kalerkantho

অবিচল শিলা

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



অবিচল শিলা

সাঁতারে বাংলাদেশের কোনো মেয়ে কখনো যা পারেনি, তা-ই করেছেন মাহফুজা খাতুন শিলা। প্রথম নারী সাঁতারু হিসেবে এসএ গেমসে জিতেছেন সোনা। ২০১৬ সালের গুয়াহাটির সেই আসরে জোড়া সোনা জিতে হয়েছেন বাংলাদেশের সেরা অ্যাথলেট। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন শাহজাহান কবির

 

সাঁতার। মেয়েদের এই খেলাকে বাঁকা চোখে দেখেন অনেকে। শিলা ছোটবেলা থেকে সেই ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে এসেছেন। বাবা দেখেছিলেন মেয়ের মধ্যে সম্ভাবনার ছবি। কিন্তু অভাবের সংসারে তাঁর পরিচর্যা হবে কী করে। সরকারি শিশুসদনে রেখে এসেছিলেন তাই। সেখানেই শিলা পেয়েছেন কোচের সাহচর্য, খাওয়া-পরার নিশ্চয়তা। আলী আহমদ গাজী একদিন মেয়েকে দেখতে আসেন। একথা-সেকথার মাঝে কোনো এক কথায় শিলার চোখ ভরে জল। বাবা যে পথের খরচ জোগাতে মেয়ের শখের মোরগটাই বিক্রি করে এসেছেন। কোচ আব্দুল মান্নান শিষ্যকে শান্ত করেন, ফেরার সময় আলী আহমদের হাতে সামান্য কিছু টাকাও গুঁজে দিয়েছিলেন। মেয়ের মুখ চেয়ে সেদিন শুধু আশীর্বাদ করেই ফিরে এসেছিলেন তিনি। সেই আশীর্বাদ মিছে হয়নি। শিলা একটা একটা ধাপ পেরিয়ে উঠে এসেছেন ঠিক সাফল্যের শিখরে। সাঁতারে বাংলাদেশের কোনো মেয়ে কখনো যা পারেনি, তা-ই করেছেন মাহফুজা খাতুন শিলা। প্রথম নারী সাঁতারু হিসেবে এসএ গেমসে জিতেছেন সোনা। ২০১৬ সালে গুয়াহাটির সেই আসরে জোড়া সোনা জিতে হয়েছেন বাংলাদেশের সেরা অ্যাথলেট। দ্বিতীয় সোনায় দক্ষিণ এশীয় গেমসের ১০ বছরের পুরনো রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছেন তিনি।

শিলার বাধা জয়ের গল্পের সেটি শেষ অঙ্ক। ২০১০ সালে অর্থাৎ আগের এসএ গেমেসই জোড়া রুপা জিতেছিলেন। একটিতে তো সোনার খুবই কাছাকাছি ছিলেন। ফটো ফিনিশে হেরে যান লঙ্কান দীর্ঘদেহী প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে। কেউ কেউ বলেছেন, উচ্চতার কারণেই হেরে গেছেন শিলা। তখন প্রতিবাদ করেননি, জেদটা তিনি পুষে রেখেছিলেন। জেদ ছিল আরো। ২০১০-এর সেই পারফরম্যান্সের পর ফেডারেশনের বিশেষ নজর প্রত্যাশী ছিলেন, বিশেষ প্রশিক্ষণের সুযোগ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আবারও নিজেকে মেলে ধরার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ফেডারেশন থেকে অদ্ভুতভাবে পেয়েছেন উপেক্ষা। ছয় বছর পর আরেকটা এসএ গেমস যখন সামনে, তখন তাঁকে বলা হলো, ‘বুড়িয়ে গেছেন।’ কোরিয়ান কোচ পার্ক তেগুন শুধু আস্থা রেখেছিলেন। এতটুকু ভালোবাসার ছোঁয়াতেই শিলা লক্ষ্যে অবিচল থাকার শক্তিটুকু পেয়ে যান। গুয়াহাটিতে জোড়া সোনা জিতে দেখান পাহাড় সমান আত্মবিশ্বাসটা।

নইলে কি আর দিন এনে দিন খাওয়ার সংসারে থেকে সাঁতার ক্যারিয়ারের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় মাস্টার্সও করে ফেলেন! ছোটবেলায় শিশু একাডেমি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে স্থানীয় কোচের নজরে পড়েছিলেন। তাঁর হাত ধরেই ঢাকায় জাতীয় প্রতিযোগিতায় সিনিয়রদের পেরিয়ে গিয়ে গড়েন নতুন জাতীয় রেকর্ড। এমন কাঁচা সোনাকে চিনতে ভুল হয় না বিকেএসপির। শিলার জীবনের মোড় ঘুরে যায় সেখানেই। সত্যিকারের একজন ক্রীড়াবিদ হয়ে ওঠেন। দেখেন একজন সফল মানুষ হওয়ার স্বপ্ন। বিকেএসপি থেকে বেরিয়েও তাই পড়াশোনা বাদ দেননি। এমনও সময় গেছে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে প্রতিযোগিতা শেষ করে রাতের ট্রেনেই আবার ফিরে পরদিন সকালে পরীক্ষা দিতে বসেছেন। শিশু একাডেমি থেকে যে দুটি পদক জিতেছিলেন, বাবার অসুস্থতার একটা পর্যায়ে শিলাকে না জানিয়েই মা করিমুননেসা তা বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন। সাহায্য করার মানসে একজন তা কিনেও নিয়েছিলেন। শিলা খবর শুনে আবারও সেদিন কেঁদেছিলেন। কিন্তু ভেঙে পড়েননি। এমন আরো অনেক পদক জয়ের লড়াইয়ে ঝাঁপিয়েছেন। ২০০৬ কলম্বো এসএ গেমসে জেতেন দুটো ব্রোঞ্জ, ২০১০-এ ওই দুটোই হয় রুপা। শিলা এতটাই অবিচল, ছয় বছর পর আরেকটা আসরে ঠিক জোড়া সোনা জিতেই দেখিয়েছেন ভেতরের আগুনটা।

যশোরের অভয়নগরে তাঁকে এখন কে না চেনে। অভয়নগরবাসীর গর্ব এখন শিলা। ছোটবেলায় যে পুকুরে সাঁতার কাটতেন, নওয়াপাড়ার সেই মোকসেদ মোল্লার পুকুরপারও এখন বিখ্যাত হয়ে গেছে। তাঁর বাড়ি যাওয়ার রাস্তায় ‘এই পথে এসএ গেমসে সোনাজয়ী মাহফুজা খাতুনের বাড়ি’ লেখা রোডমার্ক পর্যন্ত বসে গেছে। বাবার অসুস্থতায় মাকে একদিন মেয়ের পদক বিক্রি করতে হয়েছিল, সেই মাকে এখন তিনি ভারতের সেরা হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন। মায়ের অসুস্থতায়ই এই মুহূর্তে কাতর সোনার মেয়ে। ছয় মাস ধরে মাকে নিয়ে ভেলোর আছেন তিনি। তাতে আগামী এসএ গেমসের প্রস্তুতিতে বিঘ্ন হচ্ছে হোক, তিনি তো জানেন কিভাবে ঠিক লড়াইয়ে ফিরতে হয়। এ দেশের অন্য মেয়েদেরও অনুপ্রেরণার নাম যে এখন তিনি। তাঁকে তো হেরে গেলে চলে না। ২০০৬ এসএ গেমসে সোনা জেতা আরেক সাঁতারু শাহজাহান আলী রনিকে বিয়ে করেছেন। পরিবার আর সাঁতার নিয়েই তাই তাঁর পুরো জীবন। সে কারণে সাংবাদিকতায় পড়াশোনা শেষ হলেও এখনো সাংবাদিকতা শুরু হয়নি তাঁর। একটা সময় হয়তো তা-ও করবেন। তবে পড়াশোনায় এগিয়ে থাকার সুফল তিনি পেয়েছেন সাঁতারেই। সাঁতার কোচদের বিশ্লেষণেও ধরা পড়েছে তা। শিলা যে সহজেই টেকনিক্যাল বিষয়গুলো আয়ত্তে নেন, তা তাঁর ওই একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণেই—এমনটাই মত তাঁদের। ঘরে-বাইরে তাই তিনি একজন সফল নারীর উদাহরণ, শত ঝড়ে ভেঙে না পড়া অবিচল একজন। তাঁকে দেখেই এখন আরো মেয়েরা আসছে সাঁতারে। সংখ্যাটা ক্রমেই পড়তির দিকে ছিল। তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েই ফেডারেশন এসএ গেমসের পরপরই শুরু করে দেশব্যাপী সাঁতার প্রতিভা অন্বেষণ ‘সেরা সাঁতারুর খোঁজে’।

মাকে সুস্থ করে ফিরিয়ে এনে আবার নিশ্চয়ই ফিরবেন তিনি সাঁতারপুলে। মিরপুর পুলের নীল জলরাশি এই সোনার মেয়েকে আবার আবেশে জড়াবে, তিনি তাতে সুখের নাচন তুলে ছুটবেন আবার নতুন শিখর পানে।


মন্তব্য