kalerkantho

শারমীন সুলতানা সুমী

গানে গানে...

ব্যান্ড চিরকুটের ভোকাল, গীতিকার। পাশাপাশি শারমীন সুলতানা সুমী একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর গল্প শোনালেন

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



গানে গানে...

ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে বাবা, মামা, কাজিনরা সবাই খুবই ওপেন, বন্ধুভাবাপন্ন। বাসায় সব সময় আড্ডা হতো, জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা হতো, গানের আসর বসত। এমন একটা পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা। বাসা থেকে টাকা আনতাম না। টিউশনি করে পড়ার খরচ জোগাতাম। মনে পড়ে, একবার বাণিজ্য মেলায় পুরো মাস চা বিক্রি করেছি।  সেই সময়টাতেই, ২০০২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাইদের নিয়ে গড়ে তুলি চিরকুট। একটি পরিবারের মতো হয়ে গান করতে চেয়েছিলাম। বাকিরা সবাই অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে একাই চিরকুট নিয়ে এগোতে থাকি। ২০০৬ সালে আমার সঙ্গে যোগ দেন গিটারিস্ট ইমন চৌধুরী। পর্যায়ক্রমে পিন্টু ঘোষ, পাভেল ও দিদারও আমাদের সঙ্গে মিলিত হন। ব্যান্ডটির বয়স এখন ১৫ বছর। প্রথম আট বছর অনেক কষ্ট করেছি, নিজেদের তৈরি করেছি। ২০১০ সালে প্রথম একক অ্যালবাম ‘চিরকুটনামা’ দিয়ে পরিচিতি আসতে থাকে। অডিওর পাশাপাশি চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপনচিত্র, স্টেজ, টিভি লাইভ প্রভৃতি মাধ্যমে একের পর এক কাজ করার সযোগ পেয়েছি। এসব কাজ মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান—উভয়ই এনে দিয়েছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়েছে আমাদের ব্যান্ডের নাম।

২০১৬ সালের মার্চে আমরা আমেরিকায় ‘সাউথ বাই সাউথওয়েস্ট’ ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক ফেস্টিভালে গান করি। এটা বিশ্বের অন্যতম সেরা ফেস্টিভাল, যেখানে দুই হাজার ১০০ ব্যান্ডের মধ্যে আমরা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছি। এটা অনেক গর্বের বিষয়। বাংলাদেশ থেকে আগে কোনো ব্যান্ড এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। সেবারের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছিলেন বারাক ওবামা। যাঁরা আমেরিকায় থাকেন তাঁরা জানেন এই আয়োজনের গুরুত্ব। সেখানকার বাঙালিরা তখন বলাবলি করছিল—আমরা কখনো বিশ্বাসও করতে পারিনি যে বাংলাদেশের একটা ব্যান্ড এখানে এসে পারফরম করতে পারবে। আমাদের পারফরম্যান্সের সময় সবাই দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছে! আন্তর্জাতিক মিডিয়া আমাদের নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছে। ২০১৪ সালে অংশ নিয়েছি ভারতে হয়ে যাওয়া সাউথ এশিয়ান ব্যান্ড ফেস্টিভালে, যেখানে সাউথ এশিয়ার মোট ১১টি ব্যান্ডকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মধ্যে একমাত্র আমরাই ‘ইন্ডিয়ান প্রেসিডেন্ট হাউস’-এ গান করার এবং থাকার সুযোগ পাই।

২০১২ সালে ‘ইন্ডিয়ান মিউজিক উইক’-এ পারফরম করেছি, যেখানে ১৭টি দেশের ৫০টি ব্যান্ড অংশ নেয়। সে অনুষ্ঠান দেখেই ‘এমটিভি ইন্ডিয়া’ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারপর টানা তিন বছর তারা আমাদের গান প্রচার করে। ২০১৩ সালে নরওয়ের ছয়টি শহরে শো করেছি। নরওয়ের রক ব্যান্ড ‘কাসা মরিলো’র সঙ্গে যৌথ কাজটি সে দেশের শ্রোতারা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করে। ২০১৬ সালে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত ‘সার্ক ফিল্ম ফেস্টিভাল অ্যাওয়ার্ড’-এ ‘জালালের গল্প’ চলচ্চিত্রের আবহসংগীতের জন্য পুরস্কারপ্রাপ্তিও আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। শ্রীলঙ্কায় ‘জাফনা মিউজিক ফেস্টিভাল’-এ ১০ দেশের শিল্পীদের সঙ্গে অংশ নিয়েছি। এ বছর একমাত্র ব্যান্ড হিসেবে বাংলা গান দিয়ে গল লিটারেরি ফেস্টিভালের উদ্বোধন করেছি। সারা পৃথিবীর বিখ্যাত সব লেখক-সাহিত্যিক আমাদের গান শুনেছেন। গত নভেম্বরে বেঙ্গালুরুতে ‘কনফারেন্স অন মিউজিক এডুকেশন’-এ অতিথি হওয়াটাও ছিল স্বপ্নের মতো। ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে নামকরা ইউনিভার্সিটি ইউনিভার্সিটি অব পেরাদেনিয়ায় ‘বাংলাদেশের মিউজিক’ বিষয়ে লেকচার দিয়েছি।

স্প্যানিশ ব্যান্ড ‘টোয়েন্টি ফোর হোরার’-এর সঙ্গে আমাদের করা ‘অন্তরে বাহিরে’ সে দেশে আলোচিত হয়েছে। গানটির প্রডিউসার ছিলেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী জোহান এলকোভার। গানটির জন্য আমরা ‘ল্যাটিনো অ্যাওয়ার্ড’ও জিতেছি। গত তিন বছর ‘উত্তরবঙ্গ উৎসব’-এর সমাপ্তি হয়েছে আমাদের পরিবেশনা দিয়ে।

কাজ করার সময় শুধু মাথায় রাখি, আমি একজন মানুষ। সব সময় স্বপ্ন দেখি পজিটিভ বাংলাদেশের, পজিটিভ কাজ করার। অন্যরা কী করছে সেটা না ভেবে নিজের কাজটা নিয়েই পড়ে থাকি। নেগেটিভ কোনো চিন্তা কখনো আমাকে স্পর্শ করতে পারে না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আমার কাছে মূল্যবান। যে কাজেই প্রতিবন্ধকতা এসেছে, জয় করার চেষ্টা করেছি। প্রতিদিন চেষ্টা করি ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরো ভালো কিছু করার। সৃষ্টিকর্তা আর নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকলে, সততা নিয়ে কাজ করলে, কঠোর পরিশ্রমী হলে, কাজের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে কেউ কাউকে থামাতে পারে না। এর প্রমাণ জীবনে বহুবার পেয়েছি।

         

অনুলিখন : রবিউল ইসলাম জীবন



মন্তব্য