kalerkantho

ঘড়ির বিচিত্র জগৎ

ঘড়ি ছাড়া কী এখন এক মুহূর্তও চলে! এই লেখাটা পড়তে কত সময় লাগে, সেটা জানতেও তো ঘড়ির হিসাব-নিকাশ প্রয়োজন হবে। শুধু কী তাই, ঘড়ির প্রয়োজন সারা দিনের সব কাজেই—বন্ধুকে খেলতে ডাকতে গেলে বলতে হবে কয়টায় আসতে হবে। স্কুলে যেতে হবে, তাও ঘড়ি দেখে সময় মেপে। ঘুম থেকে উঠতে হবে ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে। আর ঘড়ি নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন নাবীল অনুসূর্য

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ঘড়ির বিচিত্র জগৎ

৬০ময় ঘড়ির রাজ্য

ঘড়িতে এই যে সেকেন্ড, মিনিটের হিসাব করা হয়, এই পদ্ধতিটাকে বলা হয় সেক্সাজেসিমেল সিস্টেম। বাংলায় বলা যেতে পারে ৬০-ভিত্তিক গণনা পদ্ধতি। সময়ের সবচেয়ে ছোট একক সেকেন্ড। ৬০ সেকেন্ডে ১ মিনিট। আবার ৬০ মিনিটে ১ ঘণ্টা। এখন প্রশ্ন হলো, হিসাবের ভিত্তি হিসেবে ৬০ কেন বেছে নেওয়া হলো? এর কারণ নাকি মানুষের হাতের গড়ন! হাতের প্রতিটি আঙুলের তিনটি করে অংশ। বুড়ো আঙুল বাদ দিলে চার আঙুলে তিন চারে ১২টি অংশ। বুড়ো আঙুল বাদ। কারণ সময় হিসাব করার সময় বুড়ো আঙুল দিয়েই অন্য আঙুলের অংশগুলো গুনতে হবে। এক হাত দিয়ে এই ১২ পর্যন্ত গোনার কাজ করা হবে, আরেক হাতের আঙুলে হিসাব রাখতে হবে কয়বার ১২ পর্যন্ত গোনা হলো। অন্য হাতের পাঁচ আঙুল হিসাবে নিলে, মানে পাঁচবার ১২ পর্যন্ত গুনলে ৬০ হয়। সে জন্যই নাকি সময়ের এই ৬০-ভিত্তিক গণনা ব্যবস্থা।

 

আকাশছোঁয়া ঘড়ি

টাওয়ার ঘড়ি তো পৃথিবীজুড়েই ভীষণ জনপ্রিয়। পৃথিবীজুড়ে প্রায় সব বড় শহরেই আছে বিখ্যাত সব টাওয়ার ঘড়ি। তবে কিছু কিছু টাওয়ার ঘড়ি আবার ভীষণ বিখ্যাত। এগুলোর মধ্যে আছে ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের এলিজাবেথ টাওয়ারের ঘড়ি (বিগ বেন নামে পরিচিত), যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়ার সিটি হলের ঘড়ি, ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান ফ্রান্সিসকোর ফেরি বিল্ডিংয়ের ঘড়ি ও ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগোর রিগলি বিল্ডিংয়ের ঘড়ি, সৌদি আরবে অবস্থিত পবিত্র নগরী মক্কার রয়েল ক্লক টাওয়ারের ঘড়ি, রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর বিখ্যাত রেডস্কয়ারের স্যাভিয়র টাওয়ারের ঘড়ি, ভারতের মুম্বাইয়ের রাজাবাই ক্লক টাওয়ারের ঘড়ি, মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের সুলতান আবদুল সামাদ বিল্ডিংয়ের ঘড়ি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী দুবাইয়ের দেইরা ক্লকটাওয়ারের ঘড়ি ইত্যাদি।

 

ঘড়ির খ্যাতি ভুবনজোড়া

পৃথিবীতে এমন অনেক ঘড়িও আছে, যে ঘড়িগুলো নিজেরাই মহাতারকা। তাদের দেখতেই প্রতিদিন শয়ে শয়ে মানুষ হাজির হয়। এর মধ্যে কয়েকটি ঘড়িতে তো আবার রীতিমতো কতগুলো ভাস্কর্যও বসানো আছে, যেগুলো দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে নাটকের মতো প্রদর্শনীরও ব্যবস্থা আছে। এই যেমন জার্মানির অন্যতম শিল্পনগরী মিউনিখের গ্লকেনস্পিল ঘড়ি। এমনি প্রদর্শনী হয় ইতালির সিসিলি অঞ্চলের অন্যতম শহর মেসিনার ঘড়ি এবং চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগের ঘড়িটাতেও। জাপানের ইয়োকোহামা শহরের অদ্ভুত একটা ঘড়ি আছে। ওটার নাম কসমো ক্লক ২১। বিশাল এই ঘড়িটিতে ডিজিটাল ডিসপ্লেতে সময় দেখানো হয়। আর সেই ডিসপ্লেকে কেন্দ  করে আছে একটি ফেরিস হুইল বা নাগরদোলা। রাতের বেলা বর্ণিল আলোকচ্ছটায় পুরো কাঠামোটা অদ্ভুত সুন্দর সাজে সেজে ওঠে।

 

বাংলাদেশের বিশাল সব ঘড়ি

বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো টাওয়ার ঘড়িটা সিলেটের সুরমা নদীর তীরে কিন ব্রিজের কাছেই অবস্থিত। নির্মিত হয় ১৮৭২-৭৪ সালের দিকে। নাম আলী আমজাদের ঘড়ি। এই আলী আমজাদ ছিলেন সিলেটের কুলাউড়ার পৃথ্বিমপাশার জমিদার। আলী আমজাদের জন্ম উপলক্ষে তাঁর বাবা এই ঘড়ি ঘরটা বানিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় এই ঘড়িটি বেশ ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছিল।

তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘড়ি নগর ভবনেরটি। ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুটি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করার পর এখন ভবনটা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অফিস। আরেকটি বিখ্যাত ঘড়ি আছে রাজশাহীর কাপাশিয়ায়। ওখানে স্থানীয় কয়েকজন মিলে বানিয়েছেন ৭৮৫ বর্গফুটের এক বিশাল ডিজিটাল ঘড়ি। ১৭.৫ ফুট উঁচু, ৩৪.৯ ফুট চওড়া। তাদের দাবি, এটাই পৃথিবীর বৃহত্তম ডিজিটাল ঘড়ি।

 

ডিজিটাল ঘড়ি

ডিজিটাল ঘড়ি মানে যে ঘড়িতে সময় দেখার জন্য ঘণ্টা-মিনিটের কাঁটা গুনতে হয় না। ডায়ালের মধ্যে সরাসরি সংখ্যায় ভেসে ওঠে কয়টা বাজে। প্রথম ডিজিটাল ইলেক্ট্রনিক ঘড়ি বানানো হয় গত শতকের সত্তরের দশকে। স্ট্যানলি কুব্রিকের ক্ল্যাসিক সাই-ফাই ‘২০০১: এ স্পেস ওডিসি’ থেকে আইডিয়া নিয়ে প্রথম ডিজিটাল ঘড়ি বানানো হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে ডিজিটাল ঘড়ি বানানো শুরু হলে, ঘড়িগুলোর দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আসে।

 

অদ্ভুত সব ঘড়ি

এমনি একটি ঘড়ির নাম দেওয়া হয়েছে ‘দালি ঘড়ি’। হ্যাঁ, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদর দালির নামে নাম। এই ঘড়িটিও যেন অদ্ভুত একটি চিত্রকর্ম। পুরো ঘড়িটিই যেন চোখের সামনে কেমন একটা বিভ্রম তৈরি করে। অদ্ভুত ধরনের দেয়াল ঘড়ি আছে সবচেয়ে বেশি। এই যেমন ‘গণিত ঘড়ি’তে সময় দেখতে হলে অঙ্কে ভীষণ পাকা হওয়া চাই। কারণ সময়ের প্রতিটি এককের ঘরে একটি করে গাণিতিক ধাঁধা দেওয়া আছে। সেই ধাঁধা মেলালেই বোঝা যাবে, এখন কয়টা বাজে। তাই অঙ্কে দুর্বল হলে, কয়টা বাজে বের করতে করতে দেখা যাবে কাঁটা চলে গেছে আরেক ঘরে। ‘ওয়ান আওয়ার সার্কেল’ নামের দেয়াল ঘড়ি আবার দেয়ালে না লাগানোই ভালো। কারণ ওটা দেয়ালে প্রতি ঘণ্টায় একটা করে বৃত্ত আঁকে।

 

রেকর্ড বুকে ঘড়ি

এখনো চালু থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ঘড়িটি আছে যুক্তরাজ্যের উইল্টশায়ারের স্যালিসবুরি ক্যাথেড্রালে। ডায়ালবিহীন এই ঘড়িটি ১৩৮৬ সাল থেকে অবিরত চলছে। মাঝে ১৯৫৬ সালে অবশ্য একবার ঘড়িটির সংস্কার করা হয়। সবচেয়ে উঁচু ঘড়িটি আছে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে, ফেডারেশন টাওয়ারের পশ্চিমে। ঘড়িটি মাটি থেকে ২২৯ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। চালু হয়েছে ২০০৮ সালের এপ্রিলে। সবচেয়ে বড় পেন্ডুলাম ঘড়ি বসানো হয়েছে চীনের জিয়াংজি প্রদেশের গাংঝু শহরের হারমনি টাওয়ারে। ১২.৮ মিটার ব্যাসের এই ঘড়িটি পরিচিত ‘হারমনি ক্লক’ নামে। আর সবচেয়ে সমৃদ্ধ ঘড়ির সংগ্রহ আমেরিকার জ্যাক স্কফের। ২০১০-এর ফেব্রুয়ারিতে যখন গিনেস বুকে নাম তোলেন, তখন তার সংগ্রহে দাঁড়ায় দেড় হাজারেরও বেশি ঘড়ি।

 

মাথা ঘোরানো ঘড়ির দাম!

এই তালিকার শীর্ষ দুটি ঘড়িই ‘গ্রাফ ডায়মন্ডস’ সিরিজের ঘড়ি। শীর্ষস্থান দখলে রাখা ঘড়িটির নাম ‘গ্রাফ ডায়মন্ডস হ্যালুসিনেশন’। প্লাটিনামের ব্রেসলেটের ওপর ১১০ ক্যারট রংবেরঙের হীরে বসানো এই ঘড়িটির দাম সাড়ে পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার বা ৪১০ কোটি টাকার বেশি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ‘গ্রাফ ডায়মন্ডস দ্য ফ্যাসিনেশন’-এর দাম ৪ কোটি মার্কিন ডলার। এটিতে ব্যবহার করা হয়েছে ১৫২.৯৬ ক্যারট সাদা হীরা। মাঝে ৩৮.১৩ ক্যারটের একটা বড়সড় হীরা বসানো আছে। সেই হীরার ওপরেই ঘড়ির ডায়ালটা বসানো।



মন্তব্য