kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বিশ্ব ঐতিহ্য মানবতার অধরা সম্পদ

জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত করে থাকে। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বাউলগান, জামদানি শাড়ি বা জামদানি বয়ন শিল্প, মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সিলেট অঞ্চলের শীতলপাটি ইউনেসকোর এই তালিকায় স্থান পেয়েছে

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বিশ্ব ঐতিহ্য মানবতার অধরা সম্পদ

মঙ্গল শোভাযাত্রা। ছবি : শেখ হাসান

জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য Intangible Cultural Heritage বা মানবতার নির্বস্তুক/অধরা/অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে থাকে। Intergovernmental Committee for the Safeguarding of the Intangible Cultural Heritage এই তালিকা করে। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বাউলগান, জামদানি শাড়ি বা জামদানি বয়ন শিল্প, মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সিলেট অঞ্চলের শীতলপাটি ইউনেসকোর এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।

 

মঙ্গল শোভাযাত্রা

বঙ্গাব্দের প্রথম দিন বাংলা বর্ষবরণ উৎসব বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। আবহমান কাল থেকে ব্যবসায়ীদের হালখাতার মাধ্যমে এবং গ্রামীণ জনপদে এই উৎসব চলে আসছে। ১৩৭১ বঙ্গাব্দের (১৯৬৪ সাল) পহেলা বৈশাখ রাজধানীর রমনা বটমূলে ছায়ানট বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু করে। কালক্রমে এই প্রভাতি আয়োজন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বর্ষবরণ উৎসবের আরেকটি প্রধানতম অনুষঙ্গ হিসেবে ১৯৮৯ সালে যুক্ত হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। তখন দেশে ছিল সামরিক স্বৈরশাসন। নতুন বছরে শান্তির প্রত্যাশা ও অপশক্তির বিনাশ কামনায় ঘটে সংস্কৃতির নবতর এই সংযোজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বর্তমান ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন তখন ছিলেন একজন তরুণ শিক্ষক। তিনি বলেন, তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার বিপরীতে সব ধর্মের মানুষের জন্য বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে ঢাকা শহরের শাহবাগ-রমনা এলাকায় বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজন শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হয় এই শোভাযাত্রা। এতে বহন করা হয় বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানা প্রতীকী উপকরণ, বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি, যা চারুকলার শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাসব্যাপী প্রস্তুতি নিয়ে নির্মাণ করে থাকে। সমসাময়িক কোনো একটি প্রতিপাদ্যের ওপর ভিত্তি করেই এগুলো তৈরি হয়।

আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু থেকেই জনপ্রিয়তা পায়। তবে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে চারুকলার শোভাযাত্রা জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা লাভ করে। চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের উদ্যোগে হওয়া সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য, সংস্কৃতিকর্মী, লেখক, শিল্পীসহ সাধারণ নাগরিকরাও অংশ নেয়।

শুরুতে নাম ছিল বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। অধ্যাপক নিসার হোসেন জানান, শুরুতে নামটি মঙ্গল শোভাযাত্রাই দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তাদের। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতিতে এর ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হতে পারে—এই আশঙ্কায় নামটি দেওয়া হয়নি। ১৯৯৬ সাল থেকে এটি মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে পরিচিত লাভ করে। তবে বর্ষবরণ উপলক্ষে যশোরে ১৯৮৬ সালে চারুপীঠ নামের একটি প্রতিষ্ঠান নববর্ষ উপলক্ষে প্রথমবারের মতো আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে বলে জানা যায়।

ধর্মীয় মৌলবাদীদের ভুল ব্যাখ্যা ও বিরোধিতা সত্ত্বেও মঙ্গল শোভাযাত্রা একটি অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন উৎসব হিসেবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। অশুভ শক্তির বিনাস, শান্তি ও কল্যাণময় ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় প্রতিবছরই নব নব উদ্যমে বের হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। অংশ নেয় হাজার হাজার মানুষ।

২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে ইউনেসকো মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

 

বাউলগান

বাউলগান মূলত বাউল সম্প্রদায়ের গান। ওই সম্প্রদায়ের সাধনসংগীত। বাংলার সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যের একটি বিশেষ অংশ। বাউলরা তাঁদের দর্শন ও মত বাউলগানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে থাকেন। অনুমান করা হয়, খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতক কিংবা তার আগে থেকেই বাংলায় এই গানের প্রচলন ছিল। বাউলগানের প্রবক্তাদের মধ্যে লালন শাহ প্রধান। বাউল মতে, সতেরো শতকে জন্ম নিলেও লালন শাহর গানের মাধ্যমে উনিশ শতক থেকে বাউলগান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন শুরু করে। মাটি, মানুষ, প্রকৃতি, জীবনবোধ, ধর্ম, প্রেম এবং দেশের কথাই বেশির ভাগ সময় উঠে এসেছে লালনের গানে। উদার মানবতাবাদই মুখ্য। একই সঙ্গে উঠে এসেছে অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে লালনের গান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে। রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহ করে ১৯২২ সালে ভারতীয় পত্রিকার হারামণি শাখায় চার ভাগে ২০টি গান প্রকাশ করেন।

বাউলগান সাধারণত দুটি ধারায় পরিবেশিত হয়। আখড়া-আশ্রিত সাধনসংগীত এবং আখড়াবহির্ভূত অনুষ্ঠানভিত্তিক। আখড়া-আশ্রিত গানের ঢং ও সুর শান্ত ও মৃদু তালের। জনসমক্ষে এই গান চড়া সুরে গীত হয়। সঙ্গে একতারা, ডুগডুগি, খমক, ঢোলক, সারিন্দা, দোতারা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। বাউলগানে সুফিভাবনাই প্রবল। সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এতে একটা উদাসী ভাব লক্ষ করা যায়। এর সুরে যেন মিশে থাকে না পাওয়ার এক বেদনা। বাউলগানের একটি বড় সম্পদ তাঁর গায়কি বা গায়নশৈলী।

বাউল একটি দর্শন। বাউলদের জীবনযাপনে রয়েছে নিজস্ব রীতি-নীতি, ভাবধারা। বাউলজীবন ধারণ না করেও অনেকে বাউলগান করে থাকেন, যাঁদের সাধারণত বলা হয় বাউলা।

লালনের পর পাণ্ডু শাহ, দুদ্দু শাহ, ভোলা শাহ, পাগলা কানাই, রাধারমণ, কাঙ্গাল হরিনাথ, হাসন রাজা, অতুল প্রসাদ, বিজয় সরকার, দ্বিজ দাস, জালাল খাঁ, উকিল মুন্সী, রশিদ উদ্দিন, শাহ আব্দুল করিম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ কবি, বাউল ও বাউলার মাধ্যমে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী লোকায়ত সংগীতের ধারাটি আরো পুষ্ট হয়েছে।

ইউনেসকো ২০০৫ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলার বাউলগানকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে।

 

জামদানি

জামদানি হলো কার্পাস তুলা দিয়ে তৈরি এক ধরনের পরিধেয় বস্ত্র, যার বয়নপদ্ধতি অনন্য। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙালি নারীর কাছে প্রিয়। মসলিনের ওপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। হাতে বোনা হওয়ায় জামদানি শাড়ির ডিজাইন হয় খুব সূক্ষ্ম, নিখুঁত ও মসৃণ। মান মূলত তাঁতির দক্ষতা ও কাজের সূক্ষ্মতার ওপর নির্ভর করে। কারিগর প্রতিটি সুতা হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুনন করেন। সুতার কোনো অংশ বের হয়ে থাকে না। এ কারণে জামদানি শাড়ির কোনটি সামনের অংশ আর কোনটি ভেতরের অংশ, তা পার্থক্য করা বেশ কঠিন। বুননকালে তৃতীয় একটি সুতা দিয়ে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। প্রধান বৈশিষ্ট্য এর জ্যামিতিক নকশা। নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয় নানা ধরনের ফুল, লতাপাতাসহ নানা ডিজাইন।

একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে দুজন কারিগর যদি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দেন, তাহলে ডিজাইনভেদে পুরো শাড়ি তৈরি হতে সাত দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। একটি শাড়ির দাম তিন হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা কিংবা তার চেয়েও বেশি হতে পারে। এখন মেশিনে বোনা শাড়িও পাওয়ায় যায়। কিন্তু দাম তুলনামূলক অনেক কম। নান্দনিক ডিজাইন এবং দামে বেশি হওয়ায় জামদানির সঙ্গে আভিজাত্য ও রুচিশীলতা—এই দুটি শব্দ জড়িয়ে আছে।

নানা স্থানে তৈরি হলেও ঢাকাকেই জামদানির আদি জন্মস্থান বলে গণ্য করা হয়। ঢাকাই মসলিনের স্বর্ণযুগ বলা হয় মোগল আমলকে। সে সময় দেশে-বিদেশে মসলিন, জামদানির চাহিদা বাড়তে থাকে এবং শিল্পেরও ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। প্রকাশিত এক তথ্য থেকে জানা যায়, ১৭৮৭ সালে ৫০ লাখ (কারো মতে ৩০ লাখ) টাকার মসলিন ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হয়েছিল। কিন্তু ১৮০৭ সালে এই পরিমাণ ৮.৫ লাখ টাকায় নেমে আসে। ১৮১৭ সালে রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এই শিল্প সংকুচিত এবং পরে বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব। এর ফলে বস্ত্রশিল্পে যন্ত্রের আগমন ঘটে এবং কম মূল্যে ছাপার কাপড় উৎপাদন শুরু হয়। ফলে ধীরে ধীরে মসলিন ও জামদানি শিল্প কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়। তার পরও জামদানি শাড়ি সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

জামদানি বয়নের অতুলনীয় পদ্ধতির কারণে ২০১৬ সালে ইউনেসকো একটি অনন্যসাধারণ নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

 

শীতল পাটি

শীতল পাটি মেঝেতে পাতা এক ধরনের আসন। ঐতিহ্যগত একটি কুটির শিল্প। মুর্তা বা পাটি বেত নামের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছাল থেকে এগুলো তৈরি হয়ে থাকে। এই হস্তশিল্প শহরে শোপিস এবং গ্রামে এটি মাদুর ও চাদরের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। নকশা করা মাদুরকে নকশি পাটি বলা হয়। গরমের দিনে শীতল পাটিতে বসে বা শুয়ে যে আরামদায়ক শীতল অনুভূতি পাওয়া যায়, তা ব্যাখ্যাতীত। আধুনিক নগরজীবনেও বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের আসন হিসেবে শীতল পাটির ব্যবহার অব্যাহত আছে। শীতল পাটির খণ্ডাংশ অন্যান্য হস্তশিল্পজাত পণ্য তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। এর দাম আকার অনুযায়ী বিভিন্ন হয়। নকশা করা পাটির দাম বেশি হয়ে থাকে।

সিলেট এই পাটির জন্য বিখ্যাত। সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানের পাটিকররা তাঁদের নিপুণতার জন্য শত শত বছর ধরে প্রসিদ্ধ।

ইউনেসকো ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সিলেট অঞ্চলের শীতল পাটি বুননের ঐতিহ্যগত হস্তশিল্পকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

আজিজুল পারভেজ