kalerkantho

গাধার বোঝা

চন্দন চৌধুরী

১০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



গাধার বোঝা

অঙ্কন : মাসুম

সে অনেক আগের কথা। তখন শখে ছবি আঁকত গরু। একদিন গরুর আঁকাআঁকি দেখে গাধা তার ছবি এঁকে দিতে বলল। গরু বলল, ‘এত করে যখন বলছ, কী আর করা! দাঁড়াও দিচ্ছি একখান এঁকে।’

নিজেকে বাঁকিয়ে অনেক রকম পোচ দিল গাধা। মওকা পেয়ে গরুও আঁকল মনের মতো ছবি। এত দিন সে এমন ছবি আঁকার তো জো-ই পায়নি। গাধার ছবি এঁকে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল গরু। মনে মনে বলল, ‘একটা দারুণ ছবি এঁকে ফেলেছি। এবার বাড়ি ফিরি। গিন্নি আবার খাবার নিয়ে বসে আছে। না গেলে তো মুখেই তুলবে না।’ চলে গেল গরু।

এদিকে ছবি দেখে তো ভাবনায় পড়ে গেল গাধাটা। ছবিতে যে তার ঘাড়টা বাঁকানো। তার বাড়ির পাশেই থাকতে এক বানর। বানরটাকে সে বলল, ‘দেখলে তো, গরু আমার ছবিটা কেমন বাঁকা করে আঁকল!’

ছবি দেখে বানর বলল, ‘তাই তো, একটা সমস্যাই হয়ে গেল। গরু যে তোমার ছবিটা চমত্কার এঁকেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর সে কারণে এখন থেকে তোমাকে এই ছবির মতো ভঙ্গি করেই থাকতে হবে। নইলে ছবির সম্মানটা আর থাকল কই!’

বানরের কথাটা গাধার বেশ মনে ধরল। ফলে তাই করল গাধা। ঘাড় বাঁকিয়ে বসে থাকল সারা রাত। বাঁকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড় ব্যথা হয়ে গেল। তবু সোজা করল না। এতে যদি ছবির অপমান হয়! এ অবস্থায়ই সকালে ঘোড়ার সঙ্গে দেখা। ঘোড়া বলল, ‘ঘাড় বাঁকিয়ে আছ কেন বন্ধু?’

গাধা বলল, ‘সে কথা বলো না ভাই। কাল কী যে হয়েছিল আমার। কেন যে গরুকে বলেছিলাম আমার ছবি এঁকে দিতে! ছবি আঁকবি তো আঁক, তাই বলে আমার ঘাড় বাঁকা করে আঁকতে হবে! তো সেই ছবির জন্যই তো এ অবস্থা।’

এ কথা শুনে তো ঘোড়া অবাক! বাপের জনমে শুনেনি এমন কথা। তারপর বিষয়টা বোঝার জন্য ছবির দিকে উঁকি দিল ঘোড়া। তারপর মিটিমিটি হাসল। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করল সে। যাক, তার ছবি আঁকেনি! গরু যদি তার ছবি আঁকত, তাহলে গাধার মতো অবস্থা হতো তারও। মনে মনে বলল, ‘বাঁচা গেল, সব তাহলে গাধার ওপর দিয়েই গেছে।’ তারপর ছুট দিল সে।

এদিকে গাধা ঘাড়ের ব্যথায় মরে। এমন সময় সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক শিয়াল। গাধা ডাকল শিয়ালটাকে, ‘শিয়াল ভাই, সবাই তো তোমাকে পণ্ডিত বলে। অনেক জ্ঞান রাখো তুমি। এবার আমার মুক্তির পথ বাতলে দাও।’

শিয়াল নাকের ওপর চশমাটা উঁচিয়ে বলল, ‘আমাকে গাধা মনে করো না। ভেবো না জ্ঞানী পণ্ডিত এসব বললেই তোমার কথায় গলে যাব। আসল কথা বলো, মতলবখানা কী?’

তখন গরুর ছবি আঁকার ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল গাধা। সব শুনে শিয়াল বলল, ‘এখনো তুমি গাধাই রয়ে গেলে। আসলেই তুমি আস্ত একটা গাধা।’ এই বলে নিজের পথে হাঁটা ধরল। গাধা জোরে বলল, ‘একটা বুদ্ধি দিয়ে যাও। এখন আমি কী করব?’

যেতে যেতে শিয়াল মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল, ‘কী আর করবে, গরুর বাড়ি যাও। গরুকে বলো তোমার একটা সোজা ছবি এঁকে দিতে!’

শিয়ালের এই টিটকারিটা বুঝল না গাধা। মনে মনে বলল, ‘বাহ্, দারুণ বুদ্ধি দিয়েছে তো শিয়াল। এই না হলে পণ্ডিত!’

তখনই সে রওনা দিল গরুর বাড়ি। তবে ঘাড়টা বাঁকিয়েই রাখল। পথে অনেকের সঙ্গে দেখা। ছাগল, ভেড়া, হাতি সবাইকে সে গরুর ছবি আঁকার বিষয়টি বুঝিয়ে বলল। এত সবের পরও ঘাড় বাঁকিয়েই রাখল। আর যা-ই হোক, ছবির সম্মান নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। এভাবে সবার কথার জবাব দিতে দিতে গরুর বাড়ি পৌঁছল গাধা। গাধার এমন অবস্থা দেখে ভীষণ ভাবনায় পড়ল গরু, ‘আরে, কী হলো তোমার, কে করল এটা?’

গাধা রেগে বলল, ‘তুমিই তো করেছ, আবার বলছ কে!’

গাধার কথা শুনে গরু তো রীতিমতো অবাক! এরপর সামান্য রেগেই গেল সে। বলল, ‘দেখো গাধা, কাল তোমার একটা চমত্কার ছবিও এঁকে দিলাম। কোথায় তুমি তার জন্য ধন্যবাদ দেবে, তা না এর বদলে আমার ওপর মিছেমিছি দোষ চাপাচ্ছ।’

তখন গাধা বলল, ‘এই ছবিটাই তো আমার কাল হয়েছে।’

এমন কথা শুনে অবাকই হলো গরু! বলল, ‘কী বলছ তুমি! কিছুই তো বুঝতে পারছি না। ছবি আবার তোমার সমস্যা করল কিভাবে?’

গাধা বলল, ‘তুমি বাঁকা করে ছবি এঁকেছ। ছবির মতো থাকতে থাকতে আমি বাঁকাই হয়ে গেছি। এখন আরেকটা ছবি আঁকো। সেখানে অবশ্যই আমাকে সোজা করে আঁকবে। তারপর যদি আমি রক্ষা পাই।’

আর কোনো কথা না বলে তুলি নিয়ে আবার গাধার ছবি আঁকতে লেগে গেল গরু। ছবিতে সোজা করে আঁকল গাধাকে। ছবি দেখে গাধা সোজা হলো। বলল, ‘খুবই হালকা লাগছে।’

এমন কথায় আবারও ভাবনায় পড়ল গরু। বুদ্ধি করে গাধার পিঠে এঁকে দিল একটা বোঝার ছবি। তারপর গরু জানতে চাইল গাধার সব ঠিক আছে কি না।

তখন গাধা বলল, ‘এবার মনে হয় ঠিক আছে।’

সেই থেকেই গাধার বোঝা টানা শুরু। আর আজও গাধা বোঝা টেনেই যাচ্ছে, টেনেই যাচ্ছে।



মন্তব্য