ঢাকা, শনিবার ৬ অক্টোবর ২০১২, ২১ আশ্বিন ১৪১৯, ১৯ জিলকদ ১৪৩৩
চাকমা ভাষার বর্ণলিপি
¦
শনিবারের সুসংবাদ'রিবেং ইউনি'তে লেখা হবে চাকমা ভাষা বিপ্লব রহমান
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসী পাহাড়ি চাকমা জনজাতির রয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য, রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি। চাকমা উপকথা, লোকগীতি, ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, সাহিত্যও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এই ভাষায় প্রতি বছর লেখা হচ্ছে অসংখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, এমনকি নাটকও।
পাহাড়ি আদিবাসী চাকমাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা। চর্চার অভাবে চাকমা লেখ্য ভাষাটি হারিয়ে যেতে বসেছিল। আশার কথা, আবার ধীরে ধীরে বাড়ছে ভাষাটির লিখিত ব্যবহার। তবে এই ভাষার ফন্টটি এত দিন আন্তর্জাতিক বর্ণ সংকেতায়ন বা ইউনিকোডে রূপান্তরিত না হওয়ায় অনলাইনে চাকমা ভাষায় লেখালেখি ছিল দুষ্কর।
বর্তমানে ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো ভাষাকে প্রকাশ করার প্রধান পদ্ধতি হচ্ছে ইউনিকোড। কিন্তু এত দিন চাকমা ভাষার লিপি ইউনিকোডে না থাকায় সীমাবদ্ধতার আবর্তে আটকা পড়ে ছিল এই ভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা ও ভাববিনিময়। এ অবস্থায় শিক্ষিত চাকমারা এত দিন বিভিন্ন ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং ই-মেইলে বাংলা বা রোমান হরফে নিজ ভাষায় লেখালেখি করতেন।
রাঙামাটির তরুণ কম্পিউটার প্রকৌশলী ও www.hillbd.com পড়স ব্লগসাইটের নির্মাতা জ্যোতি চাকমা এবং বেসরকারি কর্মকর্তা সুজ মরিজ চাকমা নিজ মাতৃভাষায় লেখালেখির এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে দুই বছর আগে একসঙ্গে প্রযুক্তিগত গবেষণা শুরু করেন। প্রথমে তাঁরা ভাষা গবেষকদের সহায়তায় প্রাচীন চাকমা লিপিটিকে সুসংহত করে এর নাম দেন 'আলাম'। চাকমাদের প্রাচীন বয়ন শিল্প কোমর তাঁতের নকশাশৈলীকে বলা হয় 'আলাম'। জ্যোতি ও সুজ মরিজ ফন্টটির নামকরণ সেখান থেকেই করেন। বছরখানেক ধরে তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা চালান ফন্টটিকে ইউনিকোডে রূপান্তরের জন্য। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সম্প্রতি তাঁরা চাকমালিপি ইউনিকোডে রূপান্তরে সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা উদ্ভাবিত চাকমা ইউনিকোড ফন্টটির নামকরণ করেছেন 'রিবেং ইউনি'।
চাকমা ভাষায় 'রিবেং' শব্দের অর্থ গাছের মূল কাণ্ড আর ইউনিকোডের সংক্ষিপ্ত রূপ 'ইউনি' মিলিয়ে সদ্য উদ্ভাবিত ফন্ট 'রিবেং ইউনি'। এর সুবাদে উন্মোচন হতে যাচ্ছে চাকমা ভাষা চর্চা ও শিক্ষার অবারিত দুয়ার। খুব সহজেই ইন্টারনেট বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হবে এই ভাষা। 'রিবেং ইউনি' ব্যবহার করে অনলাইনে লেখালেখির পাশাপাশি বিভিন্ন ওয়েব ও ব্লগসাইট, ই-বুক, অনলাইনপত্র ইত্যাদি নির্মাণ করা সম্ভব হবে। বাংলা ভাষার পরই এ দেশের অন্য কোনো ভাষা এই প্রথম ইউনিকোডে রূপান্তর হলো।
'রিবেং ইউনি'র উদ্ভাবক জ্যোতি চাকমা ও সুজ মরিজ চাকমা কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁদের নির্মিত www.uni.hilledu.com ওয়েবসাইটটি থেকে বিনামূল্যে চাকমা ইউনিকোড ফন্ট ও কিবোর্ড লে-আউট সফটওয়্যার ডাউনলোড করা যাবে। সাইটটি থেকে একই সঙ্গে পাওয়া যাবে কম্পিউটারে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে সেটিংস এবং ফন্টটির নানা খুঁটিনাটি তথ্যও। সাইটটিতে 'রিবেং ইউনি' ফন্ট ব্যবহারের নির্দেশাবলিও দেওয়া আছে। প্রযুক্তিগত সহায়তা ও ফন্ট নিয়ে আলোচনার জন্য সাইটে যোগ করা হয়েছে একটি বিশেষ পাতা।
জ্যোতি ও সুজ মরিজ বলেন, 'আমরা ভবিষ্যতে রিবেং ইউনিকে আরো পরিবর্তিত নতুন সংস্করণে নির্মাণ করতে চাই। ইন্টারনেটে রিবেং ইউনি ফন্টে লেখার টুলস্ সফটওয়্যার এবং মোবাইল ডিভাইস অ্যাপ্লিকেশনও নির্মাণ করতে চাইছি। এরই মধ্যে আমরা চাকমা ভাষায় ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। তবে এসব কাজে প্রচুর অর্থ সহায়তা প্রয়োজন।'
যুক্তরাজ্যের কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং মুক্ত জ্ঞানের বিদ্যালয় শিক্ষক ডটকম http://www.shikkhok.com/ এর নির্মাতা ড. রাগিব হাসান 'রিবেং ইউনি'র সাফল্যকে স্বাগত জানান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, চাকমা ভাষা ইউনিকোডে রূপান্তর হওয়াটা দারুণ সুসংবাদ। চাকমা ভাষার ইউনিকোড এনকোডিং তৈরি হওয়ার মানে হলো এটি এখন আরো সহজে ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহার করা যাবে, নানা সাইটে এই ভাষার ব্যবহার বাড়বে।
রাগিব হাসান বলেন, "পৃথিবীর নানা জায়গায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলো আজ বিপন্ন। ডিজিটাল তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারই এসব ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সংশ্লিষ্ট ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশের কাজ ত্বরান্বিত করতে পারে। এ কারণে 'রিবেং ইউনি' উদ্ভাবনের পর চাকমা জনগোষ্ঠী নিজস্ব সংস্কৃতির গৌরব টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি আমরা এই ভাষাভাষীর কাছে চাকমা লিপিতেই নানা জ্ঞানবিজ্ঞান পৌঁছে দিতে পারি।"
বাংলা ইউকিপিডিয়ার প্রধান উদ্যোক্তা রাগিব হাসান আরো বলেন, 'আমার জানা মতে, বাংলা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো লিপি ইউনিকোডে যোগ হয়নি। কিছু ভাষা, যেমন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা বাংলালিপিতে লেখা হয়।'
আদিবাসী গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৭৫টি ভাষাগত সংখ্যালঘু আদিবাসী জনজাতি বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। এর মধ্যে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর পরই চাকমারা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও ১৩টি আদিবাসী পাহাড়ি মিলিয়ে প্রায় ১৬ লাখ লোকের বাস। এদের প্রায় অর্ধেকই পাহাড়ি। আবার তাদের মধ্যে চার লাখেরও বেশি চাকমা জনগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, অরুণাচল, মিজোরামসহ অন্যান্য অঞ্চলে অল্প কিছু চাকমা বসবাস করে। চলতি বছর জানুয়ারির তথ্যানুসারে, বিশ্বে ১০০টি লিপি ইউনিকোডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নানা ভাষার এক লাখ দশ হাজার ১৮১টি অক্ষর স্থান পেয়েছে ইউনিকোডে।
ইউনিকোডভিত্তিকি সাঁওতালি টাইপিং সফটওয়্যার 'হড় কাথা' ও সাঁওতালি উইকিপিডিয়ার প্রধান নির্মাতা সমর মাইকেল সরেন কালের কণ্ঠকে বলেন, চাকমালিপি ইউনিকোডে যুক্ত হওয়ায় আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতির গৌরব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। প্রতিষ্ঠা পাবে আদিবাসীদের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিটিও।
বিশিষ্ট আদিবাসী লেখক সুসময় চাকমা বলেন, 'রিবেং ইউনির মাধ্যমে আমরা এবার একটি নতুন বিশ্বে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। এখন থেকে নিজ মাতৃভাষায় ওয়েবে লিখে তা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দিতে আর বাধা রইল না।'
কবি মৃত্তিকা চাকমা বলেন, 'চাকমা ফন্ট ইউনিকোডে রূপান্তরের খবরে আমি খুবই আনন্দিত। এতে চাকমা ভাষা এক ধাপ এগিয়ে গেল; এটি পুরো ভাষার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।'
আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৬৪৬৯৪
পুরোনো সংখ্যা
সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন, উপদেষ্টা সম্পাদক : অমিত হাবিব, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com
free counters
Latest News Portal Food Recipe in Bangladesh jobs in Bangladesh