English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

অতৃপ্ত স্বপ্নপূরণে কঠিন মিশনে জুঁই

  • সনৎ বাবলা   
  • ২২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০

ছন্নছাড়া অ্যাথলেটিকসে স্বপ্ন দেখার সুযোগ কি খুব আছে! নেই। এই বাস্তবতা তাঁরও অজানা নয়। এর পরও নিজের একান্ত ভালোলাগা-ভালোবাসাকে প্রশ্রয় দিয়ে গাঁটের পয়সা খরচ করে পিএইচডি করে কোচ হিসেবে নিজেকে আরো যোগ্য করে তোলার পথে ফৌজিয়া হুদা জুঁই, ভবিষ্যতে কী করব না করব, জানি না। অ্যাথলেটিকসকে তো ভালোবাসি, তাই এই লাইনে পিএইচডি করছি।

খুব বেশি দিন হয়নি ট্র্যাক ছেড়েছেন ফৌজিয়া হুদা জুঁই। ১৯৯৮ সালে জুনিয়র মিটে তিনি ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ১০০ মিটার স্প্রিন্ট ও লং জাম্পে। প্রিয় ইভেন্ট ছিল ওই লং জাম্প আর এই ইভেন্টে রুপা জেতেন ২০০৪ ইসলামাবাদ সাফ গেমস ও ২০০৬ কলম্বো সাফ গেমসে। এর আগে ২০০০ সালে করাচিতে সাত জাতির আমন্ত্রণমূলক অ্যাথলেটিকসে দ্রুততম মানবী হয়েছিলেন ১০০ মিটার স্প্রিন্ট জিতে। ২০১০ সালে ক্যারিয়ারে ইতি টেনে দিয়ে নতুন ক্যারিয়ার শুরু করেন কোচিং লাইনে। হয়েছেন বিকেএসপির অ্যাথলেট তৈরির কারিগর। এখানে তাঁর অনুপ্রেরণা নজরুল ইসলাম স্যার, আমার সৌভাগ্য যে নজরুল ইসলাম স্যারের মতো একজন কোচের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। অ্যাথলেটি হিসেবে যতটুকু আমার উন্নতি, সেটা হয়েছে ওই কোচের জন্য। তিনি এত উঁচুমানের কোচ ছিলেন, অ্যাথলেটিকস নিয়ে এত জানতেনকোচ হলে এমনই হওয়া উচিত। গুরুর পথেই হাঁটতে গিয়ে জুঁইয়ের মাথায় চাপে পিএইচডির নেশা। বিকেএসপি থেকে ছুটি নিয়ে নিজের টাকায় পড়তে গেছেন ইউনিভার্সিটি সায়েন্স, মালয়েশিয়ায়। তিন বছর হয়ে গেছে, আগামী বছরের মাঝামাঝি শেষ হবে।

ছুটিতে এসেছেন ঢাকায়। কিছুদিন আগে শেষ হওয়া জাতীয় জুনিয়র মিটও দেখতে গিয়েছিলেন মাঠে। বিকেএসপির কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই নেই। জেলাগুলোও অনাগ্রহী, মিটে অংশ নিলেও নতুন প্রতিভার স্ফুরণ নেই। উচ্ছন্নে যাওয়া অ্যাথলেটিকসের অবস্থা দেখে এই সাবেক অ্যাথলেটেরও মন খারাপ হয়, আমাদের সময়ও এত খারাপ অবস্থা ছিল না। একসঙ্গে প্রায় ৪০ জনের মতো জাম্পার থাকত মিটে। এখন জাতীয় অ্যাথলেটিকসেও কারো আগ্রহ দেখা যায় না। ছেলেমেয়েদের আগ্রহী করে তোলার একটা উপায় হলো অ্যাথলেটিকসের আকর্ষণ বাড়াতে হবে। ক্রিকেটের মতো না হোক, এখানে জীবন ও জীবিকার মোটামুটি একটা ব্যবস্থা থাকলে খেলাটা আবার জীবন ফিরে পাবে মনে হয়। তাঁর অ্যাথলেট জীবনের সূত্রপাত জাতীয় স্কুল ও মাদরাসা অ্যাথলেটিকস দিয়েই। সেখানে ভালো করার সুবাদে বিকেএসপিতে ভর্তি, অতঃপর নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই। বড় অ্যাথলেট হওয়ার লড়াই। বড় হয়েছেনওসাফ গেমসে দু-দুবার রুপা জেতাও কম কথা নয়। এবং দুবারই ৬.০৭ মিটার অতিক্রম করেছেন এই জাম্পার। তিনি স্বপ্ন দেখেন, আমি চাই আমার হাতে গড়া কোনো মেয়ে অ্যাথলেট এর চেয়ে বেশি লাফিয়ে এসএ গেমসে একদিন সোনা জিতবে। নতুন চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট তৈরির জন্যই তো এত লেখাপড়া। এখন হয়তো সময় খারাপ যাচ্ছে, কিন্তু সুসময় তো ফিরতেও পারে। নিজে অ্যাথলেট হিসেবে সাফ গেমসে কখনো সোনা জিততে পারেননি, এই অতৃপ্ত বাসনাটাই যেন পূরণ করতে চান নিজের হাতে গড়া অ্যাথলেট দিয়ে।

আসলে তাঁর জীবনটা তো আগাগোড়া অ্যাথলেটিকস দিয়েই মোড়া। সেই যখন অ্যাথলেট তখন থেকেই প্র্যাকটিস-কম্পিটিশনের বাইরে ছিল না অন্য কোনো জগৎ। ক্যারিয়ার শেষে যোগ হয়েছে ভালো কোচ হওয়ার নতুন নেশা। তাতে এমন বুঁদ হয়ে গেছেন, নিজে সংসারী হওয়ার বিষয়টাকে গৌণ করে ফেলেছেন। পরিবারে সবার ছোট বলে এক ধরনের প্রশ্রয় ছিল। কিন্তু এখন এক-আধটু চাপ তৈরি হচ্ছে বৈকি, এখন বাসা থেকে তাড়া দেয়, তাড়াতাড়ি পিএইচডি শেষ করে ফেরার। আসলে মেয়েদের জীবন বড় কঠিন। বিয়ে করে ফেললে অনেক রকমের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। তখন আর হয়তো কোচিং লাইনে পড়াশোনার কথা চিন্তাও করতে পারতাম না। তাই আগে নিজের জায়গাটা একটু শক্ত করে নেওয়া আর কি। লেখাপড়া শেষ করে জুঁই আগামী বছর ফিরবেন আবার ছন্নছাড়া অ্যাথলেটিকসের পরিমণ্ডলে। যোগ দেবেন বিকেএসপির পুরনো চাকরিতে। ক্ষয়িষ্ণু অ্যাথলেটিকসের এক উচ্চতর ডিগ্রিধারী কোচ হবেন ফৌজিয়া হুদা জুঁই। না, তিনি এমন নৈরাশ্যবাদী নন, আমি কিন্তু আশাবাদী মানুষ। একসময় দিন বদলাবে। এই ফেডারেশনের চেষ্টা দেখছি। একাডেমি করার পরিকল্পনা দেখছি। একটু পরিকল্পনা করে এগোলেই অ্যাথলেটিকসের চেহারা ফেরানো যায়। জুঁইয়ের সেই আশা যেন বিফলে না যায়।

খেলা- এর আরো খবর