kalerkantho

শনিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৪ রজব ১৪৪২

পাল্টে যাওয়া যোগাযোগ মানচিত্র

বাংলাদেশে একটি সড়ক বিপ্লব ঘটে গেছে। গত এক দশকের এই বিপ্লব পাল্টে দিয়েছে দেশের যোগাযোগ মানচিত্র ও জীবনমানের সূচক। বদলেছে গ্রামীণ অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন চিত্র, বেড়েছে শিক্ষার হার, শিল্প-কারখানা। গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে বাংলাদেশ এরই মধ্যে এগিয়ে রয়েছে নেপাল, পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে। সড়কের পাশাপাশি সম্প্রসারিত ও আধুনিকায়ন হচ্ছে রেলপথ

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পাল্টে যাওয়া যোগাযোগ মানচিত্র

ছবি : শেখ হাসান

১৯৯০ সাল। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলা সদর ও ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার দক্ষিণাংশের মানুষের ঢাকা শহরে আসতে প্রথমে মুকসুদপুর থেকে বাটিকামারী হয়ে বরইতলা এসে অপেক্ষা করতে হতো ফরিদপুরগামী বাসের জন্য। ভাঙ্গা হয়ে ফরিদপুর তারপর গোয়ালন্দ-আরিচা হয়ে ঢাকায় পৌঁছতে ভোর থেকে লেগে যেত মধ্যরাত। পাড়ি দিতে হতো ২৭৫ কিলোমিটার। কষ্ট কিছুটা কমে ২০১০ সালে, নগরকান্দার চাদহাট একটি পল্লী সড়ক ফরিদপুর শহরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে। ২০১২ সালে ঢাকা-মাওয়া-গোপালগঞ্জ-খুলনা সড়ক চালু হওয়ার পর ওই এলাকার মানুষের রাজধানীর সঙ্গে যাতায়াতের পথ পুরোপুরি পাল্টে যায়। এখন অপেক্ষা শুধু পদ্মা সেতুতে যান চলাচল শুরু হওয়ার। তখন সময় লাগবে মাত্র দেড় ঘণ্টা। দূরত্ব হবে মাত্র ৬৫ কিলোমিটার।

২০১২ সালে ঢাকা-মাওয়া খুলনা সড়ক যান চলাচল উপযোগী হওয়ার পর থেকেই একসময়ের দুর্গম এলাকা হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে শুরু হয় ছোট-বড়-মাঝারি আকারের হাঁস-মুরগি ও গরুর খামার। গড়ে ওঠে একের পর এক পেট্রল পাম্প, নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে একাধিক জুটমিলের।

বাংলাদেশে একটি সড়ক বিপ্লব ঘটে গেছে। গত এক দশকের এই বিপ্লব পাল্টে দিয়েছে দেশের যোগাযোগ মানচিত্র ও জীবনমানের সূচক। বদলেছে গ্রামীণ অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন চিত্র, বেড়েছে শিক্ষার হার, শিল্প-কারখানা। গ্রামীণ সড়ক নির্মাণে বাংলাদেশ এরই মধ্যে এগিয়ে রয়েছে নেপাল, পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে। সড়কের পাশাপাশি সম্প্রসারিত ও আধুনিকায়ন হচ্ছে রেলপথ। নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্পসহ নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ এবং হাজার কয়েক ছোট-বড় সেতু, কালভার্ট, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস।

সড়ক-মহাসড়ক বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে দেশে জাতীয় সড়ক হচ্ছে তিন হাজার ১০৬.০৩ কিলোমিটার। আঞ্চলিক মহাসড়ক চার হাজার ৪৪৮.৫৪০ কিলোমিটার এবং জেলা সড়ক ১৩ হাজার ২০৬.১২৩ কিলোমিটার। মোট ২১ হাজার ৫১৫ কিলোমিটার।

সড়ক নির্মাণ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটিয়েছে পল্লী সড়ক। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য মতে, ১৯৯০ সালে দেশে গ্রামীণ জনপদে পাকা সড়ক ছিল মাত্র আট হাজার ৬৭০ কিলোমিটার। ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ৫২৯.০৪ কিলোমিটার। দেশে কাঁচা সড়কের পরিমাণ দুই লাখ ২৪ হাজার ৮২৪.৪১ কিলোমিটার। কাঁচা ও পাকা মিলে পল্লী সড়কের পরিমাণ তিন লাখ ৫৩ হাজার ৩৫৩.৪৫ কিলোমিটার।

ঢাকা-মাওয়া-পাচ্চর মহাসড়ক চার লেন করার কাজ চলছে। এটি দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতায় নির্মাণ করা হচ্ছে চার লেনের ফ্লাইওভার। চার লেন করা হচ্ছে কুমিল্লার লাকসাম থেকে নোয়াখালীর সোনাপুর সড়কসহ একাধিক সড়ক ও মহাসড়ক। দেশের প্রথম আট লেন করা হয়েছে যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর মহাসড়ক।

এ ছাড়া সড়ক-মহাসড়ক বিভাগের অধীনে মেগাপ্রকল্পসহ ১৩৯টি বড় আকারের প্রকল্প চলমান, যা বদলে দেবে রাজধানী শহরসহ গোটা দেশের যোগাযোগ মানচিত্র। এগুলো হচ্ছে ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্টের পাঁচটি প্রকল্প, যা মেট্রো রেল নামে পরিচিত। বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে পায়রা নদীর ওপর পায়রা সেতু (লেবুখালী সেতু) নির্মাণ। গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প। জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহাসড়ক। কাঁচপুর, গোমতী দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ। ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প। মাতারবাড়ী পোর্ট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প। ক্রস-বর্ডার নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প। আশুগঞ্জ নদীবন্দর, আখাউড়া স্থলবন্দর চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প। কুমিল্লা-নোয়াখালী, ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প। পার্বত্য জেলাগুলোতে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প প্রথম পর্যায়। সিলেট-তামাবিল সড়ক প্রশস্ত করে চার লেনে উন্নীতকরণ। ফরিদপুর-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প। উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ হাতিরঝিল-রামপুরা-বনশ্রী-আমুলিয়া-ডেমরা মহাসড়কে (চিটাগাং রোড এবং তারাব লিংক মহাসড়ক সংযোগসহ) ডিপিপি ভিত্তিতে চার লেনে উন্নীতকরণ।

বিশ্বব্যাংকের এক  হিসাবে বলা হয়েছে, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পল্লী সড়ক ব্যবস্থার ঘনত্ব বেশি নিবিড়। প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাংলাদেশে সড়ক নির্মিত হয়েছে ২১০ কিলোমিটার, যেখানে ভারতে ১৩৬ কিলোমিটার, পাকিস্তানে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার এবং নেপালে ১৪ কিলোমিটার। খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১০-এর তথ্য মতে, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বেড়েছে ৬৭ শতাংশ। ব্যাপক হারে সড়ক নির্মাণের ফলে গ্রাম-শহরের একটি সেতুবন্ধ যেমন তৈরি হয়েছে, একইভাবে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক যোগাযোগও। সবল হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।

লায়েকুজ্জামান

মন্তব্য