সার্কাস বীরেন ও অরুণ দাসলক্ষ্মণ দাসের পুনর্জন্মবাবার স্বপ্ন ধরে রেখেছেন দুই ভাই। হাজার সংগ্রামেও তাঁরা হাল ছাড়েননি। বরিশালের এক গ্রামে জন্ম নেয়া 'দি রয়েল বেঙ্গল (লক্ষ্মণ দাস) সার্কাস'-এর খ্যাতি দেশজোড়া। পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। তৌফিক মারুফ
মধুবালার সব কিছুই নজরকাড়া। মায়া মায়া চোখ। শান্ত চাহনি। গলায় ঘণ্টি। কপালে সিঁদুর। একাত্তরের জৈষ্ঠ্যের এক সকালে পাকিস্তানি মিলিটারির গুলি মুছে দেয় মধুবালার সিঁদুর। পাঁচটি গুলি ঝাঁঝরা করে শরীর। লুটিয়ে পড়ে মধুবালা। লক্ষ্মণ দাস সার্কাসের সবচেয়ে বড় পারর্ফমার ছিল মধুবালা; হাতি।
সেই লক্ষ্মণ দাস সার্কাসই আজকের দি রয়েল বেঙ্গল সার্কাস। দলের কর্ণধার এখন বীরেনচন্দ্র দাস। তাঁকে সহায়তা করেন বড় ভাই অরুণ। এই অরুণ-বীরেনেরই বাবা লক্ষ্মণচন্দ্র দাস। বরিশালের গৌরনদীর উত্তর পালরদী গ্রামে তাদের বাড়ি। ব্রিটিশ আমলে নাম করা কুস্তিগীর ছিলেন লক্ষ্মণচন্দ্র দাস। ভারোত্তোলনে নামডাক ছিল। টুকটাক ম্যাজিকও জানতেন। স্কুল-কলেজে ঘুরে ঘুরে বিনা পয়সায় নানা কসরৎ প্রদর্শন শুরু করেন তিনি। লক্ষ্মণ দাসকে লায়ন সার্কাসে ঢুকিয়ে দিলেন এক মেসো। লায়ন সার্কাসে লক্ষ্মণ দাস দুর্লভ অনেক খেলা দেখানো শুরু করেন। দাঁত দিয়ে রড কাটা, গলা দিয়ে রড বাঁকানো, ভারোত্তোলন, বর্ষা নিক্ষেপ, ত্রিশূল ভেদ, ড্যাগার বোর্ড ইত্যাদি।
১৯৪৮ সালে লক্ষ্মণ নিজেই গঠন করে ফেলেন 'রয়েল পাকিস্তান সার্কাস'। দিকে দিকে ডাক পড়ে। এসে যায় মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেন তিনি। সার্কাসের নামে বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ-আসা-যাওয়ায় অবদান রাখে দলটি।
বাড়ির পাশে গৌরনদী কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে মিলিটারি। স্থানীয় রাজাকার-আলবদররা মিলিটারিদের জানিয়ে দেয় সার্কাসের নামে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার কথা। মিলিটারিরা ওই বাড়িতে আক্রমণ করার খবর গোপনে পেয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে লক্ষ্মণ চলেন পাশের আগৈলঝাড়ার কোদাল ধাওয়া বিলে। যাওয়ার সময় সার্কাসের যাবতীয় উপকরণের সঙ্গে হাতি, বাঘ, ভাল্লুক, হরিণসহ অন্যান্য প্রাণী রেখে যান। তাঁরা বাড়ি ছাড়ার পর পরই আক্রমণ করে মিলিটারি। কাউকে না পেয়ে অবলা হাতি-বাঘ-ভাল্লুক-হরিণ গুলি করে মারে, প্যান্ডেল করার তাঁবু, টিন-কাঠ-বাঁশসহ সার্কাসের অন্যান্য উপকরণ লুটে নিয়ে যায়।
কোদাল ধোওয়া বিলের মধ্যে নৌকায় থাকতে শুরু করেন তাঁরা। কয়েকদিন পর সেখানেও হানা দেয় মিলিটারি। মিলিটারির বোট দেখামাত্র পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন সবাই। অরুণ-বীরেন নিরাপদে চলে যেতে সক্ষম হলেও লক্ষ্মণ দাসকে নৌকা থেকে পানিতে নামতে দেখেই মিলিটারিরা গুলি ছোড়ে। তলিয়ে যান তিনি। হানাদাররা তাঁর স্ত্রী লীলা দাসের শরীরে বেয়নেটের আঘাত করে। সব গহনা লুট করে। কিছু গহনা পানির মধ্যে পড়ে যায়। মিলিটারি চলে যাওয়ার পর অরুণ-বীরেন বাবার লাশ তুলতে গিয়ে বিলের বুক সমান পানির নিচে তিনটি আংটি ও কোমরের একটি বিছা কুড়িয়ে পান।
স্বাধীনতার পর আবার গৌরনদীর বাড়িতে ফিরে আসেন দুই ভাই। দেখেন কিছুই নেই। বীরেন দাসের স্মৃতিতে আজও জ্বলজ্বল করে সেসব দিন, "কী করব না, করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। সম্বল কেবল নেই তিন আংটি, কোমরের বিছা। মাঝের দিনগুলোতে অনেক কষ্ট হলেও সম্বল রেখে দিলাম দেশ স্বাধীন হলে আবার সার্কাস চালু করব বলে। এক সময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা নিজাম ভাইয়ের কাছে সাহায্য চাইলাম সার্কাস দল চালু করার জন্য। তিনি কয়েকটি রিলিফের তাঁবু দিলেন। আবার শুরু করলাম। বাবার নামে দলের নাম রাখলাম 'লক্ষ্মণ দাস সার্কাস'।"
বাবার অনুকরণে গৌরনদীর কসবায় দুধ মলি্লক পীরের মাজারে প্রথম প্রদর্শনী করা হলো দলের। কিন্তু মেয়ে পারর্ফমার নেই বলে দর্শক কম। অনেক চেষ্টার পর আগৈলঝাড়ায় একটা মেয়ে পাওয়া গেল। তারপরও অর্থের অভাবে বছরখানেক বন্ধ রাখতে হলো প্রদর্শনী। অনেক কষ্টে টাকা-পয়সা জোগাড় করে আবার টিম দাঁড় করালেন বীরেন। দলে তখন নারী-পুরুষ মিলে কলাকুশলী ৪৮ জন। বছরখানেক পরে টিম নিয়ে বীরেন গেলেন বাগেরহাট। সেখানে কয়েকদিন প্রদর্শনী চলার পর মন্দায় দুই-তিন দিন এক রকম না থেকে দিন কাটে দলটির সদস্যদের। প্রদর্শনী বন্ধ করে দলের অনেককে নিয়ে চলে যান তিনি স্বরূপকাঠি, বড় ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। সেখান পার হলো কয়েকদিন। অরুণের শাশুড়ি বীরেনকে হাতের বালা দুটি খুলে দিলেন সার্কাস চালানোর জন্য। বালা বন্দক রেখে টাকা নিয়ে সার্কাস দল নিয়ে এবারে বীরেনের গন্তব্য বাইশারী।
প্রদর্শনী বেশ সফল। শুরু হলো সুখের পথে যাত্রা। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমন্ত্রণ পেলেন তাঁরা। সে সব এলাকায় গিয়ে প্রদর্শনী করে 'লক্ষ্মণ দাস সার্কাস'। তবে প্রদর্শনীতে হাতি না থাকায় ঠিক জমানো যাচ্ছিল না।
১৯৭৬ সাল। বরিশাল প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত সার্কাস প্রদর্শনীতে অংশ নেয় দলটি। তাদের পারফর্মেন্সে খুশি হয়ে জেলা প্রশাসক আবদুল হাকিম হাতি কেনার জন্য এক লাখ টাকা অনুদান দেন। দলে আবার যুক্ত হয় হাতি। একে একে বাঘ-ভাল্লুকসহ অন্যান্য প্রাণীও সংগ্রহ করা হয়। আস্তে আস্তে সারা দেশে লক্ষ্মণ দাস সার্কাসের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৮০ সালে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সার্কাস উৎসব হয়। বিভিন্ন এলাকার অনেক টিম আসে উৎসবে। এটি ছিল প্রতিযোগিতামূলক উৎসব। আয়োজকদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয় লক্ষ্মণ দাসের পরিবর্তে দলের অন্য কোনো নাম রাখার। কিন্তু বাবার স্মৃতি পরিবর্তন করতে চাননি বীরেন। তবে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির চাপে কিছুটা কৌশল করে দলের নাম লেখা হয় 'দি রয়েল বেঙ্গল (লক্ষ্মণ দাস) সার্কাস'। সেই থেকে এ নামই চলছে। উৎসবে দলটির সবচেয়ে বড় অর্জন 'রাষ্ট্রপতি পুরস্কার'। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্কাস দেখে মুগ্ধ হয়ে দুই লাখ টাকা অনুদান দেন।
দলে এখন মোট কলাকুশলী ৮৮ জন। যার মধ্যে ৪২ জনই মেয়ে। সর্বকনিষ্ঠ পরফরমারের বয়স চার বছর। এ ছাড়া দলে রয়েছে তিনটি হাতি, তিনটি ঘোড়া, একটি গাধা, কয়েকটি বানর, দুটি কুকুর, দুটি ছাগল। এগুলো পারদর্শী আকর্ষণীয় খেলা দেখানোয়।
এতসব অর্জনের পরেও বীরেন দাস শঙ্কিত দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে, 'মনে হচ্ছে আমাদের সন্তানরা দলটি ধরে রাখবে না। ওরা উচ্চশিক্ষা নিয়েছে। কেউ কেউ বিদেশে আছে। তাদের চিন্তাধারা ভিন্ন।' পরক্ষণেই চিরকালের আশাবাদী বীরেনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, 'কে জানে অন্য কেউ হয়তো হাল ধরবে।'
সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন, উপদেষ্টা সম্পাদক : অমিত হাবিব, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com