kalerkantho


গুবলুর গোয়েন্দাগিরি

অরুণ কুমার বিশ্বাস

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



গুবলুর গোয়েন্দাগিরি

গাঁয়ের ছেলে গুবলু। গোয়েন্দা আর রহস্যগল্প তার ভীষণ প্রিয়। সত্যজিৎ রায়ের চৌকস গোয়েন্দা ফেলুদার সব কাণ্ড-কীর্তি তার মুখস্থ। কোনো ব্যাপারে একটু রহস্যের গন্ধ পেয়েছে কি, অমনি ওর নাক চুলকাতে শুরু করে। কাছের বন্ধু সুমন আর বাপ্পিকে নিয়ে গুবলু নেমে পড়ে রহস্য অনুসন্ধানে।

টুকটাক কেসের মাধ্যমে ওর গোয়েন্দাগিরির হাতেখড়ি। স্কুলে কারো টিফিন চুরি হলো, দুষ্টুমি করে কেউ অঙ্ক খাতায় মিস্টার বিনের ছবি আঁকল—এসব নিয়ে মাথা খাটায় গুবলু। অন্যরা পাত্তা না দিলেও হেডস্যার অবশ্য মুচকি হেসে বলেন, থেমো না গুবলু, চালিয়ে যাও। একদিন নিউটনের মতো বড় বিজ্ঞানী হতে পারবে।

এ কথা শুনে সুমনরা ফিকফিক হাসে। গুবলু বুঝতে পারে, বন্ধুরা তাকে মোটেও পাত্তা দেয় না।

তাতে কী, গুবলু কিন্তু থেমে নেই। একের পর এক রহস্য ঘাঁটতে থাকে। সব সময় যে সফল হয় তা না, তবে রহস্য নিয়ে ভাবতে ওর ভীষণ ভালো লাগে।

সেদিন হলো কি, সহপাঠী রবিনের বাড়ি থেকে খোয়া গেল ওর প্রিয় ম্যাঁও লুসি। বেচারা রবিনের খুব মন খারাপ। পোষা বিড়াল হারালে কার মনই বা ভালো থাকে! সুমন অবশ্য বলল, বিড়ালের আর আকাল কী! চল, মালিবাড়ি থেকে আরেকখানা ম্যাঁও ধরে আনি। দুদিন খেতেটেতে দিলে পোষ মেনে যাবে।

রবিনের সায় নেই। লুসিটা খুব ভালো ছিল। সে কুকুরের কাজও করত। মানে অচেনা কেউ বাড়িতে ঢুকলে জোরে জোরে ম্যাঁও ম্যাঁও করত। মামুলি চোরটোর এলে মোটেও সুবিধা করতে পারত না। আঁচড়ে-কামড়ে একশেষ করে দিত লুসি।     

সেদিন স্কুল থেকে ফিরে রবিন দেখল লুসি নেই। নেই মানে নেই-ই। সে দুধ-ভাত মেখে নিয়ে লুসিকে ডাকছে, অথচ সে আসছে না। রবিন জানে, দুধ-ভাত ওর ভীষণ প্রিয়। দুধের গন্ধ পেলে লুসি লুকিয়ে থাকতে পারে না, ছুটে আসবেই।

রবিন গিয়ে গুবলুকে ধরল। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, দোস্ত, যেমন করে হোক আমার লুসিকে এনে দে। বিনিময়ে তুই যা চাস তাই পাবি। আমার সব রংপেনসিল তোকে দেব, চাই কি এক ডজন ক্যাডবেরি চকলেট।

গুবলু বলল, আমার কিছু চাই না রে। তুই যে আমাকে গোয়েন্দা হিসেবে বিবেচনা করছিস, এতেই আমি খুশি। চল, দেখি কী করা যায়। সঙ্গে সুমন আর বাপ্পিও আছে। ওরা বলতে গেলে গুবলুর লেজের মতোন। চাইলেও রেখে যাওয়ার উপায় নেই।

শুরুতে ওরা বাড়ির আশপাশে জঙ্গলে আতিপাতি করে খুঁজল। কিন্তু লুসিকে পাওয়া গেল না, এমনকি লুসির একটা লোমও নয়। আবার দুর্গন্ধও নেই কোথাও। তার মানে লুসি মরেনি, সে বেঁচে আছে। মারা গেলে এত দিনে দুর্গন্ধ ছড়াত। রবিন এতে খুশি হয়। যাক, লুসিটা অন্তত বেঁচে আছে।

বল রবিন, এই গাঁয়ে লুসির শত্রু কে আছে! কেস খোলসা করতে গেলে ঘটনার মোটিভ জানতে হবে। লুসি কি কাউকে কামড়েছিল!

সে তো কতজনকেই কামড়েছে। সবাই তো আর দোষী নয়। রবিন মিউমিউ করে বলল। আহা, এদের মধ্যে এমন কি কেউ আছে, লুসিকে যে একদম দেখতে পারে না! ওর ক্ষতি করতে চায়?

মেলা ভেবেচিন্তে রবিন বলল, আছে একজন। ঘোষপাড়ার হরিপদ। লোকটা খেঁকুরে টাইপ। লুসিকে মোটেও পছন্দ করত না। লুসি তাকে কামড়েছিল।

হুম! চল তাহলে হরিপদের বাড়ি যাই। অমনি ওরা ঘোষপাড়ায় গিয়ে বুড়োকে পাকড়াও করল। প্রথমে কাকুতি-মিনতি, তারপর বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কথা বলে ভয়ও দেখাল। কিন্তু হরিপদ এত সহজে কাবু হওয়ার লোক নয়। এমনও হতে পারে, সে হয়তো লুসিকে কিছু করেনি। ওরা স্রেফ সন্দেহ করছে।  

কিন্তু সুমন আর রবিনের কেন যেন মনে হলো এই হরিপদই ঘটনার ভিলেন। রবিন তার চোখে ঘৃণা দেখেছিল। পারলে যেন লুসিকে সে মেরেই ফেলত।

স্রেফ অনুমান দিয়ে কি রহস্য উদ্ধার হয়! মাথা চুলকে বলল গুবলু। যুক্তি চাই, প্রমাণ।

রবিন খুব জোর দিয়ে বলল, হরিপদই লুসিকে সরিয়েছে। ওর মোটিভ আছে। তুই খুঁজে বের কর।

ওরা সবাই মিলে ভাবছে। কোথায় গেল লুসি! বুড়ো তাকে যদি লুকিয়ে থাকে, তাহলে খাবার দিতে হলেও সে লুসির কাছে যায়। বুড়োকে ফলো করতে হবে। কিন্তু সারাক্ষণ বা রাতে কি তাকে ফলো করা সম্ভব! গুবলু একটা বুদ্ধি বের করল। সে তুখোড় অভিনেতার মতো হরিপদের পায়ের কাছে বসে পড়ে বলল, দাদু, শুনেছি আপনার অনেক বুদ্ধি। আমাকে একটু ধার দেন না!

দূর বোকা! বুদ্ধি কখনো ধার দেওয়া যায়! সে তো থাকে মগজে।

যায় দাদু। দিন না একটু পায়ের ধুলো। তাতেই হবে। গুবলু অমনি বুড়োর পা-সুদ্ধ জুতার কাছে গিয়ে বসল। ধুলো নেওয়ার অজুহাতে জুতার তলায় লাগিয়ে দিল আইকার আঠা। এবার বুড়ো যেখানেই যাক, কিছু না কিছু লেগে থাকবে পায়ে। সূত্র ধরে পৌঁছে যাবে লুসির কাছে।

আইকার আঠা বলে কথা। যতই ধুলাবালি লাগুক, আঠা কিন্তু ফুরায় না। সেই বিকেলে তেমন কোনো ক্লু পেল না গুবলু। তাই বলে সে আশা ছাড়েনি। ওরা তক্কে তক্কে থাকে, আর বুড়োর দিকে কড়া নজর রাখে। গুবলুর নজর শুধু তার জুতায়। ধরা খাওয়ার ভয়ে লুসিকে হরিপদ আবার মেরে না ফেলে! রবিন ভাবে। আহা রে, কী মিষ্টি দেখতে লুসি!

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বুড়োর জুতায় সন্দেহজনক কিছু আটকা পড়েনি। মানে জালে মাছ নেই। সাঁঝের মুখে বুড়ো হনহনিয়ে কোথায় যেন চলছে। ওরা কিন্তু তার পিছু নিল না। বুড়ো তাহলে অন্যপথ ধরবে। গুবলু বরং বুড়োর বাড়িতেই তার জন্য অপেক্ষা করে।

অবশেষে তারা সফল হয়। সন্ধ্যার একটু পরে বুড়ো ফিরল। গুবলু দেখে তার জুতায় লেগে আছে লাল ইটের গুঁড়া। এই গাঁয়ে লাল দালান একটাই আছে, জঙ্গলের মধ্যিখানে পুরনো ক্লাবঘর। ব্যস, ওরা পেয়ে গেল রহস্যের সিঁড়ি। বন্ধুদের নিয়ে গুবলু ছুটে যায় লাল দালানে। সেখানেই এক ছোট্ট কুঠুরিতে আধমরার মতো পড়েছিল রবিনের প্রিয় বিড়াল লুসি। রবিন খুব খুশি, গোয়েন্দা গুবলুর বুদ্ধিতে মহা খুশি হয় বন্ধুরা।


মন্তব্য