kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যে নোবেল জয়

১৩ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যে নোবেল জয়

ছবি : শেখ হাসান

২০০৬ সালের ১৩ অক্টোবর তারিখটা বাংলাদেশের জন্য স্মরণীয়। এদিন বাংলাদেশ নোবেল পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ বৈশ্বিক সম্মান অর্জন করে। এই দিন নরওয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটি ঘোষণা করে, সেই বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণের জনক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক। জামানতবিহীন ও যৌথ দায়-দায়িত্বভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের সাফল্যের জন্য ২০০৬ সালের ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের রাজধানী অসলো সিটি হলে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তাসলিমা বেগম। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী হিসেবে এরপর সংবর্ধনা আর শুভেচ্ছার বন্যায় ভেসেছেন ড. ইউনূস। এ দেশের কোটি দরিদ্র নারীর বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণাদানকরী একজন শান্তিবাদী মানুষ হিসেবে পরিচিতি পান ড. ইউনূস। দেশের জন্য তাঁর এই বড় অর্জন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়; যদিও পরে এই নোবেল বিজয়ীকে গ্রামীণ ব্যাংক ছাড়তে হয়।

গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং পরে এর বিকাশে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পরে সরকারের অধ্যাদেশবলে ১৯৮৩ সালের ২ অক্টোবর এটি স্বাধীন ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর ২০১১ সালের ১০ মে পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে দায়িত্ব পালন করেন ড. ইউনূস। সরকারের সঙ্গে টানাপড়েনে ২০১১ সালের ১ মে এমডি পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।

অসলোর সিটি হলে সেদিন দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস তাঁর দেওয়া নোবেল বক্তৃতায় বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, সবার যৌথ উদ্যোগই পারে একটি দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব তৈরি করতে, যেখানে দারিদ্র্য থাকবে জাদুঘরে।  

ক্ষুদ্রঋণ যাদের দারিদ্র্য জয়ের পথে উৎসাহ জুগিয়েছে সেই বাংলাদেশি মানুষের পাশাপাশি আপনার উদ্ভাবনী কর্ম আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও সমান জনপ্রিয়। ক্ষুদ্রঋণের পর ড. ইউনূস এখন কাজ করছেন তাঁর নতুন ধারার সামাজিক ব্যবসা নিয়ে।

এ পর্যন্ত ৪২টি দেশে ১৩২টি প্রতিষ্ঠান অনুসরণ করেছে গ্রামীণ ব্যাংকের মডেল। সামাজিক ব্যবসায় এগিয়ে এসেছে ফ্রান্সের ডানোন ফুডস, ভিয়োলিয়া ওয়াটার, জার্মানির বিএএসএফ, জাপানের ইউনোক্লোসহ উন্নত বিশ্বের বহু নামিদামি কম্পানি। এরই মধ্যে ৩৩টি দেশে ৮৩টি বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে তাঁর নামে ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সামাজিক ব্যবসা হলো এমন উদ্যোগ, যেখান থেকে মুনাফা বা লভ্যাংশ নেওয়া যায় না। উদ্যোক্তারা মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করেন। আর প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতোই পরিচালিত হয়। ইউনূস সেন্টার পাঁচ বছর ধরে প্রতি ২৮ জুন সামাজিক ব্যবসা দিবস পালন করে আসছে।

তিনি শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব আর শূন্য কার্বন নির্গমনের পৃথিবী গড়ার কর্মপন্থা হিসেবে সামাজিক ব্যবসা ধারণা দিয়েছেন। এই ব্যবসা প্রচলিত পুঁজিবাদী ধারণার বিরোধী। এ ব্যবসার লক্ষ্যই হচ্ছে জনকল্যাণমূলক, মানুষের সমস্যা সমাধান (যেমন পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা, পয়োনিষ্কাশন, সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ)। এতে বিনিয়োগকারী কোনো লভ্যাংশ গ্রহণ করেন না এবং লাভের টাকা বিনিয়োগ করা হয় সামাজিক ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও সামাজিক কল্যাণে। তবে ব্যবসার লাভ থেকে তিনি বিনিয়োগের টাকা তুলতে পারেন এবং কাজের জন্য যৌক্তিক পারিশ্রমিক নিতে পারেন বলে এতে তাঁর নিজেরও কর্মসংস্থান হয়, সঙ্গে থাকে সামাজিক দায়িত্ব পালনের তৃপ্তি।

যদিও ক্ষুদ্রঋণের সুদহার এবং তা আদায়প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। তার পরও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য শুধু ঋণ পাওয়ার উৎসই নয়, বরং অর্থ সঞ্চয়, বীমা ও অর্থ স্থানান্তরের সুযোগও দিচ্ছে, যারা ব্যাংকব্যবস্থার বাইরে ছিলেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বেকারত্ব দূর করতে সামাজিক ব্যবসা একটি কার্যকর ব্যবস্থা। বেকারত্ব এখন পুঁজিবাদের নতুন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক ব্যবসা দিয়েই এই বেকারত্বের সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তরুণ-তরুণীদের স্বপ্ন ও উদ্যোগ দিয়ে বেকারত্ব দূর করতে চাই। পৃথিবীতে এমন পরিস্থিতি আসবে, যখন বেকারত্ব বলে কিছু থাকবে না।’

২০১৪ সালের সামাজিক ব্যবসা দিবসে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রবার্ট এফ কেনেডি সেন্টার ফর জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট কেরি কেনেডি। তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে বলেন, ‘ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক হলো একক প্রতিষ্ঠান, যারা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এমন অবদান রেখেছে, যা গত ১০০ বছরে হয়নি। এখানে দুজনও পাওয়া যাবে না, যাঁরা এই মতের সঙ্গে দ্বিমত করবেন।’ তিনি বলেন, লাখ লাখ দরিদ্র মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। তাদের সহায়তা করা উচিত। এই সামাজিক ব্যবসা কিভাবে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে, সেই বিবেচনা করা উচিত।

২০১০ সালের ৩০ অক্টোবর কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘সামাজিক ব্যবসা পশ্চিমা বিশ্বে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড মুনাফাবিহীন এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। সামাজিক ব্যবসা হলো সামাজিক সমস্যা সমাধানের ব্যবসা। আমি অতীতে যখনই কোনো সামাজিক সমস্যা দেখেছি ব্যাবসায়িক ভিত্তিতে তা সমাধানের চেষ্টা করেছি। এটা ছিল আমার স্বাভাবিক প্রবণতা। এগুলো আমি নানা ভঙ্গির ব্যবসা হিসেবে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু  কোনো প্রতিষ্ঠানেই আমি নিজের কোনো শেয়ার রাখিনি। অর্থাৎ এর কোনোটির মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা কোনো দিন করিনি।’

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা আরো বলেন, ‘আমি ভাগ্যবান। কারণ বাংলাদেশে অনেক অনেক সমস্যা। সমস্যা আছে বলেই তার সমাধানও অনেক বেশি উত্তেজনাপূর্ণ ও আনন্দময়। বিশ্বের যেসব দেশে কোনো সমস্যা নেই সেসব দেশ একদমই পানসে (বোরিং)।’

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে আমরা সারা বিশ্বের ১ শতাংশ মানুষের জীবন পরিবর্তন করতে চাই। আমরা যদি সামনের দিকে এক পা অগ্রসর হই, তাহলে হাজার মাইল পাড়ি দেওয়া কোনো সমস্যাই নয়।’

মাসুদ রুমী

মন্তব্য