kalerkantho

শনিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৪ রজব ১৪৪২

এক স্বপ্নদ্রষ্টার নাম মুস্তফা কামাল

ক্রিকেটে মুস্তফা কামালের আসা শুধুই ভালোবাসার টানে। ১৯৭০ সালে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পরীক্ষায় অবিভক্ত পাকিস্তানে মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। রেকর্ড নম্বর নিয়ে পাস করায় পান ‘লোটাস’ উপাধি। এরপর শুধু অর্থনীতি নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারতেন বাকি জীবনটা। কিন্তু তিনি রাজনীতি করতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের

১২ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক স্বপ্নদ্রষ্টার নাম মুস্তফা কামাল

তখন বাংলাদেশ ফুটবলময়। ক্রিকেট গ্যালারিতে ২০০-৩০০ জনের বেশি দর্শক নেই। খেলাটা জনপ্রিয় করতে আ হ ম মুস্তফা কামালের মাথায় এলো নতুন কিছু। আবাহনীর এই ক্রিকেট পরিচালক ১৯৯২ বিশ্বকাপে খেলা ইংলিশ দুই তারকা নেইল ফেয়ারব্রাদার ও রিচার্ড ইলিংওয়ার্থকে উড়িয়ে আনলেন বাংলাদেশে। তাঁদের টানে আবাহনীর ম্যাচ দেখতে গ্যালারিতে আসত ১৫-২০ হাজার দর্শক। এরপর ওয়াসিম আকরামকে এনে তো বাজিমাত। ৩৫-৪০ হাজার দর্শকে পূর্ণ গ্যালারি! সময়ের চেয়ে এই যে এগিয়ে থাকার ভাবনা, এ জন্যই বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসে জ্বলজ্বলে একটা নাম হয়ে থাকবেন মুস্তফা কামাল। আবাহনী ক্লাবে শুরু করে তিনি পৌঁছে যান সর্বোচ্চ মঞ্চে। ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির সহসভাপতির পর দায়িত্ব পালন করেছেন সভাপতি হিসেবেও। ছিলেন এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতিও। আর কোনো বাংলাদেশি সংগঠক পাড়ি দিতে পারেননি এতটা পথ।

অথচ ক্রিকেটে মুস্তফা কামালের আসা শুধুই ভালোবাসার টানে। ১৯৭০ সালে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পরীক্ষায় অবিভক্ত পাকিস্তানের মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। রেকর্ড নম্বর নিয়ে পাস করায় পান ‘লোটাস’ উপাধি। এরপর শুধু অর্থনীতি নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারতেন বাকি জীবনটা। কিন্তু তিনি রাজনীতি করতেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার তেমন সুযোগ ছিল না। তাই বেছে নিয়েছিলেন আবাহনীর প্ল্যাটফর্ম, কারণ সেটি শেখ কামালের হাতে গড়া ক্লাব। ফুটবল স্রোতে ভেসে না গিয়ে চেষ্টা করছিলেন ক্রিকেটের উন্নয়নে। তাতে শতভাগ সফল এই স্বপ্নদ্রষ্টা। ক্লাব ক্রিকেটে তিনিই দর্শক ফিরিয়েছেন সময়ের সেরা তারকাদের বাংলাদেশে এনে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্নটা দানা বাঁধছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু দায়িত্বটা পেয়ে যান সাবের হোসেন চৌধুরী। দমে না গিয়ে নিজের দাবিটা জানিয়ে রাখেন শুধু। ওয়ান-ইলেভেনের পর ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে বিসিবি সভাপতি হওয়ার স্বপ্নটা পূরণ করেন মুস্তফা কামালের। বাংলাদেশ ক্রিকেটের পালে লাগে নতুন হাওয়া। তিন বছর ২৩ দিন দায়িত্ব পালনের সময় সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০১১ বিশ্বকাপের জমজমাট উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করা। সেই অনুষ্ঠান উঠে এসেছিল বিশ্ব রেটিংয়ের ২ নম্বরে। পুরো দেশ সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছিল ক্রিকেটে। রাত দুইটা-আড়াইটার সময়ও মিরপুর স্টেডিয়ামের আশপাশে ছিল হাজার হাজার মানুষ। প্রত্যেকের মুখে-মনে তখন একটাই কথা—ক্রিকেট।

এরপর মুস্তফা কামালই প্রথমবার আয়োজন করেন ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টুর্নামেন্ট বিপিএল। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ভারত আইপিএল করতে পারলে বাংলাদেশ পারবে না কেন? বিপিএল সফল করতে বিসিবি প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি চলে গিয়েছিলেন পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন চেয়ারম্যানের বাড়ি পর্যন্ত। ক্রিকেট বাংলাদেশের উন্নতির ক্ষেত্রে আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট তাঁর স্বপ্নের টুর্নামেন্ট বিপিএলের এই সফল আয়োজন।

মুস্তফা কামালের আরেকটি স্বপ্ন ছিল কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দৃষ্টিনন্দন এক স্টেডিয়ামের। নিজের সময়ে পূর্ণতা দিতে না পারলেও নয়নাভিরাম সেই স্টেডিয়াম মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে এখন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিসিবির ফিক্সড ডিপোজিট ছিল ৫০ কোটি টাকা আর ব্যাংক লোন ১০ কোটি। অর্থাৎ নেট ছিল ৪০ কোটি টাকা। দায়িত্ব ছাড়ার সময় বিসিবির অ্যাকাউন্টে রেখে আসেন ১৮১ কোটি টাকা। দক্ষ সংগঠক না হলে এটা সম্ভব ছিল না কোনোভাবে।

বিসিবিতে থাকার সময়ই ২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন মুস্তফা কামাল। ২০১২ সালে মনোনীত হন আইসিসির সহসভাপতি। তখনই দুই বছরের মেয়াদে ছিলেন ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির অডিট কমিটির সভাপতি। নিজের দায়িত্বে সফল ছিলেন বলেই ২০১৪ সালের ২৬ মে মুস্তফা কামাল নির্বাচিত হন আইসিসির সভাপতি। ভালোবাসা আর আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলেও আইসিসির সঙ্গে শেষটা হয়েছে তিক্ততায়। ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে আম্পায়ারদের পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে করেছিলেন বিস্ফোরক মন্তব্য।

নিয়ম অনুযায়ী সেই বিশ্বকাপের ট্রফি চ্যাম্পিয়ন দলের হাতে মুস্তফা কামালের তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও সেটা দেন এন শ্রীনিবাসন! এরই প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে ছোট করে এই পদে থাকতে চাননি তিনি। দেশে ফিরেই দেন পদত্যাগের ঘোষণা। সভাপতির পদটির চেয়ে এগিয়ে রেখেছিলেন দেশকে। থাকতে চেয়েছেন দেশের পাশে। এ জন্যই সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী হিসেবে নয়, বাংলাদেশি ক্রিকেট সমর্থকদের হৃদয়ে আলাদা একটা জায়গা সব সময়ই থাকবে মুস্তফা কামালের।

রাহেনুর ইসলাম

মন্তব্য