kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় আমাদের তিন নিদর্শন

ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক গুরুত্বের জন্য বাংলাদেশের তিনটি নিদর্শন বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্বমহিমায় জায়গা করে নিয়েছে।

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় আমাদের তিন নিদর্শন

ছবি : শেখ হাসান

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার

পাহাড়পুরকে বিশ্বের অন্যতম বড় বৌদ্ধ বিহার বলা যেতে পারে। পাহাড়পুর নামে পরিচিতি পেলেও বিহারটির প্রকৃত নাম সোমপুর বিহার। আয়তনে এটির সঙ্গে ভারতের নালন্দা মহাবিহারের তুলনা হতে পারে। ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধদের বিখ্যাত ধর্মচর্চার কেন্দ্র ছিল এটি। শুধু উপমহাদেশই নয়, চীন, তিব্বত, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধরা এখানে ধর্মচর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে আসতেন। দশম শতকে বিহারের আচার্য ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান।

পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী পুণ্ড্রনগর (বর্তমান মহাস্থানগড়) এবং অপর শহর কোটিবর্ষের (বর্তমান বানগড়) মাঝামাঝি জায়গায় ছিল সোমপুর মহাবিহার। এটির ধ্বংসাবশেষটি এখন নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে।

অনেকে বলে থাকে পাল রাজা গোপালের পুত্র ধর্মপাল নিজের রাজত্বকালে (৭৭৭-৮১০ সাল) এই বিহারটি তৈরি করেন। আবার কেউ কেউ এটির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ধর্মপালের পুত্র দেবপালের (রাজত্বকাল ৮১০-৮৫০) কথাও বলে থাকে। দশম শতাব্দীর শেষভাগে পাল বংশীয় রাজা মহীপাল (৯৯৫-১০৪৩) আবার সোমপুর বিহার মেরামত করেন। কিন্তু মহীপাল ও তাঁর পুত্র নয়াপালের মৃত্যুর পর আবার পাল বংশের পতন শুরু হয়। একই সঙ্গে সোমপুর বিহারের ধ্বংসকালও শুরু হয়।

বৌদ্ধ বিহারটির ভূমি-পরিকল্পনা চতুষ্কোণাকার। উত্তর ও দক্ষিণ বাহুদ্বয় প্রতিটি ২৭৩.৭ মিটার এবং পূর্ব ও পশ্চিম বাহুদ্বয় ২৭৪.১৫ মিটার। এটির চারদিক চওড়া সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। সীমানাপ্রাচীর বরাবর অভ্যন্তর ভাগে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কক্ষ ছিল। উত্তর দিকের বাহুতে ৪৫টি এবং অন্য তিন দিকের বাহুতে রয়েছে ৪৪টি করে কক্ষ। এই কক্ষগুলোর তিনটি মেঝে আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কার করেন। ১৯৮৫ সালে ইউনেসকো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়।

 

ষাটগম্বুজ মসজিদ

দিল্লির তুঘলক সুলতানদের অধীনে আমির ছিলেন খানজাহান। সম্ভবত তৈমুরের দিল্লি আক্রমণের (১৩৯৮ সাল) পরপরই বাংলায় আসেন তিনি। তাঁর সমাধিতে খোদাই করে নাম হিসেবে লেখা আছে ‘উলুঘ খান-ই-আজম খান জাহান’। এ থেকে অনুমান করা হয়, তিনি তুর্কি (উলুঘ) দেশ থেকে এসেছিলেন এবং বাংলা সালতানাতের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা (খান-ই-আজম) ছিলেন। বাংলার সুলতান শাসক নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহর রাজত্বকালে (১৪৩৫-৫৯ সাল) খুলনা অঞ্চলে (যশোর-খুলনা) আসেন খানজাহান। তাঁর নেতৃত্বে দক্ষিণবঙ্গের একটি বৃহৎ অঞ্চলে মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথমে দিল্লির সুলতানের এবং পরে বাংলার সুলতানের কাছ থেকে সুন্দরবন অঞ্চল জায়গির হিসেবে পান। সুন্দরবন এলাকায় গভীর বন কেটে সেখানে জনবসতি গড়ে তোলেন।

খানজাহান ছিলেন একজন প্রখ্যাত নির্মাতা। তিনি বৃহত্তর যশোর ও খুলনা জেলায় কয়েকটি শহর প্রতিষ্ঠা, মসজিদ, মাদরাসা, সরাইখানা, মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ এবং বহুসংখ্যক দিঘি খনন করেন। তাঁর দুর্গবেষ্টিত সুরক্ষিত রাজধানী শহর ‘খলিফাতাবাদ’ ছাড়াও তিনি মারুলি কসবা, পৈগ্রাম কসবা ও বারোবাজারে তিনটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল খলিফাতাবাদ, যা বর্তমান বাগেরহাট জেলা। এক জরিপে দেখা গেছে, খলিফাতাবাদকে কেন্দ্র করে ৫০টিরও বেশি স্থাপনা তিনি তৈরি করেছিলেন। কথিত আছে, খানজাহান ৩৬০টি মসজিদ ও বহু বড় দিঘিও খনন করেছিলেন। ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’ খানজাহানের সবচেয়ে বিখ্যাত কীর্তি। নামাজ আদায়ের পাশাপাশি মসজিদটি খানজাহানের দরবার হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

স্থাপত্যকৌশলে ও লাল পোড়ামাটির ওপর লতাপাতার অলংকরণে মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশিল্পে মসজিদটি এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মসজিদটিকে ‘ষাট গম্বুজ’ বলা হলেও আদতে এতে মোট গম্বুজ আছে ৮১টি।

১৫২৬ সালে দিল্লিতে মোগলদের শাসন শুরু হলে ধীরে ধীরে এখানকার গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৬১০ সালে ঢাকা বাংলার রাজধানী হওয়ায় এই অঞ্চল এক প্রকার লোকচক্ষুর অন্তরালে যেতে থাকে। বনজঙ্গলে গ্রাস করে মসজিদটিকে।

১৮৯৫ সালে এলাকাটিতে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। ১৯০৩-০৪ সালের দিকে ষাট গম্বুজ মসজিদের পুনরুদ্ধার দৃশ্যমান হয়। ১৯০৭-০৮ সালে ছাদের এবং ২৮টি গম্বুজ পুনরুদ্ধার করা হয়। ১৯৮২-৮৩ সালে ইউনেসকো বাগেরহাট এলাকার জন্য একটি বেশ বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৮৫ সালে এটিকে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য স্থানের (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

 

সুন্দরবন

ইতিহাস বলে থাকে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় সুন্দরবনের সৃষ্টি হয়। খানজাহানের সূত্র ধরে বলা যায় সেই সুলতানি আমলেও (১২০৬-১৫২৬) এখানে জনপদ তৈরির প্রচেষ্টা ছিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে জনপদও গড়ে উঠেছিল। সেই সময়ের অনেক নিদর্শন এখন আবিষ্কৃত হচ্ছে।

মোগল আমল (১৫২৬) থেকেই সুন্দরবনকে স্থানীয় রাজাদের কাছে পত্তন বা ইজারা দেওয়া হতো।

মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের কাছ থেকে ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি সুন্দরবনের স্বত্ব লাভ করে এবং ১৭৬৪ সালে সার্ভেয়ার জেনারেল কর্তৃক জরিপপূর্বক মানচিত্র তৈরি করে। বেঙ্গল বন বিভাগ স্থাপনের পর বন আইন ১৮৬৫ অনুযায়ী ১৮৭৫-১৮৭৬ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৯-৭৩ সালে সুন্দরবনে প্রথম জরিপ করা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে পড়ে, যা বাংলাদেশের সমগ্র বনভূমির ৪৪ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বের অন্যতম বড় ম্যানগ্রোভ বন হচ্ছে এই সুন্দরবন।

১৯৯৬ সালে সুন্দরবনে তিনটি অভয়ারণ্য এবং ২০১২ সালে তিনটি ডলফিন অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনের এক লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এলাকাকে ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে ইউনেসকো।

পৃথিবীর অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বনের উদ্ভিদের তুলনায় সুন্দরবনের উদ্ভিজ্জের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কেননা সুন্দরবনের বুক চিরে শুধু নোনা পানি নয়, ক্ষেত্রবিশেষে প্রবাহিত হয় স্বাদু পানির ধারা। এই বৈশিষ্ট্যই সুন্দরবনকে পৃথক করেছে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বন থেকে। এই বনের বিশ্বখ্যাত প্রাণীটি হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

রিদওয়ান আক্রাম