kalerkantho

অ্যালবিনো

কেউ যদি বলে সিংহ, হরিণ, বাঘ কিংবা কুমিরের রং সাদা! তুমি নিশ্চয়ই অবাক হবে, তাই না? কিন্তু এমন প্রাণী সত্যি আছে। অনেক ক্ষেত্রেই এমন রঙের কারণ এরা অ্যালবিনো। আরো জানাচ্ছেন তাসলিমা নীলু

৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অ্যালবিনো

কয়েক বছর আগের কথা। গাজীপুরের কালিগঞ্জের রাথুরার শালবনের আশপাশের মানুষের মধ্যে হঠাত্ আতংক ছড়িয়ে পড়ে। রাতের বেলা বনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় কিংবা গ্রামের আশপাশে অদ্ভুত একটা সাদা জিনিস বা প্রাণী নজরে পড়ছে তাদের। এর নাম দিয়ে দিল তারা ‘সাদা ভূত’। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে মানুষজন জঙ্গলের আশপাশে ভেড়া বাদ দিয়ে দিল। এদিকে ওই এলাকার বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতেন সরওয়ার পাঠান নামের এক তরুণ। বন্য প্রাণী তাঁর কাছে ভারি আগ্রহের বিষয়। এক রাতে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় হঠাত্ তীব্র হুটোপুটির আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে দেখলেন, দুটো মেছো বাঘ তুমুল লড়াইয়ে ব্যস্ত। একটার চেহারা সাধারণ; কিন্তু আরেকটার গায়ের রং সাদা। তরুণের বুঝতে বাকি রইল না এটা অ্যালবিনো। একে নিয়েই গ্রামের লোকের এত ভয়। 

 

অ্যালবিনিজম

ল্যাতিন শব্দ অ্যালবাসের অর্থ ‘সাদা’ অথবা ‘বর্ণহীন’। অ্যালবিনিজম হলো একটি জন্মগত ব্যাধি, যা চুল, চোখ ও ত্বককে বিবর্ণ করে দেয়। স্বাভাবিক রঙের বদলে এরা হয়ে যায় সাদা। আমাদের ত্বকে মেলানিন নামে যে রঞ্জক থাকে, অ্যালবিনো প্রাণীর মধ্যে সেটি থাকে না, যার কারণে তারা ধবধবে সাদা হয়। এ ছাড়া বংশসূত্রে পাওয়া টাইরোসিনেজ নামক এনজাইমের অনুপস্থিতিতে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত টাইরোসিনেজের কারণেও অ্যালবিনিজম ঘটে। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী যেমন বাঘ, সিংহ, কুমির, তিমি, ডলফিন, পাখি, পোকামাকড়সহ নানা প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে অ্যালবিনিজম দেখা যায়।

বিখ্যাত অ্যালবিনো

তুষারকণা : ষাটের দশকের মধ্যভাগে স্পেনের বার্সিলোনা চিড়িয়াখানায় আনা হয় স্লোফ্লেক বা তুষারকনা নামের এই গরিলাকে। ইকুয়েটরিয়াল গিনিতে তার জন্ম। একজন কৃষক কালো গরিলাদের মাঝে সাদা স্নোফ্লেককে দেখে তাকে ধরার ফন্দি করেন। তিনি সবাইকে মেরে ফেলেন শুধু সাদা গরিলাটাকে ধরার জন্য। স্নোফ্লেককে পাওয়া গিয়েছিল তার মৃত মায়ের কোলের মধ্যে।

চিড়িয়াখানায় আনার পর সে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। মোট ২২টা সন্তান হয়েছিল, যাদের একটাও অ্যালবিনো ছিল না তার। ২০০৩ সালে ত্বকের ক্যান্সারে মারা যায় স্নোফ্লেক। ডাক্তাররা বলেন, অ্যালবিনিজমের কারণেই ত্বকে ক্যান্সার হয়েছিল।

মেঘলা : আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের বাসিন্দা ক্লাউডি। এখানেই কুমিরটির জন্ম। সারা দিন সে অ্যাকাডেমির জলাভূমিতে পড়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা তাকে নিয়ে গবেষণা করছেন। বনি নামে ক্লাউডির এক বন্ধু আছে। তবে সে অ্যালবিনো নয়। তারা দুজনে সায়েন্স সেন্টারের জলাভূমিতে ঘুরে বেড়ায়।

অন্য প্রাণীর সঙ্গে অ্যালবিনোর পার্থক্য

অন্য প্রাণীর সঙ্গে অ্যালবিনো প্রাণীর প্রধান পার্থক্য হচ্ছে তার শরীরের বর্ণে। অন্য প্রাণীরা যার যার নিজস্ব রং থাকলেও অ্যালবিনোরা হয় সাদা। তবে কিছু কিছু অ্যালবিনো পুরোপুরি না হয়ে আংশিক সাদা হতে পারে। এই রঙের কারণে অ্যালবিনোরা ক্যামোফ্ল্যাজ নিতে পারে না। অর্থাত্ শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে না। সহজেই তারা অন্যদের দৃষ্টিগোচর হয়। অ্যালবিনো সন্তানকে অনেক সময় তার মা মেনে নিতে পারে না। ফলে মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অ্যালবিনো শিশু ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সাদা ত্বকের কারণে সূর্যরশ্মি সৃষ্ট নানা রোগে অ্যালবিনো প্রাণীরা আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে ত্বকের নানা রোগ এদের মধ্যে দেখা দেয়। পার্থক্য আছে চোখেও। স্বাভাবিক প্রাণীর চোখের রং কালো হলেও অ্যালবিনো প্রাণীর চোখ হতে পারে ধূসব, নীল অথবা সবুজ।

অ্যালবিনিজম সতর্কতা দিবস

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত এক প্রস্তাবনা অনুসারে ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর ১৩ জুন আন্তর্জাতিক অ্যালবিনিজম সতর্কতা দিবস পালন করা হয়।

 

 গরিলা স্নোফ্লেক



মন্তব্য