kalerkantho


ইসলামে সদকার গুরুত্ব

আ শ ম বাবর আলী

   

৬ এপ্রিল, ২০১২ ০০:০০



ইসলামে সদকার গুরুত্ব

সদকা অর্থাৎ দান বান্দার প্রতি পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার অন্যতম নির্দেশিত বিধান। এর মাধ্যমে মানব জীবনের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ সাধিত হয়। সচ্ছল ও সামর্থ্যবান ব্যক্তি কর্তৃক অসচ্ছল ও অসামর্থ্যবান ব্যক্তিকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কিছু দান করাকে সদকা বলে। সদকা দুই ধরনের হতে পারে। বাধ্যতামূলক ও ঐচ্ছিক। জাকাত ও ফিতরা বাধ্যতামূলক সদকা। এ ছাড়া অন্যান্য দান ঐচ্ছিক সদকার পর্যায়ভুক্ত। এ উভয় শ্রেণীর সদকাই সওয়াবের হলেও কিছু পার্থক্য আছে। বাধ্যতামূলক সদকা প্রদান না করা পাপ। যেমন- বছরান্তে অবস্থিত সম্পদের মধ্য থেকে নির্ধারিত অংশ জাকাত প্রদান না করলে ওই সমুদয় সম্পদই অবৈধ হয়ে যায়। তখন ওই সম্পদ ভোগ করাও অবৈধ বা পাপ। আবার রমজানের রোজা রাখার পর রোজাদার ব্যক্তি যদি নির্ধারিত পরিমাণের ফিতরা প্রদান না করেন, তাহলে ওই রোজা অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে। এ ধরনের সদকা প্রদানে ব্যর্থ হলে গুনাহ হয়। আর প্রদান করলে গুনাহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। অধিকন্তু সওয়াব অর্জিত হয়। কিন্তু ঐচ্ছিক সদকা প্রদানে সওয়াবেরই অংশ বেশি, যদিও অধিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দান না করায় গুনাহ আছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে এটাই বলা যেতে পারে যে বাধ্যতামূলক সদকার ব্যাপারে গুনাহমুক্তি এবং ঐচ্ছিক সদকার ব্যাপারে সওয়াব অর্জনের প্রাধান্যই বেশি। সদকা সম্পর্কে আল কোরআনে বলা হয়েছে, 'হে নবী! তাদের বলুন, আমার রব নিজের বান্দার মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা করেন ব্যাপক রিজিক দিয়ে থাকেন। আর যাকে ইচ্ছা করেন কম প্রদান করেন। যা কিছু তোমরা ব্যয় করে থাক, সেই স্থানে তিনি আরো প্রদান করে থাকেন।' অর্থাৎ এতে উপলব্ধি করা যায়, দান অর্থাৎ সদকা প্রদানে সঞ্চিত সম্পদ কখনো কমে না; বরং এর বৃদ্ধি ঘটে থাকে। সদকা প্রদানের সময় সম্পর্কে সুরা আল-মুনাফিকুনে বলা হয়েছে- 'এবং ব্যয় করো তা থেকে, যা আমি তোমাদের দিয়েছি। তোমাদের মধ্যে কারো মৃত্যু উপস্থিত হওয়ার আগেই এই ব্যয় করা উচিত। কেননা মৃত্যু উপস্থিত হলে তোমরা আবার বলবে, হে আমার রব! কেন তুমি আমাকে সময় দাও না? সময় পেলে আমি দান-খয়রাত করতাম এবং উত্তম ব্যক্তিরূপে পরিগণিত হতে পারতাম।' সদকা কাদের প্রদান করতে হবে? এ সম্পর্কে আল কোরআনের সুরা বাকারার ২১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'তোমরা যা খরচ কর পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, অভাবগ্রস্ত পিতৃহীন, পর্যটক সাহায্যপ্রার্থীকে।' কোরআনপাকের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে, 'সদকাপ্রাপ্তির প্রথম দাবিদার অভাবগ্রস্ত আত্মীয়স্বজন, এরপর অভাবগ্রস্ত প্রতিবেশী এবং সর্বশেষ অভাবগ্রস্ত দূরের মানুষ।' সদকা প্রদানে সম্পদ কমে না; বরং আরো বৃদ্ধি পায়। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনের সুরা বাকারার ২৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'তোমাদের মধ্যে কে আছে যে আল্লাহকে কারজে হাসানা প্রদান করবে? যাতে করে আল্লাহ তাকে কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে প্রতিদান দেবেন। সংকীর্ণ করা এবং প্রশস্ত করা- সবই আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত এবং তাঁর অভিমুখেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে।' সদকা অর্থাৎ দানের বস্তু বা সম্পদ সৎ পথে উপার্জিত হওয়া আবশ্যক। অসৎ পথে উপার্জিত সদকা কখনোই বৈধ নয়। এরূপ সদকা প্রদান বরং অকল্যাণকরই। এ ছাড়া ত্রুটিপূর্ণ নয়; উত্তম বস্তুই সদকা দেওয়া উচিত। এ সম্পর্কে সুরা বাকারার ২৬৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'হে বিশ্বাসীরা! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি জমি থেকে তোমাদের জন্য যা উৎপাদন করে দিই, তা থেকে যা ভালো, তা দান করো। মন্দ জিনিস দান করার ইচ্ছা করো না।' প্রকাশ্য সদকার চেয়ে গোপন সদকা অবশ্যই উত্তম। এর কারণ হচ্ছে, প্রকাশ্য সদকা প্রদানে কখনো কখনো আত্মঅহমিকা প্রকাশ হতে পারে। আবার দানগ্রহীতা ব্যক্তি মানসিকভাবে বিব্রত হতে পারেন। তাই আল কোরআনে প্রকাশ্য ও গোপন উভয় দান বা সদকাকে উৎসাহিত করে বলা হয়েছে, 'যারা নিজেদের ধনমাল দিনরাত গোপনে ও প্রকাশ্যে খরচ করে, তাদের প্রতিফল তাদের খোদার কাছেই প্রাপ্য রয়েছে এবং তাদের জন্য কোনো ভয় ও চিন্তার কারণ নেই।' ওই আয়াতে গোপন সদকা বা দানের সঙ্গে প্রকাশ্য সদকা বা দানের কথা বলা হলেও আল কোরআনের অধিকসংখ্যক আয়াতে গোপন সদকাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন- একই সুরার ২৭০-৭১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান কর, তাহলে তা ভালো। আর যদি তা গোপনে কর, এবং অভাবীকে দাও, তাহলে তা তোমাদের জন্য আরো ভালো। এর জন্য তিনি (আল্লাহ) তোমাদের কিছু পাপ মোচন করবেন।' অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশ্য দান করা যেতে পারে, যদি ওই দানকার্যের মাধ্যমে অন্যদের অনুরূপ কার্যে উৎসাহিত করার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ওই দান বা সদকার উদ্দেশ্য যদি হয় নিজের উদারতাকে অন্যদের প্রদর্শন করা, তাহলে অনুরূপ সদকা প্রদানে কোনো উপকার নেই। এ প্রসঙ্গে সুরা নিসার ৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও শেষ দিনে (কিয়ামতে) বিশ্বাস করে না, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না।' এরূপ সদকা বরং অকল্যাণকরই বটে। সদকা প্রদান করার পর যদি সে তা প্রচার করে বেড়ায়, তাহলে সে আরো ক্ষতিতে নিপতিত হয়। আল কোরআনে তাই এরূপ সদকা বা দানকে নিরুৎসাহিত করে বলা হয়েছে, 'হে বিশ্বাসীরা! দানের কথা প্রচার করে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে নষ্ট কর না ওই ব্যক্তির মতো, যে নিজের সম্পদ অন্যকে প্রদর্শনের জন্য ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না।' (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২৬১)। সদকা সম্পর্কে হাদিসে পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। হজরত রাসুলেপাক (সা.) তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে সদকা অর্থাৎ দান সম্পর্কে অনেক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'সদকা বা দান আল্লাহর ক্রোধকে উপশম করে এবং মৃত্যুযন্ত্রণাকে দূরীভূত করে।' (তিরমিজি)। অর্থাৎ এর দ্বারা এটাই বোঝা যায় যে আল্লাহর প্রসন্নতা লাভের জন্য সদকা একটি উত্তম মাধ্যম। বোখারি ও মুসলিম শরিফে সদকার বর্ণনায় বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'প্রত্যেক সৎকার্যই সদকা।' ওই হাদিসে তিনি আরো বলেছেন, 'সৎকার্য সামান্য হলেও, এমনকি সহাস্য মুখে তোমার ভ্রাতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাও হয়, তা করতে অবহেলা কর না।' একই হাদিসে উল্লেখ আছে, হজরত রাসুলেপাক (সা.) বলেছেন, 'সন্তুষ্টচিত্তে যা দান করা হয়, তা-ই উত্তম সদকা এবং তোমার আত্মীয়কেই প্রথম দান করো।' সদকার মাহাত্ম্য সম্পর্কে বোখারি ও মুসলিম শরিফে আবি ইবনে হাশেম (বা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আগুন থেকে বেঁচে থাকো। একটি খেজুর পরিমাণ সদকা দিয়ে হলেও এ আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করো।' একই ধরনের সুসংবাদ প্রদত্ত হয়েছে আরো একটি হাদিসে। উকবা বিন্-আম (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের সদকার ছায়ায় থাকবে। এমনকি তা মানুষের মধ্যে বেহেশত ও দোজখের ফয়সালা করে দেবে।' (ইবনে খাজিমা)। সদকার পরিমাণ কেমন হবে? এ সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছে, 'সামান্য এক টুকরো খেজুরও সদকা দেওয়া যেতে পারে। তবে সাধ্যমতো অধিক পরিমাণে সদকা প্রদানই উত্তম।' সদকার বস্তু কখনো ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। কারণ, সদকা দেওয়ার পর ওই বস্তুর ওপর তার আর কোনো অধিকার থাকে না। তাই ওই বস্তু ফিরিয়ে নেওয়া অতি জঘন্য ব্যাপার। এ প্রসঙ্গে বোখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার দানকে ফিরিয়ে নেয়, ওই ব্যক্তি যে বমি করে তা আবার ভক্ষণ করে।' শুধু একটি মাত্র ক্ষেত্রে দান ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান আছে। তা হচ্ছে, সন্তানের প্রতি পিতার দান। যদি এমন হয় যে পিতা তাঁর সব সম্পত্তি অথবা সম্পত্তির অধিক অংশ অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করে একজনকে দান করেছেন। এ ক্ষেত্রে পিতা ওই সন্তানের কাছ থেকে ওই দান ফিরিয়ে নিয়ে অন্য সন্তানদের মধ্যে সমবণ্টন করতে পারেন। শুধু পারেনই না, এরূপ করার জন্য রাসুলেপাক (সা.)-এর কঠোর নির্দেশ রয়েছে। এমনি ধরনের একটা নির্দেশ আছে বোখারি শরিফে। হজরত নোমান বিন বশীর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, '(সম্পদের সুবণ্টনের মাধ্যমে) তোমরা সন্তানদের প্রতি সুবিচার করো। আমি অন্যায়ের ওপর সাক্ষী হব না।' শুধু এই একটি ক্ষেত্র ছাড়া প্রদত্ত দান বা সদকা ফিরিয়ে নেওয়া নিষিদ্ধ।


মন্তব্য