kalerkantho

মেরিনা তাবাশ্যুম

শিকড়সন্ধানী স্থপতি

৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শিকড়সন্ধানী স্থপতি

অনন্য স্থাপনার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘরের দুজন স্থপতির তিনি একজন। সম্প্রতি জামিল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠে এসেছেন। মেরিনা তাবাশ্যুমের গল্প জানাচ্ছেন আতিফ আতাউর

 

মেরিনা তাবাশ্যুমের জয়যাত্রা যেন থামছেই না। শিল্পকলা ও নকশার মর্যাদাপূর্ণ জামিল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় উঠে এসেছেন বাংলাদেশের এই স্থপতি। মনোনীতদের কাজ ২৭ জুন থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত লন্ডনের ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হবে। ইসলামী ঐতিহ্যে অনুপ্রাণিত সমকালীন শিল্প ও নকশার জন্য জামিল পুরস্কারের এই সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করে ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট জাদুঘর। আগামী ২৭ জুন ঘোষণা করা হবে জয়ীর নাম। বিশ্বের ৪০০ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সিলেকশন কমিটি আটজনকে বেছে নিয়েছে। এবারই এই প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো উঠে এলো কোনো বাংলাদেশি স্থপতির নাম। পুরস্কারের অর্থমূল্য ২৫ হাজার ইউরো। দুই বছর পর পর দেওয়া হয় এই পুরস্কার। ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট জাদুঘরের সঙ্গে যৌথভাবে ২০০৯ সাল থেকে এই পুরস্কার প্রবর্তন করে ব্রিটিশ সংস্থা আর্ট জামিল। এত দিন শিল্পকলা ফ্যাশন ডিজাইনে দেওয়া হলেও এবারই যুক্ত হলো স্থাপত্যকলা। ঢাকার দক্ষিণখানে বায়তুর রউফ নামের শৈল্পিক নকশার মসজিদের স্থপতি হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি।

মেরিনাদের পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের ছিল টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে পড়াশোনা। তাঁর বাবা ছিলেন মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক। এ জন্য সবাই চেয়েছেন, মেরিনাও টেকনিক্যাল কোনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করুক। মেরিনার আগ্রহ ছিল স্থাপত্যের প্রতি। হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসির পাট চুকিয়ে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে [বুয়েট]। পড়াশোনার প্রতি বরাবরই সিরিয়াস। বলেন, ‘লেখাপড়া কখনোই আমার কাছে একঘেয়ে মনে হয়নি। পড়ার মধ্যে আনন্দ পেতাম। এ জন্য ক্লাসেও বরাবর প্রথম সারিতে থাকতাম। বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায়ও ভালো ফল করেছিলাম।’ বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৯৫ সালে তিনি ও কাশেফ মাহবুব চৌধুরী মিলে গড়ে তোলেন আর্কিটেক্টস ফার্ম ‘আরবানা’। এই ফার্ম থেকেই তিনি ও কাশেফ   সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ ও স্বাধীনতা জাদুঘর কমপ্লেক্স তৈরির কাজ শুরু করেন। এমন একটা প্রকল্পে সুযোগ পেয়ে তখন দারুণ উত্তেজিত তিনি। বলেন, ‘সদ্য পড়াশোনা শেষ করেছি। মনের মধ্যে আর্কিটেক্টস নিয়ে স্বপ্ন ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। জাদুঘরের জন্য নকশা আহ্বান করা হয়েছিল। আমরা দিনরাত খেটে নকশা তৈরি করে জমা দিই। আমাদের আত্মবিশ্বাস, ভালো কিছু হয়েছে। পরে এত এত নকশার ভিড়ে আমাদেরটা সেরা হওয়ায় খুব খুশি হয়েছিলাম।’

২০০৫ সালে আরবানা ছেড়ে দেন মেরিনা। পরে গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘মেরিনা তাবাশ্যুম আর্কিটেক্টস’ [এমটিএ]। এখানে আবার সব কিছু নতুন করে শুরু করেন। স্বাধীনতা জাদুঘরের কাজ করতে গিয়ে গুণী স্থপতিদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। তাঁদের পরামর্শও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে তাঁকে। আরবানায় কাজের সময় ২০০৪ সালে ‘অনন্যা পুরস্কার’ পান। সাহস জোগায় সেটাও। নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে বেশ কিছু প্রকল্প শুরু করেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ঢাকার দক্ষিণখান থানার ফায়দাবাদের বায়তুর রউফ মসজিদ। শুরু থেকেই মসজিদটির নকশায় ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। বলেন, ‘এ অঞ্চলের মানুষ মসজিদের চিরাচরিত যে চিত্রের সঙ্গে পরিচিত তার চেয়ে ভিন্ন কিছু করতে চেয়েছিলাম। মসজিদ বললেই আমাদের মনে মিনার বা গম্বুজের চিত্র ভেসে ওঠে। কিন্তু বায়তুর রউফে কোনো মিনার বা গম্বুজ নেই। আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, মসজিদটিতে শীত বা গরমের বিরূপ আবহাওয়া বুঝতে পারা যাবে না। নকশায় বায়ু ও আলো চলাচলের দিকটিও এ জন্য অন্যভাবে করা হয়েছে।’

মসজিদটি নির্মাণে যাতে আমাদের স্থানীয় উপকরণই ব্যবহার করা যায় সেই দিকটা বিবেচনায় রেখেছিলেন ডিজাইনে। সুলতানি আমলের মসজিদের অনুপ্রেরণায় এই স্থাপত্যের নকশা করেছেন মেরিনা। অভিনব ডিজাইনের এই মসজিদের স্থাপত্যই তাঁকে এনে দিয়েছে স্থপতিদের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের আরেক স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর সঙ্গে তিনি এই পুরস্কারে ভূষিত হন, যার অর্থমূল্য ১০ লাখ মার্কিন ডলার। এর আগে বাংলাদেশের আরো তিনটি স্থাপত্য এই পুরস্কার জিতলেও সেগুলোর স্থপতি ছিলেন বিদেশি। বেশ কয়েকবার চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েও পুরস্কারটি জিততে পারছিলেন না কোনো বাংলাদেশি। মেরিনা ও কাশেফের মধ্য দিয়ে ঘোচে সেই বন্ধ্যত্ব। ওই বছর পুরস্কারের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৩৮৪টি প্রকল্প জমা পড়েছিল। সেখান থেকে সেরা ১৯টি প্রকল্প নির্বাচিত হয়। তার মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হয় সেরা ছয়টি প্রকল্প। এর আগে ২০০৪ সালে আগা খান পুরস্কারের জন্য প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। বিশ্বজুড়ে তরুণ স্থপতিদের উদ্ভাবনী ধারণাকে স্বীকৃতি দিতে আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক [একেডিএন] প্রতি তিন বছরে একবার এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। এমন একটি পুরস্কার কতটা অনুপ্রাণিত করেছিল আপনাকে? মেরিনা বলেন, ‘পুরস্কারটিতে নির্বাচিত হতে ধাপে ধাপে এবং অত্যন্ত কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। স্থাপত্য নিয়ে আমার পরিশ্রমের ফসল এই পুরস্কার। এটা শুধু কাজের স্বীকৃতি নয়, বরং তরুণ স্থপতিদের জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক। এটা দেশের জন্যও অনেক বড় একটি অর্জন।’

যশোরের পানিগ্রাম রিসোর্টের নকশা করেছেন মেরিনা। এখানেও স্থানীয় কারিগরের তৈরি রোদে শুকানো ইট, গোলপাতার ছাউনি, কাঠ-বাঁশের আসবাব ও নকশিকাঁথা দিয়ে সাজিয়েছেন প্রতিটি কটেজ। ঢাকার বনানীতে কমফোর্ট রিভেরিওতে রেখেছেন নিজস্ব স্থাপত্যরীতির ছোঁয়া। আগা খান অ্যাওয়ার্ডের আগে নেক-১০ প্রজেক্টের জন্য ভারত থেকে পেয়েছেন ‘আর্কিটেক্ট অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার। কাজ করেছেন ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার ফেস্টিভালের বিচারক হিসেবেও। বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজের পাশাপাশি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছেন। বেঙ্গল ইনস্টিটিউটের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর তিনি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে পড়ান।

স্থাপত্যবিদ্যাই এখন তাঁর ধ্যানজ্ঞান। তিনি চান, তরুণরা আরো বেশি এগিয়ে আসুক এই সেক্টরে। বলেন, ‘স্থাপত্য এখন আমার শুধু পেশা নয়, নেশাও। তরুণ স্থপতিদেরও বিষয়টি সেভাবেই গ্রহণ করা উচিত। বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের স্থাপত্য উপযোগী সেদিকে সবার আগে মনোযোগ দিতে হবে। শুধু শহরকেন্দ্রিক চিন্তা না করে গ্রামকে নিয়েও ভাবতে হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ছাপ তুলে ধরতে হবে। আমাদের শিকড়কে ভুলে গেলে চলবে না। শিকড় থেকে শিখরে ওঠার চেষ্টা করতে হবে।’



মন্তব্য