kalerkantho


সাদা বকের তিনটি ছানা

ইমদাদুল হক মিলন

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



সাদা বকের তিনটি ছানা

হিজলগাছের মগডালে সাদা বকের বাসা। তিনটা ছানা ফুটেছে। মা-বাবা ছানা তা দেয়। বাবা যায় খাবার আনতে। বাবা ফিরে এলে মা যায়। খাবার এনে ছানাদের খাওয়ায়। এইভাবে পালা করে ছানাদের বড় করছে।

ছানারা বড় হচ্ছে। এখন আর তা দিতে হয় না। তার পরও বাবা খাবার আনতে গেলে মা বসে থাকে বাসার কাছে। মা খাবার আনতে গেলে বাবা বসে থাকে। ছানাদের পাহারা দেয়। কারণ শত্রু আছে। শত্রু হচ্ছে বড় বড় গোখরো সাপ। ঝোপজঙ্গল থেকে বেরিয়ে গাছ বেয়ে বেয়ে তারা বক পাখিদের বাসার কাছে আসে। ছানাদের গিলে খায়। মা-বাবা পাহারায় থাকলে বাসার কাছে আসতে পারে না। কাছাকাছি এলেই ধারালো ঠোঁট দিয়ে সাপকে এমন ঠোকর দেয় বক, আহত হয়ে সাপ ছিটকে পড়ে নিচে। ভয়ে আর সাদা বকের বাসার দিকে আসে না। তবে তক্কে তক্কে থাকে, কখন মা বক বাবা বক বাসার কাছে থাকে না। তখন গোখরো সাপ গাছ বেয়ে সাদা বকের বাসার দিকে এগোয়।

হিজলগাছগুলো বিলের ধারে। বিলে অনেক মাছ। মা বক বাবা বক বিলের পানিতে নেমে ছোট ছোট মাছ শিকার করে। নিজেরা খেয়ে পেট ভরিয়ে ছানাদের জন্য ঠোঁটে করে নিয়ে আসে। বাসায় বসে ছানাদের খাওয়ায়। খাওয়ার সময় ছানারা খুবই হুড়োহুড়ি করে। কে কার আগে মা বাবার ঠোঁট থেকে খাবার নেবে, ওই নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে।

বিলে সারা বছরই মাছ। তবে বর্ষাকালে বেশি। বর্ষা শেষ হয়ে আসছে। বিলের পানি কমছে। সঙ্গে মাছও কমছে। এ জন্য মা বক আর বাবা বককে বিলের অনেক দূর পর্যন্ত যেতে হয়। আগের মতো চট করে গিয়ে চট করেই মাছ ঠোঁটে ফিরে আসতে পারে না। আর ছানারা বড় হচ্ছে দেখে এখন সব সময় তাদের পাহারাও দিতে হয় না। তাদের শরীর সাদা পালকে ভরে উঠেছে। কয়েক দিন পরই তারা বড় বকদের মতো উড়াল দিতে পারবে। মাছ, ছোট ছোট ব্যাঙ আর কাঁকড়া শিকার করে খেতে পারবে।

একদিন মা বক বাবা বক গেছে শিকারে। বাসায় তিন ছানা চুপচাপ বসে আছে। এ সময় ছোট ছানা দেখতে পেল একটা সাত-আট ফুট লম্বা আর মোটা গোখরো হিজলগাছের ডাল বেয়ে ধীরে ধীরে তাদের বাসার দিকে এগোচ্ছে। ছোট ছানা সঙ্গে সঙ্গে তার দুই ভাইকে বলল, ওই দেখো, গোখরো আসছে।

বড় দুই ভাইও দেখল। দেখে ভয় পেয়ে গেল। সর্বনাশ! গোখরো তো তাদের বাসার দিকেই আসছে। এসেই প্রথমে একটা করে ছোবল দেবে আর একটা করে ছানাকে মারবে। তারপর সাদা বকের বাসায় বসেই একটা একটা

করে ছানা গিলে খাবে।

কী করা যায় এখন? মা-বাবা কখন ফিরবে ঠিক নেই। এই বিপদ থেকে তারা কী করে বাঁচবে?

ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল তিন ছানার। কিন্তু ভয় পেলে চলবে না। শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে হবে! বাঁচার পথ কী?

বড় ছানা বুদ্ধি বের করল। ছোট দুই ভাইকে সাহস দিয়ে বলল, ভয় পাবি না। যে ভয় পায় সে মরে। আমাদের বাঁচতে হবে।

মেজো ছানা শুকনো গলায় বলল, বাঁচার পথ কী?

ছোট ছানা দুই ভাইয়ের কাছে চেপে এসে বলল, আমার খুবই ভয় করছে। মনে হচ্ছে, সাপের হাতে মরার আগেই ভয়ে আমি মরে যাব।

বড় ছানা বলল, কিচ্ছু হবে না। বাঁচার পথ আমি বের করেছি। মা-বাবাকে দেখেছি, বাসার দিকে গোখরো এলেই ধারালো ঠোঁট দিয়ে ভীষণ জোরে ঠোকর দিতে। ঠোকর দিয়ে কাবু করে ফেলে সাপকে। আহত সাপ ছিটকে পড়ে নিচে। বাসার দিকে আসার আর সাহস পায় না। আমরা বড় হয়েছি। আমাদের ঠোঁটও শক্ত আর ধারালো। আমরা তিনজন একসঙ্গে আক্রমণ করব গোখরোকে। আমি আর মেজো ঠোকর দেব সাপের দুই চোখে। ঠোকর দিয়ে চোখ অন্ধ করে দেব। আর তুই যেখানে পারবি, সেখানে অবিরাম ঠোকর দিবি সাপের। ওর দফারফা করে ফেলবি। আমি যেভাবে বললাম সেভাবেই করবি। ভয় পাবি না।

গোখরো ততক্ষণে সাদা বকের বাসার একেবারে কাছে এসে পড়েছে। তার চোখ জোনাকপোকার মতো জ্বলছে। লকলকে জিব বারবার বেরোচ্ছে মুখ থেকে।

এ অবস্থায় পরিকল্পনামতো আক্রমণ করল তিন ছানা। সাপ তাদের গায়ে ছোবল দেওয়ার আগেই বড় ছানা আর মেজো ছানা সাপের দুই চোখে দিল ঠোকর। এমন ঠোকর, চোখ একেবারে গলে গেল। সাপ অন্ধ হয়ে গেল। অন্যদিকে ছোট ছানা তার ধারালো ঠোঁট দিয়ে ঠোকরের পর ঠোকর দিচ্ছে সাপের মাথায়, পিঠে, পেটে। সাপ এমন কাবু হলো, গাছের শুকনা ডালের মতো পড়ল হিজলতলায়। অন্ধ চোখে প্রচণ্ড ব্যথা। শরীরের যেখানে যেখানে ঠোকর দিয়েছে সাদা বকের তিন ছানা, সেই সব জায়গার চামড়া ফুটো হয়ে মাংস বেরিয়ে গেছে। সাপ আর নড়তেই পারে না। বোধ হয় মরেই যাবে।

বাসায় বসে বড় ছানা তার দুই ভাইকে তখন বলছে, পৃথিবীতে আমাদের শত্রু অনেক। বাঁচতে হবে বুদ্ধি আর সাহস দিয়ে।

 



মন্তব্য