kalerkantho

নজরুলসংগীতের কিংবদন্তি ফিরোজা বেগম

আজিজুল পারভেজ   

১১ মার্চ, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



নজরুলসংগীতের কিংবদন্তি ফিরোজা বেগম

নজরুল প্রসঙ্গে শিল্পী ফিরোজা বেগমের বক্তব্য হচ্ছে, 'নজরুল মানবসাধক। বিরল এই সাধকের সান্নিধ্য আমার জীবনের প্রধান স্মৃতি ও প্রেরণা। তাঁর কাছ থেকে গান শিখে আমি প্রবেশ করেছি বাংলা সংগীতের ঐশ্বর্যময় ভুবনে। নজরুলসংগীত আমাকে দিয়েছে নতুন জগতের সন্ধান, যে জগৎ মানবিক সৌন্দর্যে ভরপুর'

নজরুলসংগীতের কিংবদন্তি কিংবা উপমহাদেশীয় সংগীতের সম্রাজ্ঞী এমন অভিধা যাঁর ক্ষেত্রে অনায়াস প্রযোজ্য তিনি ফিরোজা বেগম। নজরুলসংগীতের প্রসঙ্গ এলে স্বভাবতই ভেসে ওঠে তাঁর ছবি। সংগীতের নিমগ্ন ধ্যানে আছেন একনাগাড়ে ছয় দশকেরও বেশি সময়। সংগীতের সব শাখাতেই তাঁর অনায়াস বিচরণ। বাংলা গানের সবচেয়ে বর্ষীয়ান এ শিল্পী দীর্ঘ পরিক্রমায় এখন ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন।

ফিরোজা বেগমের জন্ম ১৯৩০ সালের ২৮ জুলাই ফরিদপুরে। ছোটবেলায় সব কিছুর মধ্যেও গান শোনার এক অদ্ভুত নেশা তাঁকে পেয়ে বসে। পারিবারিক আবহে গান শেখার অবকাশ না থাকলেও বাবা-মায়ের সংগীতপ্রীতি ছিল। এটাই ছিল শুধু সহায়ক। বাসায় পেয়েছিলেন বেশ কিছু পুরনো রেকর্ড। পুরনো একটি কলের গানও ছিল। ফলে একাকী নিবিষ্টচিত্তে গান শোনার সুযোগ হয়। ক্রমাগত গানের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু গান শেখার কোনো সুযোগ তো হচ্ছে না। এক গ্রীষ্মের ছুটিতে ছোট মামা আর চাচাতো ভাইদের সঙ্গে গেলেন কলকাতায়। মামার উৎসাহে বোদ্ধামহলে গান শোনাতে লাগলেন। ছোট্ট মেয়েটার গায়কীতে মুগ্ধ সবাই। একদিন গুণীজনদের মজলিসে গান শুনিয়ে দারুণ তারিফ পেলেন। তাঁকে আদর করে পাশে বসালেন লম্বা চুলের এক ভদ্রলোক। গান শুনে জানতে চাইলেন, 'এ গান তুমি শিখলে কেমন করে?' তিনি জানালেন, 'কালো কালো রেকর্ড শুনে নিজে নিজেই শিখেছি।' শুনে তো সবাই অবাক। বাসায় ফিরে মামা জানালেন, আসরের মধ্যমণি হয়ে বসেছিলেন বিখ্যাত কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনিই কথা বলেছিলেন তাঁর সঙ্গে। সে যাত্রায় কলকাতা ভ্রমণের এক অদ্ভুত আনন্দ নিয়ে ফিরলেন ফরিদপুরে। স্থায়ীভাবে কলকাতায় থাকতে না পারাটা তাঁর গান শেখার অন্তরায় হয়ে ওঠে। তবে যখনই কলকাতা যাচ্ছেন, নজরুলের সান্নিধ্যে গান শেখা হচ্ছে। এভাবেই কেটেছে তাঁর ছোটবেলার সোনাঝরা দিনগুলো।

১৯৪২ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিখ্যাত গ্রামোফোন কম্পানি থেকে ইসলামী গান নিয়ে তাঁর প্রথম রেকর্ড বের হয়। বিখ্যাত সুরসাধক চিত্ত রায়ের তত্ত্বাবধানে ছোট্ট ফিরোজা গাইলেন 'মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল'। এতেই বাজিমাত। বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে সব রেকর্ড বিক্রি হয়ে যায়। সংগীতপ্রেমীদের সঙ্গে সুরের আকাশের এই তারার সেটাই প্রথম পরিচয়। ছোট্ট মেয়েটির গায়কী সংগীতবোদ্ধা ও সাধারণ শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।

কিছুদিন পর নতুন রেকর্ডের জন্য আবার চিঠি এলো। এবার হবে কমল দাশগুপ্তের তত্ত্বাবধানে উর্দু গানের রেকর্ড। কীর্তিমান এই সুরকারের হাত ধরে বের হলো দ্বিতীয় রেকর্ড। গান ছিল- 'ম্যায় প্রেম ভরে, প্রীত ভরে শুনাও' আর 'প্রীত শিখানে আয়া'। এই রেকর্ড প্রকাশের মাধ্যমে সুরস্রষ্টার সঙ্গে শিল্পীর জীবনের অনন্য এক মেলবন্ধনের সূত্রপাত ঘটে, যা পরে পরিণয়ের দিকে গড়ায়। এই সময়ে তাঁর বড় বোন ও ভগি্নপতি দিলি্ল থেকে স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে এলেন। এতে কলকাতায় থাকার সুযোগ তৈরি হয়। সে সময়ে সুযোগ হয় চিত্ত রায় ও কমল দাশগুপ্তের কাছে গান শেখার। এই দুজনের কাছেই শিল্পী ঋণী। বিশেষত কমল দাশগুপ্তের কাছে। তাঁর কাছে সব ধরনের গান শিখেছেন। জীবনের মূল শিক্ষাটাই পেয়েছেন ভারতবর্ষে ক্ষণজন্মা এই সুরকারের কাছ থেকে। তবে শেখার ব্যাপারে অতৃপ্তি রয়ে গেছে তাঁর। নিজের ভাষায়, 'আজও আমি তৃপ্ত নই। আজও আমার ভালো গান শেখা হয়নি।' গ্রামোফোন কম্পানি থেকে সেই ছোটবেলায় তাঁর পরপর চারটি রেকর্ড বেরিয়ে গেল অল্প দিনের মধ্যেই। টানা চার বছর কমল দাশের কাছে গান শেখার সুযোগ পেলেন। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ফের তাঁকে ফরিদপুর ফিরিয়ে আনে। বন্ধ হয়ে যায় গান শেখা। এর ফলে তিনি এতটাই ভেঙে পড়েন যে একসময় অসুস্থ হয়ে পড়েন।

কলকাতায় যাওয়া, গান গাওয়া এভাবেই চলছে। একই সঙ্গে রেডিওতেও তিনি নানা ধরনের গান গেয়ে যাচ্ছেন। তত দিনে তিনি রবীন্দ্রসংগীত আর আধুনিক গানেও সমানভাবে বিখ্যাত। দু-দুবার আধুনিক গানের ক্ষেত্রে মাসের সেরা শিল্পী হয়েছেন। ফিরোজা বেগমের গলায় রবীন্দ্রসংগীত শুনে গান শেখানোর জন্য পঙ্কজ মলি্লকের মতো শিল্পী তাঁর কলকাতার বাড়িতে চলে আসেন। গুণী শিল্পীরা তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অন্যদিকে তিনি আব্বাসউদ্দীন ও পল্লীকবি জসীমউদ্্দীনের কাছে অল ইন্ডিয়া রেডিওর জন্য মাঝে মাঝে লোকগীতির তালিম নিচ্ছেন। রেডিওর পাশাপাশি স্টুডিওতেও গানের রেকর্ড হচ্ছে। ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁর তত্ত্বাবধানেও গানের রেকর্ড হলো। তখন চৌদ্দ-পনেরো বছরের কিশোরী। তবে নানা গানের ভিড়ে নিজেকে আলাদা করে নেওয়ার এক তীব্র ইচ্ছা কাজ করে তাঁর মধ্যে। সিদ্ধান্ত নিলেন অন্য গান নয়, নজরুলের গানই গাইবেন। গ্রামোফোন কম্পানির কর্তারা তো অবাক। ফিরোজার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বললেন তাঁরা। তাঁদের কথা, 'এত ভালো গলা! এভাবে নিজের ক্যারিয়ার কেউ নষ্ট করে? তা ছাড়া এখন তো আর লোকে সেভাবে নজরুলসংগীত শুনছে না।' ফিরোজা সিদ্ধান্তে অবিচল। নজরুলসংগীতই হয়ে উঠল তাঁর ধ্যান ও জ্ঞান। এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলেন। তখন নজরুলসংগীত বলা হতো না, বলা হতো আধুনিক গান, লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। মূলত ফিরোজা বেগমের চেষ্টাতেই তা পায় নজরুলগীতির অভিধা। তাঁর অনড় ভূমিকার কারণেই অল ইন্ডিয়া রেডিওতেও নজরুলের গান বাধ্যতামূলক হয়। সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, 'তখন বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। কত নামিদামি শিল্পী চারপাশে। প্রতিযোগিতাও কম নয়। তা সত্ত্বেও আমি সহজে সফল হওয়ার সুযোগ হেলায় ঠেলে দিয়ে নজরুলগীতিকে বেছে নিয়েছি। ছোটবেলা থেকেই কোনো চটুল গানের জন্য আমি কখনোই উচাটন হইনি। আমি চেয়েছি জটিল থেকে জটিলতর সব সুরের সমাধান।'

১৯৪৯ সালে গ্রামোফোন কম্পানি তাঁর গলায় নজরুলের গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। 'আমি গগন গহনে সন্ধ্যাতারা...' গেয়েছিলেন তিনি। ১৯৬০ সালে পুজো উপলক্ষে প্রকাশিত রেকর্ডে ফিরোজা গাইলেন সর্বকালের জনপ্রিয় দুটি গান 'দূর দ্বীপবাসিনী' আর 'মোমের পুতুল'। ফিরোজার জনপ্রিয়তাকে আর কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি।

নজরুল প্রসঙ্গে শিল্পী ফিরোজা বেগমের বক্তব্য হচ্ছে, 'নজরুল মানবসাধক। বিরল এই সাধকের সান্নিধ্য আমার জীবনের প্রধান স্মৃতি ও প্রেরণা। তাঁর কাছ থেকে গান শিখে আমি প্রবেশ করেছি বাংলা সংগীতের ঐশ্বর্যময় ভুবনে। নজরুলসংগীত আমাকে দিয়েছে নতুন জগতের সন্ধান, যে জগৎ মানবিক সৌন্দর্যে ভরপুর।'

১৯৪৮-৪৯ সালে ফিরোজা বেগম আর তালাত মাহমুদকে অতিথি শিল্পী হিসেবে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। আর তাঁদের গানেই উদ্বোধন করা হয় ঢাকা রেডিওর শর্ট ওয়েভ। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৭ টানা ১৩ বছর ছিলেন কলকাতায়। ১৯৫৬ সালে বিরলপ্রজ সুরকার কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি তাঁর পরিবার। কিন্তু নিজের সত্যকেই তিনি সব সময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কলকাতাতেই জন্মেছে তাঁর তিন সন্তান- তাহসিন, হামীন ও শাফীন। শিল্পীর তখন স্বর্ণযুগ। অথচ টানা পাঁচ বছর স্বামী-সন্তান-সংসার সামলাতে গিয়ে গান গাইতে পারেননি তিনি। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন কমল দাশগুপ্ত। ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই পিজি হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। মাত্র ১৮ বছরের সুরময় দাম্পত্যজীবনের ইতি ঘটে।

১৯৬৮-৬৯, ইসলামাবাদ রেডিওর উদ্বোধন হবে। গান গাইতে ডাক পড়ল ফিরোজা বেগমের। তিনি জানালেন, আগে বাংলা গান গাইতে দিতে হবে, না হলে গাইবেন না। তখনকার তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন ওই শর্তেই রাজি হন। তিনি গাইলেন- 'ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি'। সত্তরে পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল হয়ে উঠেছে স্বাধিকার আন্দোলনে, আর সে সময় করাচিতে ইএমআই পাকিস্তানে তিনি 'জয়, জয়, জয় বাংলার জয়' আর 'জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো' এই বাংলা গানগুলো রেকর্ড করেন। এই গান গাওয়ার অপরাধে হেনস্থার মুখোমুখি হতে হয়। দেশে ফেরার পর একদিন রেডিও স্টেশন থেকে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ১টায় নামিয়ে দিয়ে যায় বাসায়। তবে গানের মূল রেকর্ড ধ্বংস করে ফেলা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একাধিকবার তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। ১৪ ডিসেম্বর একটুর জন্য বেঁচে যান মৃত্যুর হাত থেকে।

১২ বছর বয়সে যে মেয়ের রেকর্ড বেরিয়েছে, উপমহাদেশ যিনি মাতিয়েছেন, তিনি ১৯৭২ সালের আগে কখনোই মঞ্চে ওঠেননি। ১৯৭২ সালের ২৭ অক্টোবর কলকাতার রবীন্দ্রসদনে তিনি পাবলিক পারফরম্যান্স করেন। সেটাই ছিল সেখানে কোনো শিল্পীর করা প্রথম একক অনুষ্ঠান। সারা বিশ্ব তিনি পরিভ্রমণ করেছেন নজরুলের গান নিয়ে। একক অনুষ্ঠান করেছেন ৩৮০টির মতো। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগ্রহে তাঁকে নজরুলসংগীত ও অতুলপ্রসাদের গান শিখিয়েছেন ফিরোজা। এই আকাশছোঁয়া খ্যাতি তাঁকে কখনোই অহংকারী করে তোলেনি। খ্যাতিকে তিনি সব সময়ই নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখেছেন। কখনোই বিত্তের পেছনে ছোটেননি। এ জন্যই তিনি পরম আত্মবিশ্বাসে বলতে পারেন, 'আমি আছি আর আছে মোর তানপুরা'।

প্রতিকূলতার সঙ্গে জীবনভর লড়াই করা এই সুরসম্রাজ্ঞীকে দেশের মানুষ কি যথাযথ সম্মান দিতে পেরেছে? ভারত আর পাকিস্তান মিলিয়ে যেখানে এই কিংবদন্তির রেকর্ডসংখ্যা এক হাজার ৬০০, সেখানে বাংলাদেশে হাতে গোনা তিন-চারটি। তবে আনুষ্ঠানিক সম্মাননা পেয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে স্বাধীনতা পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ টিভি শিল্পী পুরস্কার (পাকিস্তান ও বাংলাদেশে) প্রভৃতি। তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন বাংলা ১৪০০ সালে কলকাতার সাহিত্যিক-শিল্পীদের দেওয়া সংবর্ধনা। সেবার 'একই বৃন্তে দুটি কুসুম' শিরোনামে অসামান্য কণ্ঠমাধুর্যের অধিকারী দুই শিল্পী নজরুলসংগীতের ফিরোজা বেগম ও রবীন্দ্রসংগীতের সুচিত্রা মিত্রকে সম্মান জানানো হয়। সর্বশেষ ২০১২ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে সম্মাননা প্রদান করেছে।

শরীরটা এখন ভালো যাচ্ছে না এই সুরতাপসীর। কয়েক দিন আগেও হাসপাতালে ছিলেন। সুস্থ বোধ করলে এখনো নিয়মিত কবিতা পড়েন। রেওয়াজ করেন। হাঁটাহাঁটি করেন বাগানে। বাগানের পাখিগুলোর কলকাকলি, নজরুলের গান আর কমল দাশগুপ্তের সুখস্মৃতি এখন তাঁর নিত্যসঙ্গী।

মন্তব্য