kalerkantho

ওরা বনে বাস করে

২ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ওরা বনে বাস করে

বনে বাস করা বিড়াল গোত্রের প্রাণীদের মধ্যে বাঘ আর চিতাবাঘের সঙ্গে পরিচয় আছে অনেকেরই। তবে এরা ছাড়াও বাংলাদেশের বনে খুব সুন্দর আর রাজকীয় কয়েক ধরনের বিড়াল আছে। বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবসকে (৩ মার্চ) সামনে রেখে এদের সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ইশতিয়াক হাসান

চিতাবিড়াল

কাপ্তাই সংরক্ষিত বন কেটে চলে গেছে চন্দ্রঘোনা-কাপ্তাই পাকা সড়ক। কয়েক বছর আগের ঘটনা। এই পথ ধরে হাঁটার সময় হঠাৎ এক জায়গায় সড়কের মাঝখানে কী একটা পড়ে থাকতে দেখলাম। পরিষ্কারভাবে দেখতে কাছে যেতে মনটাই গেল খারাপ হয়ে। একটা চিতাবিড়াল মরে পড়ে আছে। কয়েক দিন আগেই রাস্তা পেরোনোর সময় একটা গাড়ি একে চাপা দিয়েছে। চামড়াটা এরই মধ্যে শুকিয়ে গেছে। বনের ভেতরে দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা পেরোনোর সময় এভাবে মারা পড়ে শুধু চিতাবিড়াল নয়, মেছোবাঘ, খাটাশসহ আরো অনেক প্রাণী।

দেখতে চিতাবাঘের সঙ্গে অনেকটাই মিল। তাই পেয়েছে চিতাবিড়াল নাম। আকারে পোষা বিড়ালের চেয়ে একটু বড়। চিতাবাঘের মতোই হলদে-বাদামি শরীরে কালো ফোঁটাগুলো চমৎকার ফুটে ওঠে।

প্রায় সব জায়গায়ই শিকারে অভ্যস্ত। ভালো সাঁতারু। মাছ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজ খুদে প্রাণী ধরতে পারে তাই। গাছের ডালে ডালে দ্রুত গতিতে লুকিয়ে চলাফেরা করে বানরের বাচ্চা, কাঠবিড়ালি, পাখি এবং বিভিন্ন সরীসৃপ শিকারে মহা ওস্তাদ। মাটিতে শিকার করে খরগোশ, ইঁদুর ইত্যাদি। দিনে সাধারণত গাছের খোঁড়ল বা গর্তে ঘুমিয়ে কাটায়। শিকারে বের হয় রাতে। চিতাবিড়ালের একটা প্রিয় কৌশল গাছের নিচু ডালে ঘাপটি মেরে থাকা। নিচে দিয়ে কোনো খুদে প্রাণী গেলে সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুন্দরবন, সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের আরো কিছু এলাকার বনে আছে। তবে রাতে চলাফেরা করায় এবং আকারে ছোট হওয়ায় দেখা মেলা ভার।

কোথায় গেলে পাবে

এই প্রাণীদের বেশির ভাগেরই দেখা মেলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, নেপাল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার আরো কিছু দেশের বনে। এদিকে এদের দেখতে বাংলাদেশের সব বনে তোমাদের জন্য যাওয়া মুশকিল। তবে শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া কিংবা রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে এই প্রাণীগুলোর কারো কারো সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। সিলেট শহরের কাছে খাদিমনগরেও পাবে কাউকে কাউকে। গেলেই যে দেখা দেবে তারও গ্যারান্টি নেই। তবে ঢাকা আর চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এবং গাজীপুরের বাঘের বাজারের কাছে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কেও এদের কোনো কোনোটাকে খুঁজে পাবে। শ্রীমঙ্গলে সীতেশ দেবের চিড়িয়াখানায় মেছোবাঘ, চিতাবিড়াল পাবে। বনবিড়ালদের অবশ্য অনেকের গ্রামের বাড়ির আশপাশেও পেয়ে যেতে পারো। 

সোনালি বিড়াল

এমন অদ্ভুত সুন্দর প্রাণী পাবে কমই। গায়ের রং সোনালি-বাদামি থেকে গাঢ় বাদামি। চোখের নিচ থেকে কানের নিচ পর্যন্ত কালো সীমানা দেওয়া একটা সাদা দাগ আছে। চোখের ভেতরও একটা সাদা দাগ আছে। চোখ থেকে ধূসর একটা দাগ আবার মাথার চূড়া পর্যন্ত পৌঁছেছে। সুন্দর গায়ের রং আর তাগড়া শরীরের কারণে যখন হেঁটে যায়, এদের থেকে চোখ ফেরানো যায় না। দৈর্ঘ্য তিন ফুটের মতো। বাহারি লেজটা দুই ফুট। লাজুক স্বভাবের কারণে এদের দেখা পাওয়া খুব কঠিন। শিকার আর বন ধ্বংসের কারণে বেচারারা সংখ্যায়ও কমছে দিনকে দিন। মাঝেমধ্যেই আদিবাসীদের কাছে শিকার করা সোনালি বিড়ালের চামড়া পাওয়া যায়। এটা দেখেই ধারণা করা হয় বাংলাদেশে এরা এখনো আছে। তবে ইদানীং সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম—দুই জায়গায়ই ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে সোনালি বিড়াল বা গোল্ডেন ক্যাট। এদের খাবার ম্যানুতে আছে পাখি, ছোট হরিণ, বন ছাগল, কাঠবিড়ালি, বেজি।

মেঘলা চিতা

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে আছে বেশ বড় এক জঙ্গল। জঙ্গলের ধারে অনেক আদিবাসীই ঘর বানিয়ে থাকে। লাকড়ি কুড়ানোসহ নানা কাজে বনে ঢুকে মানুষ। তারা বিড়াল গোত্রের একটি প্রাণীর কথা বলে, যেটা গাছ বাইতে ভারি ওস্তাদ। তাই তারা একে ডাকে লতাবাঘ নামে। এই লতাবাঘ আসলে মেঘলা চিতা বা লাম চিতা।

বিড়াল গোত্রের অদ্ভুত সুন্দর এই প্রাণীর ইয়েরজি নাম ক্লাউডেড ল্যাপার্ড। গায়ের রং ধূসর থেকে মেটে বাদামি। শরীরের দুই পাশের কালো ছোপগুলো দেখতে লাগে খণ্ড খণ্ড মেঘের মতো। গেছো বাঘ নামেও পরিচিত। লেজসহ দৈর্ঘ্য সাড়ে ছয় ফুটের মতো। ওজন ১৮ থেকে ২০ কেজি।

একসময় বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে ছোট ছোট বন ছিল অনেক। ওই সব গ্রামীণ বনেও দেখা মিলত এদের। এখন কেবল গভীর বনেই থাকে। তাই দেখা পাওয়া ভার। কখনো খাবারের খোঁজে জঙ্গল থেকে বের হয়ে এলে তবেই দেখা যায়। যেমন—রাঙামাটিতে ২০০৯ সালে আদিবাসীদের হাতে মেঘলা চিতার বাচ্চা ধরা পড়ার ঘটনা ঘটে। কিছুদিন আগে কাপ্তাইয়ে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে গেছোবাঘের ছবি। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু বনে এখনো টিকে আছে।

গাছ বাইতে মহা ওস্তাদ। গাছ থেকে নামার সময় মাথা থাকে নিচের দিকে। ১২-১৪ ফুট ওপর থেকেও ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে শিকারের ওপর। বেশির ভাগ সময় গাছেই থাকে বলে কখনো এরা চোরা শিকারিদেরও ফাঁকি দিয়ে ফেলে। গাছে বানর, কাঠবিড়ালি আর পাখির মতো প্রাণীগুলো শিকার করে। তবে মাটিতে নেমেও হরিণ, শুয়োর আর সজারু মারে।

মেঘলা চিতার লম্বা, মোহনীয় লেজটায় কালো কালো বৃত্তের মতো থাকে। গাছে চড়ার সময় ভারসাম্য রাখতে লেজটা ভারি কাজে দেয়।

বনবিড়াল

আমার নানাবাড়ি হবিগঞ্জের দেবনগরে। আর ওখানে গেলেই পাই বনবিড়ালের খবর। ওখানকার ভাষায় বনবিড়ালকে বলে টলা। হয়তো সিরাজুল ভাই এসে বলল, ‘তুষার ওই দিন আমাদের পুকুরের ধারে একটা টলারে পিটায়ে মাইরা ফেলছি সবাই মিলা। হাঁস-মুরগি খেয়ে বহুত জ্বালাতন করছিল।’ কিংবা পাশের বাড়ির মামি বললেন, ‘দেখছ তুমি টলা টলা করো আর আমার সাধের চারটা হাঁসরে মাইরা রাইখা গেছে শয়তানটা।’ গ্রামীণ বন এখন নেই বললেই চলে। ছোটখাটো যা আছে তাতেও খাবারের অভাব। তাই বনবিড়ালদের বাধ্য হয়েই গৃহপালিত মোরগ-হাঁসের দিকে ঝুঁকতে হয়। গ্রামবাসীরাও সুযোগ পেলে তাদের এই শত্রুকে পিটিয়ে মারে। নরসিংদীর চরসুন্দরে সরওয়ার ভাইদের এলাকায় গেলেও বনবিড়ালদের দেখা মেলে সহজে। এইতো মাঝখানে একবার সরওয়ার ভাইয়ের পুকুর দেখতে গিয়ে দেখি বিশাল একটা বনবিড়াল ঝোপ থেকে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে, তাও একেবারে ভরদুপুরে। বাংলদেশে ওয়াইন্ড ক্যাটদের মধ্যে বনবিড়াল বা জাঙ্গল ক্যাটদের পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি। গ্রামের আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল এমনকি ইটের পাঁজাতেও কখনো আস্তানা গাড়ে। আকারে সাধারণ বিড়ালের দ্বিগুণ। পছন্দের খাবার তালিকায় আছে সাপ, কাঠবিড়ালিসহ খুদে স্তন্যপায়ী প্রাণী। সুযোগ পেলে গৃহস্থের বাড়ির হাঁস-মুরগি ধরে। গাছ বাইতে ভারি ওস্তাদ বলে পাখিও শিকার করে খায়।

মর্মর বিড়াল

বাংলাদেশে প্রাণীটা এখন আর আছে কি না এটা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন অনেকে। কিন্তু চামড়া, ক্যামেরা ট্র্যাপে ছবি পাওয়া এমন নানা ধরনের প্রমাণ বলছে, এখনো এরা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। আছে সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে। আকারে পোষা বিড়ালের চেয়ে বড়।

মোট দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন ফুট। এর মধ্যে লেজই অর্ধেক। গায়ের রং মলিন তামাটে বা হলদে ধূসর। তবে শরীরে মার্বেলের মতো কিছু কালো ছোপের কারণে একে খুব সুন্দর দেখায়। নামও তাই মার্বেল ক্যাট বা মর্মর বিড়াল। প্রিয় খাবার কাঠবিড়ালি, পাখি।

মেছোবাঘ

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের কোয়ার্টারে থেকেছি কয়েকবার। বিট অফিসের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে কর্ণফুলী নদী। নদীর ওপারে সীতা পাহাড়। বিশাল সব গাছপালা, তাদের গায়ে জড়িয়ে থাকা লতা আর ঝোপজঙ্গল মিলে দুর্ভেদ্য এই সীতা পাহাড়। রাতের বেলা বন বিভাগের সার্চ লাইটের আলো ফেলা হতো নদীর ওপারে। আমি ওই আলোয় কোনো বন্য প্রাণী দেখার আশায় অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতাম। এক রাতে হঠাৎ আলো ফেলতেই ধরা পড়ল মেছোবাঘের জ্বলজ্বলে এক জোড়া চোখ। পানি খেতে কিংবা মাছ শিকার করতে এসেছিল। জলপাই-সবুজ গায়ে কালো ফোঁটা থাকে মেছোবাঘদের। মেরুদণ্ডের কাছে আবার কালো ডোরার মতো আছে। আকারে একটি কুকুরের সমান। তবে বেশ তাগড়া। প্রিয় খাবার ছোট জাতের বন্য প্রাণী। মাছ শিকার করে খাওয়াও ভারি পছন্দ। তাই নাম হয়ে গেছে মেছোবিড়াল বা মেছোবাঘ। পত্রপত্রিকায় চিতাবাঘ ধরা পড়ার যেসব কাহিনি আসে তার বেশির ভাগই আসলে মেছোবাঘ। সংখ্যায় দিন দিন কমলেও বাংলাদেশের বেশির ভাগ পাহাড়ি এলাকা এমনকি হাওর এলাকা বা বনেও দেখা যায়। কোনো কোনো গ্রামীণ বনেও মাঝেমধ্যেই মেছোবাঘ ধরা পড়ার খবর আসে। তবে দিন দিন কমছে সংখ্যা। কুকুরের সঙ্গে এদের ভারি শত্রুতা। কারণ এরা মুরগি চুরি করতে এলেই কুকুররা চিৎকার করে পাড়া মাথায় তোলে। গ্রামের ধারে বাস করা মেছোবাঘেরা কুকুরের বাচ্চা চুরি করে নিয়ে খেয়ে ফেলে। যেন বড় হয়ে এগুলো তাদের ঝামেলায় ফেলতে না পারে।


মন্তব্য