kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

একুশে ফেব্রুয়ারি এখন সারা বিশ্বের

প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ড এবং দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে জন্ম হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের। জন্ম থেকেই মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে সূচনা হয় আন্দোলনের। আর এই ভাষা আন্দোলনকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পথে প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একুশে ফেব্রুয়ারি এখন সারা বিশ্বের

প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ড এবং দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে জন্ম হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের। জন্ম থেকেই মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে সূচনা হয় আন্দোলনের। আর এই ভাষা আন্দোলনকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পথে প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়।

সদ্যঃস্বাধীন পাকিস্তানে উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে শুরু হয় প্রতিবাদ। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণার দাবি ওঠে। এ লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের মার্চে শুরু হওয়া আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালে। ছাত্রদের প্রতিবাদ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করা হয়। পুনরায় ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট এবং ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবসরূপে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মুসলিম লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীন ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কলা ভবনের (বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল) আমগাছতলায় সমবেত হয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে বেরিয়ে আসেন। পুলিশ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর বেপরোয়া কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং তাঁদের লাঠিপেটা করে। একপর্যায়ে পুুলিশ মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের দিকে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থান থেকে গুলি চালায়। গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত, শিল্প বিভাগের পিয়ন আবদুস সালাম, মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র রফিকউদ্দীন ও গফরগাঁওয়ের অধিবাসী আব্দুল জব্বার শহীদ হন।

ভাষার দাবির অপরাধে বর্বর হত্যাকাণ্ডের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশ, বিশেষত ঢাকা নগরী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সর্বত্র কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে এক গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার পর ঢাকায় ইতিহাসের সর্ববৃহৎ শোকযাত্রা বের হয়। শোকযাত্রাটি হাইকোর্ট ও কার্জন হলের মাঝখানে রাস্তায় এলে পুলিশ আবার গুলি চালায়। শহীদ হন হাইকোর্টের কর্মচারী শফিউর রহমান ও রিকশাচালক আউয়াল। দুই দিনে পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনীর গুলি ও বেয়নেট চার্জে অন্তত আটজন শহীদ হন। পুলিশ অনেকের লাশ সরিয়ে ফেলে। এর মধ্যে দুজন ছিল বালক, যার একজন ছিল শিশুশ্রমিক অহিউল্লাহ।

বাংলা ভাষার দাবিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রথম বাঙালি যেখানে শহীদ হয়েছিলেন, সেখানে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতেই একটি শহীদ মিনার বানিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশের এই প্রথম শহীদ মিনারটি ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বাঙালির সাংস্কৃতিক তীর্থক্ষেত্র এবং সংগ্রামী প্রেরণার উৎসস্থল হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সংবিধানে বাংলাকে উর্দুর সঙ্গে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি স্বীকৃতি পায়। ১৯৫৩ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের স্মরণে ‘শহীদ দিবস’ রূপে পালিত হয়ে আসছে। কালো পতাকা, প্রভাতফেরি, খালি পায়ে শোভাযাত্রা, শহীদদের কবর ও নিশ্চিহ্ন শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু হয়। যেখানেই বাঙালি আছে, সেখানেই একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির আত্মত্যাগের ও জাগরণের গৌরবময় দিন হিসেবে পালন করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যে ‘বাংলা ভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে এই দিনটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ভাষাশহীদদের রক্তস্মৃতিবিজড়িত স্থানে পরে নির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন দেশের বাঙালি অধ্যুষিত স্থানে গড়ে উঠেছে অগণিত শহীদ মিনার। করুণ সুরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গান গেয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় সর্বস্তরের মানুষ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। বাংলা একাডেমি ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে আয়োজন করে অমর একুশে বইমেলা।

বাঙালির এই গৌরবময় দিনকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন ভাষাশহীদদের নামে নাম রাখা দুই প্রবাসী বাঙালি। কানাডার ভ্যাংকুভার শহরে বসবাসরত রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম। তাঁরা একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানান জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ১৯৯৮ সালে। জাতিসংঘ মহাসচিবের অফিস থেকে আবেদনকারীদের জানিয়ে দেওয়া হয়, বিষয়টির জন্য নিউ ইয়র্কে নয়, যোগাযোগ করতে হবে প্যারিসে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন ইউনেসকোর সঙ্গে। আর বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই, ইউনেসকোর পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে সভায় এটি তুলে ধরা হবে। এরপর কানাডা থেকে রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে ত্বরিত উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে ইউনেসকোর সদর দপ্তরে এসংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠান।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব পাস হয়। পৃথিবীর সব ভাষার মানুষের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায়। বিশ্বদরবারে বাংলা ভাষা লাভ করে বিশেষ মর্যাদা।

ঠিক পরের বছর ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন শুধু বাঙালির নয়, সারা বিশ্বের, সারা বিশ্বের মাতৃভাষাপ্রিয় সব মানুষের।

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। বিলুপ্তপ্রায় মাতৃভাষাগুলো রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

আজিজুল পারভেজ