kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নারী

একসময় নানা কারণে অর্থনীতিতে নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ কম থাকলেও বর্তমানে তারাই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করাসহ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও তারা ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করেছে তারা। শ্রম বিশেষজ্ঞরা জানান, ৫০ বছরের ব্যবধানে মূলধারার শ্রমবাজারে বেড়েছে তাদের অংশগ্রহণ

১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নারী

ছবি : মঞ্জুরুল করিম

একসময় নানা কারণে অর্থনীতিতে নারীদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ কম থাকলেও বর্তমানে তারাই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করাসহ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও তারা ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করেছে তারা। শ্রম বিশেষজ্ঞরা জানান, গত ৫০ বছরের ব্যবধানে মূলধারার শ্রমবাজারে বেড়েছে তাদের অংশগ্রহণ। আশির দশকে যেখানে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৮ শতাংশ, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩৬.৩ শতাংশ।

নারীরা শুধু খাদ্য ও কৃষির উন্নয়নেই নয়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রবৃদ্ধির উন্নয়নেও অন্যতম শক্তি হিসেবে অবদান রাখছে। দেশের মূলধারার শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকদের মজুরিভিত্তিক, স্বনিয়োজিত এবং পারিবারিক কাজে অংশগ্রহণ থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে স্বীকৃত নয়। তারা স্বামী বা শ্বশুরের জমিতে কৃষিকাজ করে। তাদের শ্রম দেশের প্রবৃদ্ধিতে যোগ হলেও এর জন্য তাদের কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হয় না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী চার কোটি ২৫ লাখ পুরুষ শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত, আর সেখানে নারী শ্রমিকের সংখ্যা এক কোটি ৮২ লাখ। এ ছাড়া একজন নারী যে মূলধারার শ্রমবাজারে রয়েছে সে গড়ে ৩.৬ ঘণ্টা এবং যে মূলধারার শ্রমবাজারে নেই সে গড়ে ৬.৩ ঘণ্টা কাজ করে। এই কাজগুলো অপ্রদর্শিত থেকে যায়।

বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শ্রমবাজারের মূলধারায় থাকা ৩৬ শতাংশের ৫৯ শতাংশ কাজ করে কৃষিতে আর কলকারখানায় কাজ করে ১২ শতাংশ এবং এই ১২ শতাংশের মধ্যে ৬৫ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজ করে তৈরি পোশাক খাতে।

এদিকে পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, পোশাকশিল্প বর্তমানে যে পর্যায়ে এসেছে, তার পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে আমাদের নারী শ্রমিকরাই। তারাই পোশাকশিল্পের চালিকাশক্তি হয়ে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করেছে। আজ পোশাকশিল্পকে কেন্দ্র করে ব্যাংক, বীমা, বন্দর, পরিবহন, পর্যটন, হোটেল—সব শিল্পই বিকাশ লাভ করেছে।

দেশের অর্থনীতিতে এর অবদানের কথা উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পোশাকশিল্পের অবদান ছিল প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। একই বছরে পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জীবনযাপনের ব্যয় স্থানীয় পর্যায়ে বিশাল বাজার তৈরি করে, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সমিতি বিজিএমইএর সভাপতি ড. রুবানা হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু পাশাকশিল্প নয়, সমগ্র জাতীয় অর্থনীতিতেই আমাদের পোশাকের নারী কর্মীরা বিশাল অবদান রাখছেন। এই কর্মীরা আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছেন। অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের কারণে তাঁরা অর্থনৈতিক সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছেন, নিজেদের জীবনের ক্ষেত্রেও এবং পরিবারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও পোশাকশিল্প আজ সমার্থক বিষয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘গৌরবের বিষয় হলো, সম্প্রতি এই শিল্পের কয়েকজন নারী কর্মী এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন, যা বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রমবাজারের বাইরেও নারীরা গৃহস্থালির কাজে অবদান রাখছে। এটাও জিডিপির ৩৯ শতাংশের সমপরিমাণ। এ ছাড়া কর্মসংস্থানে যেসব নারী আছে, তাদের ২৯ শতাংশ পারিবারিক খাতে কাজ করে। দেশের অর্থনীতিতে এর মূল্যায়ন না হলেও পারিবারিক অংশগ্রহণে বড় ধরনের অবদান রাখছে।

পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নারীদের শ্রমবাজারে আসতে না পারার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা—এ কথা উল্লেখ করে শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকার গণপরিবহন, শিশু দিবাযত্ন, নারীবান্ধব পরিবহন এবং নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা নিলে আগামী দিনে নারী ক্ষমতায়নসহ দেশের আর্থ-সামাজিক খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে।

শ্রম বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত ৫০ বছরে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও হয়েছে। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, খাদ্য ও কৃষি উন্নয়নে বিশাল অবদান রেখেছে দেশের নারী শ্রমিকরা।’

সায়েমা হক আরো বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ বা ব্যবস্থাপনার কাজে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অংশগ্রহণ বাড়লেও এখনো তা ১১ থেকে ১২ শতাংশ। মোট শ্রমবাজারে অংশ নেওয়া ৩৬ শতাংশের মধ্যে ৯০ শতাংশ কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে। তবে শ্রমবাজারে ৩৬ শতাংশ নারী কর্মীর অংশগ্রহণ থাকলেও ২০১০ সালের পর এতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।’

সমন্বিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আকতার বলেন, ‘দেশের রপ্তানি আয়ের শীর্ষ খাত তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের অবদান দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। স্বল্প ও কম শিক্ষিত এসব নারী শ্রমিক ব্যক্তি খাতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। ফলে দেশে একসময় শুধু কিছু পাটকল থাকলেও পোশাক শ্রমিকদের ক্ষমতায়নে ব্যাংক, বীমা ও বস্ত্র খাতের অনেক সংযোগ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। পোশাক খাতের ফলে নারী শ্রমিকদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন নারীরাই দর-কষাকষিসহ নারীর অর্থনৈতিক মুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এম সায়েম টিপু