kalerkantho

গল্প

তুইও বলিস জয়বাংলা

নাসরীন মুস্তাফা

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



তুইও বলিস জয়বাংলা

অঙ্কন : মানব

এক-এক দিন দাদিমার কী যে হয়! ঝাঁড়পোছ উত্সবে মেতে ওঠে। ধুলো ছোটে চারদিক।

সব শেষ হলে ঝকঝক করে সব। তখন খুব ভালো লাগে। কেমন নতুন নতুন লাগে চারদিক।

দাদিমা তখন ফোকলা দাঁতে হাসেন। বলেন, মাঝেমধ্যে এ রকম করতে হয়। ম্যালা দিন একরকম থাকতে নেই। একঘেয়ে হতে নেই।

কী হয় একরকম থাকলে?

কী হয় একঘেয়ে হলে?

আমরা এ রকম যখন বলি, তখন দাদিমা হাসি থামান। বলেন, কী হয়?

হ্যাঁ, কী হয়?

একরকম থাকতে থাকতে, একঘেয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন বুড়ো হয়ে যায়।

দাদিমা বুড়ো হননি। দাঁত পড়লে, চুল পাকলে মানুষ বুড়ো হয় না। মগজ পুরনো হলেই বুড়ো হতে হয়। দাদিমার মাথাটা এখনো দারুণ তাজা। নতুন নতুন আইডিয়া গিজ গিজ করে। কাজেই, দাদিমা বুড়ো হননি।

দাদিমা যে বুড়ো হননি, সেটা আবারও দেখতে পারছি। আবারও ঝাঁড়পোছ চলছে। চিলেকোঠার ঘর থেকে টেনে নামানো হয় নানা জিনিস। বাক্স-পেটরা। একটা বাক্স খুলতেই দাদিমা নিভে যান। সত্যি বলছি, একদম দপ করে নিভে যান। ধুপ করে বসে পড়েন। ঘন ঘন দম নেন। আর বলেন, এসব তবে ছিল!

কী সব?

পুরনো ছেঁড়াফাটা একটা ফতুয়া, একটা বাঁশের বাঁশি, বেশ কয়েকটা মারবেলের গুলি। এসবের নিচে ছিল একটা হলদে কাগজ। আসলে এটা খাম। এর ভেতরে চিঠি ছিল একটা। কার চিঠি?

দাদিমা কাঁদেন। এসব কিছু নাকি তার ছোট ভাইটার। একাত্তর সালে সে ছিল তেরো বছরের কিশোর। মারবেলের গুলি দিয়ে খেলত। বাঁশি বাজাত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দাদিমা তার ছোট ভাইটাকে আগলে রাখতেন। তবু ভাইটা চলে যায়। যুদ্ধে যায়। হারিয়ে যায়।

হারিয়ে যায়?

হ্যাঁ, রকুর আর কোনো খোঁজ পাইনি। অনেক পরে একটা চিঠি এসেছিল। কার হাত দিয়ে পাঠিয়েছিল, মনে নেই। তবে এসেছিল। রকুর চিঠি। বুবুকে লেখা। বুবু মানে, আমাদের দাদিমা।

কাঁপা কাঁপা হাতে খাম খোলেন দাদিমা। চিঠিটা বের করেন। পড়বেন আবার।

এ কী? লেখা পড়া যায় না কেন?

পুরনো চিঠি। আসলেই লেখা পড়া গেল না। কী ছিল লেখায়, দাদিমা আবার পড়তে চান। পড়তে না পারলে পড়বেন কিভাবে?

দাদিমা কাঁদেন। খুব কাঁদেন। দাদিমাকে এখন সত্যিই বুড়ো লাগছে। দাদিমা বুড়ো হয়ে গেলেন!

‘রঙের মানুষ’ বলে সবাই ডাকে তাকে। আমাদের পাড়াতেই থাকেন। ছবি আঁকেন। বাড়ি থেকে বের হন না। রং কেনেন না, এটাসেটা দিয়ে বানিয়ে নেন। তুলি কেনেন না, বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে গজানো বাঁশগাছের ডাল কেটে বানিয়ে নেন। তবে ছবি যা আঁকেন, তা নাকি সেই রকম। তার ছবি বিদেশে যায়। জাদুঘরেও নাকি তার ছবি টানানো আছে।

দাদিমার কান্না থামাতে রঙের মানুষটার কাছে গিয়েছিলাম আমি। মা বলেছিলেন বলেই গিয়েছিলাম। রং নিয়ে জাদু দেখাতে পারেন নাকি তিনি। পুরনো চিঠির লেখা পড়ার জাদু তিনি জানেন হয়তো বা। না জানলে নাই। যদি জানেন, সেই ভেবে গেলাম। বেশ কয়েক দিন গেলাম। বলা যায়, লেগে থাকলাম। জাদুটা আমাকে জানতেই হবে।

কাজ হলো। শিখলাম জাদু। সত্যিই জাদুটা কাজ করে কি না দেখতে হবে।

রকুর চিঠি খুব ভালোভাবে দেখলাম। কালির রংটা কী, বুঝতে হবে ভালোভাবে। কালি কালই লাগছে।

মনে পড়ল ‘রঙের মানুষ’ কী বলেছিলেন। কাল কালির জন্য লাগবে ক্লোরিন দ্রবণ। এর জন্য চাই লবণ, লেবুর রস আর পানি। অ্যালুমিনিয়াম সালফাইড আর হাইড্রোজেন সালফাইড দিলে আরো ভালো। কঠিন লেখাও পড়িয়ে দেবে।

পুরনো লাল কালির জন্য লাগবে সাবান, অ্যামোনিয়া, লেবুর রস, টিনের আবরণের ঘষা গুঁড়া আর পানি। কাল কালির চেয়ে লাল কালির বাজনা বেশি। তবে বানানো হয়ে গেলে ব্যবহার একই। তুলিতে নিয়ে লেখার ওপর দিতে হবে ওই দ্রবণ।

রকুর চিঠিতে এভাবে তুলি ঘষলাম। এরপর চিঠিটা ফটোকপি করলাম। কাল কালিটা বাড়িয়ে দিয়ে ফটোকপি হলো। এরপর চিঠিটা দিলাম দাদিমার হাতে। দাদিমা পড়বেন রকুর চিঠি।

‘বুবু, তোর কি খুব মন খারাপ? আমার জন্য কাঁদিস? আমিও কাঁদি। হাউমাউ করে কাঁদি। তারপর কী বলি, জানিস? বলি, জয় বাংলা। তখন মনটা ভালো হয়ে যায়। তোর যখন মন খারাপ হবে, তুইও বলিস। জয় বাংলা। ’

দাদিমা কাঁদেন। বিড়বিড় করে বলেন, জয় বাংলা।

এর পরও কান্না থামে না।

রকু হারিয়ে গেছে। রকুর জন্য কান্না কি কখনো শেষ হবে?

হবে না। দাদিমা জানেন, আমরাও জানি তা।


মন্তব্য