টিকে থাকা সম্ভব নয়।’

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দরকার। এ ছাড়া সারচার্জ তেলের দামের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা আনা প্রয়োজন। ভারতের এয়ারলাইনসগুলোর জন্য মোদি সরকার উড়াল নামে একটি স্কিম চালু করেছে, যেখানে দেশীয় এয়ারলাইনসের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের দেশের এয়ারপোর্টেও আমাদের বিদেশি এয়ারলাইনসের সমান হারে ল্যান্ডিংসহ অন্যান্য চার্জ দিতে হচ্ছে।’

এভিয়েশন খাত বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ আমদানি প্রক্রিয়াও জটিল ও সময়সাপেক্ষ। বেসরকারি বিমান কম্পানিগুলোর জন্য বিমানবন্দরে কোনো হ্যাঙ্গার নেই। বিভিন্ন হেলিকপ্টার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের হ্যাঙ্গারে কোনো মতে মেরামতের কাজ করতে হয়।’

এয়ারলাইনসগুলোকে বর্তমানের কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কিভাবে সম্ভব জানতে চাইলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সময়োপযোগী নীতিমালা প্রয়োজন, যেখানে এভিয়েশন খাতের বিকাশে সরকারের পর্যাপ্ত নীতি সহায়তা থাকবে। একই সঙ্গে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর বিকাশে সরকার সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মসূচি নিতে পারে।’

এ ছাড়া এয়ারলাইনসের অনুকূলে হ্যাঙ্গারের স্থান এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান, ঢাকা কাস্টমস হাউসে ভোগান্তিবিহীন যন্ত্রাংশ ছাড় করানো এবং অযৌক্তিক শুল্ক আরোপ না করা, যন্ত্রাংশ আমদানির মূল্য ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা, জ্বালানি তেলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ কমিয়ে আনার সুপারিশ করেন এই বিশেষজ্ঞ।

মন্তব্য