kalerkantho


ভূতের গল্প লেখা সহজ নয়

প্রিন্স আশরাফ

২০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ভূতের গল্প লেখা সহজ নয়

অঙ্কন : মানব

স্কুলের ভালো ছাত্র এবং ক্লাস ক্যাপ্টেন হয়েই হয়েছে ঝামেলা! স্কুল ম্যাগাজিন কমিটির সভাপতি, বাংলার হরিপদ স্যার আদেশ জারি করেছেন, প্রতি ক্লাসের ফার্স্ট, সেকেন্ড ও থার্ডকে স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য বাধ্যতামূলক লেখা দিতে হবে। আর ক্লাস ক্যাপ্টেন হলে তো কথাই নেই। বাকিরা দিলেও দিতে পারে, না দিলেও কোনো অসুবিধা নেই।

মফস্বলের আফতাব উদ্দিন বিদ্যালয়ে এই প্রথমবারের মতো স্কুল ম্যাগাজিন বের হচ্ছে। অনেক ভেবেচিন্তে ম্যাগাজিনের নাম রাখা হয়েছে ‘প্রতিভা’, তাতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রতিভার স্ফুরণ ঘটবে। কিন্তু তার যে কোনো প্রতিভাই নেই তা অন্তু হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে সে হাজার ভেবেও সাদা কাগজের ওপর কালো কালির আঁচড় এঁকে তার প্রতিভার কোনো স্বাক্ষর রাখতে পারেনি।

ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়ার কারণে ক্লাসের অন্যদের লেখা তাকেই জমা নিতে হচ্ছে। আর তার বাবদেই বুঝতে পেরেছে এই স্কুলে সবারই লেখালেখির প্রতিভা আছে, শুধু তার নেই। জমা পড়া অন্যদের লেখা দেখে দীর্ঘশ্বাস আরো ভারী হয়েছে অন্তুর। সেই ভারী দীর্ঘশ্বাসে সাদা কাগজে হাওয়া লাগলেও কলমের আঁচড় পড়েনি।

অন্যদের লেখা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কোনো লেখা বের হয়ে আসে কি না সেই ভাবনাতেই অন্তু জমা পড়া লেখাগুলো বের করে দেখতে লাগল। স্বাধীনতার লেখা, একুশের ছড়া, কবিতা, শরতের ছড়া, বর্ষার গান, এমনকি বেশ কয়েকটি ভূতবিষয়ক লেখাও আছে। সব রকম বিষয় নিয়েই লেখা হয়ে গেছে দেখে অন্তু বেশ হতাশ হলো। তাহলে কী নিয়ে লিখবে সে?

শুধু আজ রাতটাই বাকি। কালকেই স্কুলে গিয়ে হরিপদ স্যারের কাছে স্কুল ম্যাগাজিনের সব লেখা জমা দিতে হবে। স্যার তারটাই আগে দেখতে চাইবেন।

ভূত নিয়ে গল্পটল্প কিছু একটা লেখার চেষ্টা করা যাক! অন্য কিছু নিয়ে লেখার চেয়ে ভূত নিয়ে লেখাই হয়তো কিছুটা সহজ, ভাবল অন্তু।

ভূতের কথা চিন্তা করতেই কেমন ভয় ভয় করতে থাকে অন্তুর। মা-বাবা খেয়েদেয়ে পাশের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছেন। দেয়াল ঘড়িতে বারোটা বাজে। সে শুনেছে, মধ্যরাতে নাকি ভূতেরা হানা দেয়। হঠাৎ ঝপ করে পুকুরের পানিতে কিছু একটা লাফিয়ে পড়ার শব্দ হলো। অন্তু ভালো করেই জানে, ইঁদুর নারকেলগাছের কচি ডাবের গোড়া কেটে দিয়েছে, সেটাই পুকুরের পানিতে পড়ে অমন শব্দ করছে। কিন্তু আজ ভূতের গল্পের চিন্তা মাথায় আছে বলেই কিনা শব্দটা বেশ ভৌতিক লাগল। পেয়ারাগাছে পাকা পেয়ারা খেতে আসা উড়ন্ত বাদুড়ের ঝটপটানিও যেন ভূতের শব্দ বলে মনে হচ্ছে। বহু দূরে মা-আ-আ-আ-ফফ শব্দ করা বনবিড়ালের ডাক তার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিল।

লেখার টেবিল থেকে উঠে খোলা জানালার কাছে গিয়ে ওটা বন্ধ করবে এই সাহসটুকুই অন্তু সঞ্চয় করতে পারছে না। কিন্তু জানালা গলে বাইরের বাগানের গাঢ় অন্ধকারের দিকে চোখ চলে গেলেই পরানে পানি থাকে না। অথচ ক্লাস সিক্সে ওঠার পর থেকেই সে এই ঘরে একা একা থেকে অভ্যস্ত।

অন্তু বড় কাঠের স্কেলটা দিয়ে জানালার পাল্লা দুটি খুব সাবধানে ভেজিয়ে দিল। আর ঠিক তখনই দপদপ করে হারিকেনের পলতে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠে নিভে গেল। অন্তু হারিকেনটা হাতে নিয়ে ঝাঁকিয়ে দেখল, কেরোসিন তেল শেষ হয়ে গেছে। মা আগেই বিছানা করে দিয়ে গেছে। কিন্তু টেবিল থেকে মশারি পর্যন্তই যেন সে যেতে পারছে না। অন্তুর মনে হতে থাকে খাটের নিচে বিকট দর্শন কোনো ভূত ঘাপটি মেরে আছে। সে টেবিল থেকে নেমে খাটে উঠতে গেলেই পা আঁকড়ে ধরবে।

তখনই অন্তুর মনে হলো, কেউ একজন বাইরের দিক থেকে জানালার কাঠের পাল্লাটা ঠেলে খোলার চেষ্টা করছে। ভূত ভেবে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে, তখনই বুঝতে পারল ওটা ভূতের ধাক্কা নয়। বাইরের বাতাসেই পলকা জানালার কাঠের পাল্লা খুলে গেছে।

অন্তু হাতড়ে হাতড়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে তার ছোট্ট পেনসিল টর্চটা বের করল। সুইচ অন করতেই বেশ জোরালো আলো বের হলো। পেনসিল টর্চের আলো জানালার দিকে ফেলল। বাতাসে জানালার একটা পাল্লা খুলে হাট হয়ে গেছে। বাইরে জোরালো বাতাস বইছে। এক্ষুনি জানালাটা ভালোভাবে বন্ধ না করলে বাইরের ধুলা-ময়লা, গাছের পাতা সব ঘরে ঢুকে যাবে।

অন্তু সাহস সঞ্চয় করে জানালার পাল্লা বন্ধ করতে যাবে, তখনই মনে হলো বাইরে থেকে লতাপাতার মতো কিছু একটা বাতাসের ঝাপটায় তার মুখে এসে পড়ল। হাত দিয়ে জিনিসটা ধরে ফেলল। একটা কাগজ। কোনো খাতার পাতা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া। এক হাতে কাগজটা ধরে রেখে আরেক হাত দিয়ে জানালার খিল তুলে বন্ধ করে দিল।

কাগজটা ফেলেই দিচ্ছিল, কিন্তু টর্চের আলোয় কাগজে কিছু লেখা আছে দেখে সে কৌতূহলী হলো। ‘একটি ভূতের গল্প’ শিরোনামে কিছু লেখা। অন্তু টর্চের আলো ফেলেই দ্রুত লেখাটা পড়ে ফেলল। ভূতের গল্প। একজন মানুষ রাতে পথে যেতে যেতে আরেকজনকে সঙ্গী হিসেবে পায়। দুজন একসঙ্গে পথ চলতে থাকে। ঝড়জলের রাতে সঙ্গী মানুষটা লক্ষ্য করল বিদ্যুৎ চমকালে পাশের মানুষটাকে ওই আলোয় দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু অন্ধকার হয়ে গেলেই মানুষটা কিভাবে যেন আবার পাশে চলে আসছে। চমত্কার গল্প।

গল্পটা শেষ করে সে লেখকের নাম খুঁজল। কিন্তু কাগজটা আতিপাতি খুঁজেও লেখকের নাম বা স্বাক্ষর নজরে পড়ল না। তখনই একটা দুর্বুদ্ধি মাথায় এলো, এই গল্পটা যদি সে নিজের নামে চালিয়ে দেয়! শুধু এই কাগজ থেকে ফ্রেশ কাগজে কপি করে নিলেই হলো!

গল্প লেখার ভারটা কমতেই মন থেকে পাষাণ ভার নেমে গেল। ভূতের ভয়ও উবে গেল অন্তুর। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগেই বেনামি লেখাটা কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দিলেই হলো!

বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠল। কিন্তু তন্ন তন্ন করে কাগজটা খুঁজেও কোথাও পেল না অন্তু। ওর স্পষ্ট মনে আছে টেবিলের ওপর স্কেল চাপা দিয়ে রেখেছিল। রাতে যেমন ভোজবাজির মতো এসেছিল, তেমনই উবে গেছে।

অবশ্য গল্পটা তার মাথায় আছে। স্মৃতিশক্তি খুব ধারালো অন্তুর। এখন মাথার ভেতর থেকেই টেনে এনে কপি করতে পারবে।

কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেল অন্তু। রাতের গল্পটা লিখতে গিয়েই মনে হলো কী দরকার অন্যের লেখা নকল করে! কাগজের গল্প লেখকের নাম হয়তো নেই, কিন্তু কোথাও না কোথাও এর লেখক তো আছে! তার চেয়ে গত রাতের অভিজ্ঞতাই লিখে দিই না কেন! নিজের মতো করে!

প্রতিভা স্কুল ম্যাগাজিন প্রকাশের পর অন্তু দেখতে পেল তার গল্পটাই স্কুল ম্যাগাজিনের সেরা গল্প নির্বাচিত হয়েছে!



মন্তব্য