kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

সাংস্কৃতিক বোধ বদলে দেওয়া একুশে টিভি

একুশে টেলিভিশন শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার টেলিভিশন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। শুধু টিভি সাংবাদিকতাই নয়, টেলিভিশনের সংবাদ-বিনোদন বলতে আমরা যা বুঝি, সেই বোঝার জগতে একটি বিপ্লব। গতানুগতিকতার বাইরে এটি নিয়ে এসেছিল নতুন ধারণা। আধুনিক, উদার, মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক টিভি চ্যানেল হিসেবে একুশে টিভি খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এ দেশেএকুশে টেলিভিশন শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার টেলিভিশন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। শুধু টিভি সাংবাদিকতাই নয়, টেলিভিশনের সংবাদ-বিনোদন বলতে আমরা যা বুঝি, সেই বোঝার জগতে একটি বিপ্লব। গতানুগতিকতার বাইরে এটি নিয়ে এসেছিল নতুন ধারণা। আধুনিক, উদার, মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক টিভি চ্যানেল হিসেবে একুশে টিভি খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এ দেশে

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাংস্কৃতিক বোধ বদলে দেওয়া একুশে টিভি

একুশে টেলিভিশন শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার টেলিভিশন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। শুধু টিভি সাংবাদিকতাই নয়, টেলিভিশনের সংবাদ-বিনোদন বলতে আমরা যা বুঝি, সেই বোঝার জগতে একটি বিপ্লব। গতানুগতিকতার বাইরে এটি নিয়ে এসেছিল নতুন ধারণা। আধুনিক, উদার, মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক টিভি চ্যানেল হিসেবে একুশে টিভি খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এ দেশে। ফেলেছিল সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

নামকরণের ক্ষেত্রে ছিল চমক। বেছে নেওয়া হয় বাঙালির জাগরণের অধ্যায়কে। বাঙালির অনন্য গৌরবের বায়ান্নর একুশের নামে—একুশে টেলিভিশন বা ইটিভি। যাত্রা শুরু হয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব, বাংলা নববর্ষের দিনে, ২০০০ সালের ১৪ এপ্রিল।

রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) বাইরে একুশে টিভি বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল। দেশের রাজনৈতিক দল ও সুধীসমাজ দীর্ঘ সময় ধরে যেখানে গণমাধ্যমে স্বাধীনতা ও বিটিভির স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আসছিল, তার প্রেক্ষাপটে ইটিভির মতো চ্যানেল ছিল বহু আকাঙ্ক্ষিত। দর্শক আকাঙ্ক্ষার ষোলোকলাই পূর্ণ করেছিল ইটিভি।

বিবিসির খ্যাতনামা সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ও ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বর হত্যাযজ্ঞের খবর প্রথম বহির্বিশ্বে প্রকাশকারী বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু সাইমন ড্রিং শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন ইটিভির সঙ্গে।

খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে নতুনত্ব ও অভিনবত্ব থাকার কারণে টিভি চ্যানেলটি দর্শকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। অভিজ্ঞ সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের নেতৃত্বে একঝাঁক তরুণ সাংবাদিক রীতিমতো তারকা হয়ে ওঠেন।

ইটিভির খবর ছাড়াও সংবাদধর্মী অনুষ্ঠান একুশের রাত; বিশেষায়িত টক শো—একুশের দুপুর, শেয়ারবাজার, শিশুস্বাস্থ্য; খবর বিশ্লেষণ—দেশজুড়ে, ক্রাইম ওয়াচ; ছোটদের খবর—মুক্ত খবর প্রভৃতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

বিনোদনজগতেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। মুক্ত ও স্বাধীন নির্মাতারা নতুন নতুন ধারণা নিয়ে নাটক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে থাকেন। সত্যি বললে আমাদের সাংস্কৃতিক চিন্তায়ই নতুন ভাষা নিয়ে আসে ইটিভি। সাইদুল আনাম টুটুল, গিয়াসউদ্দিন সেলিম, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরুল আলম আতিকের মতো নির্মাতারা যেন এমন একটি প্ল্যাটফর্মের অপেক্ষায়ই ছিলেন। নতুন ধারার এই নাটক বা অনুষ্ঠানে প্রথাগত ধারণা পেরিয়ে অভিনয়ের সুযোগও বিস্তৃত হয় আমাদের শিল্পীদের। মোটকথা আমাদের নাটক, সিনেমা বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণা বদলে নতুন পথ দেখায় স্বল্পস্থায়ী চ্যানেলটি।

সম্পূর্ণ প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত এই টিভি চ্যানেলটি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বৈরিতারও মুখোমুখি হয়। দেশের প্রগতিবিরোধী ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী শুরু থেকে এই চ্যানেলের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি-জামায়াত সরকারের প্রথম আক্রোশের শিকার হয় একুশে টিভি। নানা প্রকার চাপ ও মামলার মাধ্যমে ২০০২ সালের ২৯ আগস্ট একুশে টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় মুক্তিযুদ্ধের মহান বন্ধু সাইমন ড্রিংকে। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ এস মাহমুদ একুশে টিভি বন্ধ হওয়ার পর বিদেশে চলে যান এবং ভগ্নহৃদয়ে প্রবাসেই ইন্তেকাল করেন।

উন্মুক্ত টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন কেন্দ্র হিসেবে সম্প্রচার শুরু করেছিল ইটিভি। বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতা হারানোর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ থেকে নতুন মালিকানায় ইটিভি আবার সম্প্রচার শুরু করলেও আর টেরেস্ট্রিয়াল ব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি।

দেশের একসময়ের বহুল আলোচিত ও ব্যাপক জনপ্রিয় একুশে টেলিভিশন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে না এখনকার এই চ্যানেল দেখে। তবে এ দেশের বেসরকারি টেলিভিশনের যে জগৎ তার দিকে তাকালে স্পষ্টই দেখা যায় ইটিভির প্রভাব। দেশে যে ৩০টি বেসরকারি টেলিভিশন রয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছেন যাঁরা, তাঁরা মূলত একুশে টিভির মাধ্যমে তৈরি হওয়া প্রজন্ম। একুশে টিভির ধারণাপ্রসূত অনুষ্ঠানই সম্প্রচার হচ্ছে সব চ্যধানেলে। তার বাইরে খুব একটা নতুন ধারণার সংযোজন ঘটেনি। একুশে টিভির মাধ্যমে বেসরকারি টেলিভিশনের যে সম্ভাবনার সূচনা হয়েছিল তার ফলে বিপুল কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরাসরি জনবল নিয়োগ ছাড়াও প্যাকেজ নাটক-অনুষ্ঠান নির্মাণ কর্মযজ্ঞেও জড়িয়ে আছে বিপুল জনগোষ্ঠী। একুশে টেলিভিশনকে এ দেশের ৫০ বছরের অন্যতম অর্জন হিসেবে অনায়াসে চিহ্নিত করা যায়।

আজিজুল পারভেজ