kalerkantho

মানবতার সেবায় তানজিল

শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও।’ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পাশে নিরলস কাজ করে যাওয়া এমনই মানুষ তানজিল ফেরদৌস। তাঁর কথা জানাচ্ছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ

৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানবতার সেবায় তানজিল

রোহিঙ্গা শিবিরে তানজিল ফেরদৌস

জীবনভর ডাক্তার হতে না পারার আফসোস করেছেন মা; কিন্তু দমে যাননি। ওই আফসোসকেই অনুপ্রেরণা করে মানুষের সেবা করে গেছেন। এখান থেকেই উত্সাহটা পেয়েছেন তানজিল। খুব ছোট্ট যখন, ক্লাস সিক্সে কি সেভেনে পড়েন চট্টগ্রামের সানশাইন গ্রামার স্কুলে, খেয়াল করলেন স্কুলের আয়াদের বাচ্চারা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কোথাও যাচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে স্যারদের জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘এই স্কুলের ঠিক পেছনেই রয়েছে সানশাইন ভিলেজ। এ স্কুলের উদ্যোগেই ওদের পড়ানো হয়। চাইলে তোমরাও ওদের পড়াতে পারো।’ সেই থেকে তানজিলও পড়াতে শুরু করলেন সেই শিশুদের। তাঁর সমাজসেবার যাত্রা শুরু এভাবেই।

এরপর স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে কাজ শুরু করলেন তানজিল। একবার ক্লাসের বন্ধুরা মিলে টাকা তুলে বেশ কয়েকটি বিস্কুটের বয়াম আর ফ্লাস্ক কিনলেন। তারপর এক বস্তিতে গিয়ে কয়েকজন নারীকে একটা করে বয়াম ও ফ্লাস্ক দিলেন, যেন তাঁরা ব্যবসায় করে পরিবারের আর্থিক কাজে সহায়তা করতে পারে। কয়েক মাস পর ওই বস্তিতে গিয়ে তানজিল দেখেছিলেন, সেই নারীদের অল্প কয়েকজন তখনো ব্যবসায় লেগে আছেন। দেখে খুব আনন্দ হলো তাঁর। সে সময় তানজিল চট্টগ্রামে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর খোঁজ নিতে লাগলেন। উদ্দেশ্য, তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কাজে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়া। ২০১১ সালে খোঁজ পেলেন ‘জাগো ফাউন্ডেশন’ ও ‘ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ’-এর। তিনি তখন একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। জানলেন, এই সংগঠনগুলো সমাজসেবামূলক নানা ইভেন্টে জড়িত। তানজিলও যুক্ত হয়ে গেলেন। পরের বছর ‘ইউনিভার্সাল চিলড্রেন ডে’র জন্য কাজ শুরু করলেন। দিবসটি ১৯ নভেম্বর পালিত হয়। তানজিল বললেন, ‘‘দিনটিতে বিভিন্ন কাজ ভাগ করে নিই আমরা। কেউ পথশিশুদের কাজ করে দিই, যেমন ফুল বা মালা বিক্রি করা। আবার কেউ ওদের নিয়ে যাই কোনো শিশু পার্কে বা বিনোদনের জায়গায়; এক বেলা খাওয়াই, ওদের জন্য বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন করি। যাঁরা পথশিশুদের কাজ করে দেন, তাঁরা উন্মুক্ত তহবিল সংগ্রহ করেন। শিশুদের অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করেন। প্রথমবার এ কাজ করে আমি বেশ আনন্দ পেয়েছিলাম। অনেক টাকা উঠেছিল সেইবার। সেই টাকা দিয়ে চট্টগ্রামের মতিঝর্ণা বস্তিতে একটা স্কুল খোলা হয়। ‘জাগো ফাউন্ডেশন স্কুল’। এখন সেখানে দুই হাজারেরও বেশি সুবিধাবঞ্চিত শিশু পড়ালেখা করে।’’ এই কাজটি তানজিলকে বেশ আলোড়িত করেছিল। অন্যদিকে ‘ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ’-এ প্রথমে জেনারেল ভলান্টিয়ার হিসেবে সবাইকে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে যাঁরা বেশ নিয়মিত থাকেন, তাঁরা হন কোর ভলান্টিয়ার। তারপর কমিটি মেম্বার হওয়ার জন্য আবেদন করতে হয় জেলাপর্যায়ের মেম্বারদের কাছে। তাঁরা সাক্ষাত্কার নিয়ে পরে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। যোগদানের এক বছরের মাথায়ই তানজিল কমিটি মেম্বার হয়ে যান। আর তার পরই ৩২ জেলার কমিটি মেম্বারদের নিয়ে আয়োজন করেন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। এর উদ্দেশ্যও তহবিল

সংগ্রহ।

২০১৫ সালে কমিটি মেম্বারদের ভোটে ‘ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ’-এর চট্টগ্রাম জেলা বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হন তানজিল। একই সঙ্গে পড়তে থাকেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন্সের অর্থনীতি বিভাগে। পড়াশোনা ও সমাজসেবা একসঙ্গে কিভাবে চালাচ্ছিলেন তিনি। বললেন, ‘দুটির মধ্যে সমন্বয় করতে বেশ ঝামেলা হতো আমার। তবে বন্ধু ও শিক্ষকরা খুব সাহায্য করেছেন। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক, তাই আমার বেশ কিছু বিদেশি বন্ধুও ছিল। এই স্বেচ্ছাসেবী কাজ আমাকে চাকরি পেতেও সাহায্য করেছে।’ একই বছর ‘জাগো ফাউন্ডেশনে’ পার্টনারশিপ অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং অফিসার পদে যোগ দেন তানজিল। তারপর দেশজুড়ে অবস্থিত সংগঠনটির ১৩টি স্কুলের জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে তহবিল সংগ্রহ শুরু করেন। অন্যদিকে তিনি এখন ‘ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশে’র বিভাগীয় কমিটির সহসভাপতি। বললেন, ‘জেলা কমিটির সভাপতি থাকা অবস্থায় আমি কোর মেম্বার বাড়ানোর চেষ্টা করে সফল হয়েছি। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্য থেকে একটি নারী টিম বানিয়েছিলাম, এরা বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি আমাদের বার্ষিক সম্মিলনে ক্রিকেট খেলায়ও ছেলেদের টিমের বিপক্ষে অংশ নিত। বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলে দেয়।’ প্রতিবছর ‘ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ’-এর জেলা কমিটির মেম্বারদের নিয়ে চার দিনব্যাপী ন্যাশনাল ইয়ুথ অ্যাসেম্বলি অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয় গাঢ় হয়। নতুন নতুন আইডিয়া উঠে আসে। এবার এই ইয়ুথ অ্যাসেম্বলিকে একটু আলাদাভাবে করার পরিকল্পনা করছেন তানজিল। স্বেচ্ছাসেবী কাজে আগ্রহী প্রায় ৫০০ তরুণকে নিয়ে অ্যাসেম্বলি করবেন তিনি। আবেদন, রেজিস্ট্রেশন ছাড়াও বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এতে যে কেউ অংশ নিতে পারবে। 

২০১৬ সালের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ শুরু করেন তানজিল। শুরুতে ওদের জীবনযাত্রা নিয়ে গবেষণা করেন। কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে থাকেন। ২০১৭ সালের জুনে তাদের নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যে ইন্টার্নশিপের আবেদন করেন ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজিতে (ইউএনএইচসিআর)। তিন মাস মেয়াদি সেই ইন্টার্নশিপে সংস্থাটির বিভিন্ন প্রজেক্টে গিয়ে বিভিন্ন কাজ দেখেছেন ও শরণার্থীদের সহায়তা করেছেন তানজিল। এর মধ্যে একটা কাজ ছিল অল্টারনেট ফুয়েল সিস্টেম নিয়ে। কাপড় দিয়ে বানানো একটি হটপট, আধা সিদ্ধ কোনো খাবার তাতে রাখলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সিদ্ধ হয়ে যাবে। তানজিলরা রোহিঙ্গা নারীদের এই হটপট সরবরাহ করে সবাইকে বোঝাতেন, কেন এর ব্যবহার তাদের জন্য জরুরি। সে বছরের অক্টোবর মাসে তিনি সংস্থাটির প্রগ্রাম ইউনিটে পূর্ণকালীন চাকরিজীবী হিসেবে যোগ দেন। তারপর থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাবতীয় কাজের আয়োজন, মনিটরিং আর প্রয়োগের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন তিনি।

গত বছরের জানুয়ারিতে তিনি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ফোন পান। তাঁকে জানানো হয়, ‘উদীয়মান তরুণ নেতৃত্ব সম্মাননা’ (ইমার্জিং গ্লোবাল ইয়ং লিডারস অ্যাওয়ার্ড) পাওয়ার খবরটি। মানবসেবার জন্য নিরলস কাজ করে যাওয়া বিশ্বের ১০ তরুণকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে এপ্রিলে এই দশজনকে অনলাইনে একটি লিডারশিপ কোর্স করানো হয়। তারপর দুই সপ্তাহের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় আমেরিকায়। সেখানে যাওয়ার পর সম্মাননা প্রদান, অভিজ্ঞতা বিনিময়, একটি কোর্স করানো ইত্যাদি কর্মসূচি রয়েছে। তানজিল বলছিলেন, ‘আমাদের একই জায়গায় থাকতে দেওয়া হয়েছিল। ফলে আমরা পরস্পরের কাজ সম্পর্কে বেশ ভালোভাবে জেনেছি। সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আমাদের। সেখানকার শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সবচেয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমাদের শরণার্থীদের আমরা জায়গা দিচ্ছি, থাকার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি; কিন্তু সেখানকার অবস্থা একটু ভিন্ন। তাঁরা এদের নিজেদের মতো কাজ করতে গিয়ে নতুন করে বাঁচার সুযোগ করে দিচ্ছেন। শরণার্থীদের নিয়ে কাজের এই নতুন দিকটি আমেরিকায় গিয়ে আমার সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই সম্মাননা আমার দায়বদ্ধতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি সমাজের একজন, তাই সমাজের দায়টা যত দূর পারি, মেটানোর চেষ্টা করি। আর এখন থেকে এটি আরো জোর দিয়েই করব।’ তানজিল ফেরদৌস এখনো ইউএনএইচসিআরেই আছেন। রোহিঙ্গাদের সেবায় কেটে যাচ্ছে তাঁর দিন-রাত।

মন্তব্য