kalerkantho

ইশকুলের প্রথম দিন

কামাল হোসাইন   

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



ইশকুলের প্রথম দিন

অঙ্কন : মাসুম

আজই প্রথম ইশকুলে যাওয়ার দিন সিফাতের। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাকে এই ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন বাবা। তারপর শুরু দিন গোনা। কবে ডিসেম্বর শেষ হয়ে জানুয়ারি আসবে। জানুয়ারির প্রথম দিন ইশকুলে যাওয়ার কথা। নতুন জামা, প্যান্ট, জুতা, বই-খাতা, ডায়েরি, ব্যাগ কেনা হয়েছে।

ভয় কাটানোর জন্য বাবা একবার সিফাতকে ইশকুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। সব ক্লাসরুম ঘুরিয়ে দেখিয়ে এনেছেন।

প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয়ও হয়েছে সেদিন। ইশকুলটি তার পছন্দ কি না জানতে চেয়েছিলেন তিনি। সিফাত ওই দিন তেমন একটা কথা বলেনি। শুধু নাম জিজ্ঞেস করলে জবাব দিয়েছে।

বাড়িতে দাদা আছেন। দাদি আছেন। চাচুরা আছেন। সবার কাছ থেকে দোয়া নিয়ে ইশকুলের দিকে পা বাড়ায় সিফাত।

ওদিকে ইশকুলের ভ্যান-আঙ্কেল পিপ পিপ করে বাঁশি বাজাচ্ছেন। মানে জলদি বের হও। দেরি হয়ে যাচ্ছে। দেরি হয়ে গেলে ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। আজ ইশকুলে গিয়ে কত না বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হবে, গল্প হবে।

সিফাত ইশকুলে ভর্তি হওয়ার আগে কতবার এই ভ্যান-আঙ্কেলের পিপ পিপ শুনেছে। দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে চড়তেও চেয়েছে। বাবা বলেছেন, ইশকুলে ভর্তি না হলে ও গাড়িতে চড়তে হয় না। এই তো আর কটা দিন। তারপর তুমি গাড়িতে চেপে ইশকুলে যাবে-আসবে।

সত্যিই তাই। আজ সেই দিন। যে দিনের স্বপ্ন দেখতে দেখতে এতটা দিন সে পার করে এসেছে।

সাদা জুতা-মোজা পরে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে—ভাবতেই সিফাতের মনটা খুশিতে উথলে উঠত। তার তর সইছিল না।

সিফাত যখন ভ্যান-আঙ্কেলের গাড়ির দিকে প্রথম পা বাড়ায়, দেখা হয় সাদা-কালোয় সেজে থাকা দোয়েল পাখিটার সঙ্গে। সে এতক্ষণ পেঁপে গাছটির মগডালে সকালের গান গেয়ে ঠোঁট দিয়ে তার গা চুলকাচ্ছিল।

সিফাতকে দেখেই দোয়েলটা উড়ে পেয়ারাগাছের একেবারে নিচু ডালে এসে বসল।

বলল, তুমি আজকে প্রথম ইশকুলে যাচ্ছ, তোমার জন্য অনেক শুভ কামনা রইল।

পাশের কলাপাতার আগায় সূর্যের আলো লেগে চিকচিক করছিল কয়েক ফোঁটা শিশিরবিন্দু। তারাও চুপ করে রইল না।

বলল, কত দিন ধরে তুমি ইশকুলে যেতে চেয়েছ। তোমার জন্য আমাদের শুভ কামনা রইল সিফাত।

হঠাৎ এক দমকা বাতাস এসে সিফাতের পরিপাটি চুল উলোঝুলো করে দিল।

তারপর মুখ টিপে হাসল খানিক। বলল, আজ তোমার জীবনের দারুণ একটা দিন। এগিয়ে যাও। ভালো মানুষ হও। দেশের জন্য কাজ করো। তোমাকে অভিবাদন সিফাত।

কেমন কেমন করে যেন সিফাত আজ সবার কথা বুঝতে পারছে।

এই যেমন তাদের বাড়ির মিনি বিড়ালটির কথাই ধরা যাক। সবাই জানে, ও কেবল মিউমিউ করেই ডাকতে জানে। সিফাতও এত দিন তা-ই জানত। কিন্তু আজ মিনির সেই মিউমিউ ডাক তার কানে স্পষ্ট কথা হয়ে ভেসে আসছে।

মিনি কোথা থেকে পড়িমরি ছুটে এলো। বলল, কী কপাল আমার! ওই হতচ্ছাড়া নেংটি ইঁদুরটার জন্য আমার সব মাটি হতে যাচ্ছিল এখনই।

একটু থামল মিনি। আবার বলতে আরম্ভ করল। বলল, তুমি আজ প্রথম ইশকুলে যাচ্ছ। এই সময় তোমায় শুভ কামনা জানাব না, তাই কি হয়? তোমার জন্য অনেক ভালোবাসা রইল।

কককরো কো, কককরো কো ডাকতে ডাকতে লালঝুঁটি বড় মোরগটা ছুটে এলো। এসে সিফাতের চারপাশে ঘুরল কয়েক চক্কর। তারপর ছড়া কেটে বলল—

ইশকুলে যাও তুমি ইশকুলে যাও

লেখাপড়া শিখে শিখে মাথাটা খাটাও

ভালোবেসো দেশ-মাটি, ভালোবেসো সব

তোমাকেই ঘিরে হবে বড় উৎসব।

মোরগের ছড়া শুনে বাড়ির আর সব মোরগ-মুরগিও চলে এসেছে। সুর দিয়ে তারা গান গাইল খানিক।

এই ফাঁকে লাউডগায় ঝুলে থাকা সাদা ফুলটি তাকে শুভেচ্ছা জানাল।

ভালোবাসা জানাল কুমড়োলতা। ঝিঙে ফুলের গাছটিও।

তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাফাতে ছুটে এলো ছাগলছানা। লেজ নাড়তে নাড়তে কাছে এসে বলল, ইশকুলের পোশাকে তোমায় দারুণ লাগছে। তাই ছুটে এলাম বলতে। সবার এমন খুশি আর ভালোবাসা দেখে সিফাতের চোখ ভিজে উঠল। ইশকুল ভ্যানে তখন রাহুল, মায়মুনা, কুলসুম আর শামীম অপেক্ষা করছে। সিফাত গেলেই ভ্যানগাড়ি ছাড়বে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে যে। সিফাত কিছু বলে না। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গিয়ে ইশকুল ভ্যানে উঠল।

মজার ব্যাপার হলো, ভ্যানও তার সঙ্গে কথা বলল। বলল, এসো বন্ধু, আমার পিঠে চড়ে বসো। রোজ তোমাকে পিঠে চড়িয়ে ইশকুলে নিয়ে যাব। সিফাত ভাবল শুরুতেই যদি এমন হয়, তাহলে ইশকুলে গিয়েও না জানি আরো কতজন তার সঙ্গে কথা বলবে। এখন শুধু তার ইশকুলে গিয়ে পৌঁছার অপেক্ষা।


মন্তব্য