kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

অভ্যন্তরীণ রুটেই সক্ষমতা বাড়াবে নভোএয়ার

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অভ্যন্তরীণ রুটেই সক্ষমতা বাড়াবে নভোএয়ার

মফিজুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নভোএয়ার ছবি : লুৎফর রহমান

দেশের এভিয়েশন খাতে অনেক সম্ভাবনা থাকলেও নীতির সংকটে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বেসরকারি এয়ারলাইনস। গত ২০ বছরে ১২টি এয়ারলাইনস অনুমতি পেলেও পরিচালনা করার পর বন্ধ হয়ে যায় সাতটি। আর দুটি প্রতিষ্ঠান অনুমতি নিলেও কখনোই পরিচালনায় আসেনি। এখন টিকে আছে মাত্র তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইনস। ভুল পরিকল্পনা, উচ্চহারের এরোনটিক্যাল চার্জ, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বিপুল অর্থের জোগান না দিতে পেরে তারা বিদায় নিয়েছে বলে মনে করেন নভোএয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল মফিজুর রহমান। কালের কণ্ঠ’র বিজনেস এডিটর মাসুদ রুমীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের এভিয়েশনশিল্পের প্রসারে সরকারের নীতিগত সহায়তা জোরদার করার পরামর্শ দেন।

 

 

 

এক নজরে নভোএয়ার

-  ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রা শুরু।

-  বহরে ৬৮ আসনের ৭২-৫০০ মডেলের ছয়টি নিজস্ব এয়ারক্রাফট রয়েছে।

-  অভ্যন্তরীণ রুটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, যশোর, সৈয়দপুর, সিলেট, বরিশাল ও রাজশাহী এবং আন্তর্জাতিক রুটে কলকাতায় প্রতিদিন ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

-  যাত্রীদের বিশেষ সুবিধা দিতে দেশে সর্বপ্রথম ‘স্মাইলস’ নামে ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লায়ারস প্রগ্রাম চালু করেছে।

 

দেশের বেসরকারি এয়ারলাইনসের অভিযাত্রায় সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী। এর কারণ জানতে চাইলে মফিজুর রহমান বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশ ছাড়া প্রাইভেট এয়ারলাইনসের যাত্রা শুরু নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে। শুরুর পর থেকে প্রায় দুই দশকের অভিযাত্রায় আমাদের সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতা অনেক বেশি। এই সময়ে মোট ৯টি প্যাসেঞ্জার এয়ারলাইনস কার্যক্রম শুরু করলেও মাত্র তিনটি এয়ারলাইনস অদ্যাবধি টিকে আছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে বর্তমানে বেসরকারি রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, নভোএয়ার ও ইউএস বাংলা ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বন্ধ হয়ে গেছে এ্যারো বেঙ্গল, এয়ার পারাবাত, এয়ার বাংলাদেশ, রয়েল বেঙ্গল এয়ার, বেস্ট এয়ার, জিএমজি এয়ারলাইনস এবং ইউনাইটেড এয়ার। অস্বচ্ছ ধারণার ওপর ভিত্তি করে আমরা অগ্রসর হয়েছি এবং দ্বিতীয়ত, আমরা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের কাছে এয়ারলাইনস খাতের বিশেষত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। যার ফলে আমাদের যাত্রা শুরু থেকে যে সমস্যার তিমিরে ছিলাম, আজও তার থেকে খুব বেশি অগ্রসর হতে পারিনি।’

২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রা শুরু করে নভোএয়ার। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও যশোরে ফ্লাইট চালায় সংস্থাটি। ২০১৪ সালের ২ জানুয়ারি দেশের চতুর্থ বিমান সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক আকাশে ওড়ার ছাড়পত্র পায় নভোএয়ার। এরপর ২০১৫ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে ইয়াংগুনে যাত্রার মধ্য দিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু করে। যদিও রোহিঙ্গা সংকটের পর এই রুটে যাত্রী কমে গেলে তা বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে সবগুলো অভ্যন্তরীণ রুটসহ আন্তর্জাতিক রুটে শুধু কলকাতায় ফ্লাইট পরিচালনা করছে নভোএয়ার। আপাতত অভ্যন্তরীণ রুটেই সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চালানো  নিরাপদ মনে করছি। ভবিষ্যতে নভোএয়ারকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে প্রথমে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে এবং পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট পরিচালনার ইচ্ছা আমাদের আছে। তবে তার জন্য আমাদের আরো অনেক দূর যেতে হবে।’

নভোএয়ারের এমডি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা অভ্যন্তরীণ রুটে যে সেবা দিতে চেয়েছিলাম পুরোপুরি না হলেও তার কাছাকাছি যেতে সক্ষম হয়েছি। অনটাইম অপারেশন শতভাগে উন্নীত করতে আমাদের ব্যাকআপ এয়ারক্রাফট প্রয়োজন। আবহাওয়া, ভিভিআইপি মুভমেন্টসহ নানা কারণে আমরা কখনো কখনো যথাসময়ে গন্তব্যে যেতে পারি না। এ জন্য এ বছর আরো একটি এয়ারক্রাফট আমাদের বহরে যুক্ত হবে।’

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সৈয়দপুর, যশোর, কক্সবাজার রুট সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। কিন্তু চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও রাজশাহী রুট খুব একটা লাভজনক নয়। এক রুটে কিছুটা লাভ আরেক রুটের লোকসান টানতে চলে যায়। যেসব রুটে একটি সিটের ভাড়াই তিন হাজার টাকা, সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস দুই-আড়াই হাজার টাকায় টিকিট বিক্রি করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই এয়ারলাইনস একই এয়ারক্রাফটে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রী পরিবহন করছে। এটা কোনোভাবেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নয়। এই ভাড়ার প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে যে তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইনস টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে, তারাও কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।

তিনি বলেন, বিগত দশকে এভিয়েশন খাতে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল প্রায় দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশ চীন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রোথ ট্রায়াংগলের মধ্যবর্তী স্থানে থেকে এই উন্নয়নের ধারার বাইরে থাকতে পারে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্ভাবনার আলোকে বাংলাদেশকে একটি এভিয়েশন রিজিয়নাল হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান। যা আমাদের ঐকান্তিক চেষ্টার মাধ্যমে অবশ্যই অর্জন করা সম্ভব। সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের এই খাতের অবদান ও সমস্যা প্রথমে চিহ্নিত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। সোনার ডিমপাড়া হাঁস অত্যধিক চার্জ, ট্যাক্স-ভ্যাটের ফাঁস দিয়ে মেরে না ফেলে তাকে পরিচর্যা করতে হবে।

তিনি বলেন, যেকোনো দেশের প্রেক্ষাপটে স্বল্প সময়, স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপদে আকাশপথে ভ্রমণের জন্য এয়ালইনসের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ফ্লাইং ক্লাব এবং হেলিকপ্টার অপারেটর নিজস্ব ক্ষেত্র থেকে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে যাচ্ছে।

নভোএয়ারের এমডি বলেন, এয়ারলাইনসে বিনিয়োগ করতে হয় বিরাট পুঁজি; কিন্তু সাফল্য প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ। পুঁজির মতো এয়ারলাইনস পরিচালনার জন্য বিশাল ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়।

‘বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ভাগে একটা এয়ারলাইনসের জন্য ফ্লাইট অপারেশন, মেইনটেন্যান্স শপ, গ্রাউন্ড অপারেশন, সর্বোপরি অতি আবশ্যকীয় মেইনটেন্যান্স হ্যাঙ্গারের প্রয়োজন হয়, যা যাত্রীনিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এই অতি আবশ্যক হ্যাঙ্গার বিমান ছাড়া অন্য কোনো এয়ারলাইনসের নেই। ফলে এয়ারক্রাফটের প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তেমনি যাত্রীনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করেও অদ্যাবধি এই সমস্যার সমাধান করা যায়নি। বিমানবন্দরে স্থান বরাদ্দের ক্ষেত্রে এয়ারলাইনস সর্বত্র প্রাধিকার পেয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চিত্রটা ভিন্ন। সব এজেন্সিকে প্রাধিকার দিয়ে এয়ারলাইনসের প্রয়োজনীয়তা সব শেষে বিবেচিত হয়। যেমন প্রায়োরিটি প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জ স্থাপনের জন্য এয়ারলাইনস যেখানে প্রাধিকার পাওয়ার কথা, সেখানে বিবিধ ব্যাংককে স্থান বরাদ্দ দেওয়া হলেও দেশীয় এয়ারলাইনস এই ক্ষেত্রে বঞ্চিত।’ যোগ করেন মফিজুর রহমান।

দেশীয় এয়ারলাইনসের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমানের সঙ্গে বেসরকারি খাতের এয়ারলাইনসগুলো এক বিরাট ও অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন উল্লেখ করে মফিজুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্র প্রদত্ত ভর্তুকির মাধ্যমে দুই যুগ আগেকার ভাড়ায় বিমান টিকিট বিক্রি করতে পারলেও বেসরকারি এয়ারলাইনস বাস্তবিক কারণেই সেই ভাড়ায় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমাদের ভাবতে হবে—বাংলাদেশে এভিয়েশন খাতের উন্নয়ন করতে হলে বেসরকারি বিমান সংস্থাকে এই অসম প্রতিযোগিতার হাত থেকে রেহাই দিতে হবে। আমাদের এভিয়েশন খাতের নীতিগুলো অনেক পুরনো, যেখানে অসামঞ্জস্যতা ও বৈপরীত্য বিদ্যমান। যার ফলে এয়ারলাইনস পরিচালনার জন্য আমাদের বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।’

একটি এয়ারলাইনসের পরিচালনা ব্যয়ের ৪০ শতাংশই যায় জ্বালানি খাতে। কিন্তু দেশে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জ্বালানি তেলের মূল্য অসহনীয় পর্যায়ে বলে জানালেন নভোএয়ারের এমডি। তিনি বলেন, ‘একই জ্বালানি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ অধিক মূল্যে ক্রয় করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে মূল্য বেড়ে যায়; কিন্তু মূল্য কমে গেলে সেটা আর আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয় না। এ অবস্থায় প্রাইভেট এয়ারলাইনস টিকিয়ে রাখা এক অসম্ভব কল্পনা। সব নিয়ম-কানুন যুগোপযোগী করা জরুরি। এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মডেল অনুসরণ করতে পারি।’

তিনি বলেন, একটি বিমানকে নিরাপদ ও উড্ডয়ন উপযোগী রাখতে প্রতিনিয়ত বিপুল যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়, যা জরুরি ভিত্তিতে আমদানি করতে হয়। এই যন্ত্রাংশের আমদানিপ্রক্রিয়া, কাস্টমস ছাড়করণ এবং নিরূপিত ট্যাক্স অসহনীয় পর্যায়ে। যদিও এয়ারক্রাফট এবং ইঞ্জিন যন্ত্রাংশের ওপর কোনো ট্যাক্স প্রযোজ্য নয়; কিন্তু অনেক যন্ত্রাংশই সাধারণ ব্যবহার্য দ্রব্যাদির ট্যাক্স কোডে মূল্যায়ন করা হয়। যা আমি অযৌক্তিক এবং এয়ারলাইনসের টিকে থাকার জন্য প্রতিবন্ধক বলে মনে করি।

মন্তব্য