kalerkantho


বদরগঞ্জে ক্যানেলের মাটি সাবাড়

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, রংপুর   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বদরগঞ্জে ক্যানেলের মাটি সাবাড়

রংপুরের বদরগঞ্জে তিস্তা ক্যানেলের শাখা-প্রশাখার মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে নির্বিচারে। এর মধ্যে ভাটায় মাটি নেওয়ার জন্য বড় একটি চক্র কাজ করছে। গত এক মাস ধরে মাটি কাটা চলতে থাকায় ক্যানেল অনেক চিকন হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ক্যানেলের অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই। কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের নজরদারির অভাবে পুরো ক্যানেলটি এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বদরগঞ্জের গোপালপুর থেকে মধুপুর ইউনিয়নের উত্তর বাওচণ্ডি শাকোয়াপাড়া কামারপাড়ার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা ক্যানেলটি। এলাকার একটি চক্র নির্বিচারে মাটি কেটে বিক্রি করছে ভাটায়। যেসব জমির ওপর দিয়ে তিস্তা ক্যানেলটি বয়ে গেছে, সেসব জমির মালিক আবার মাটি কেটে চিকন করে ফেলেছে ক্যানেলের মূল কাঠামো। এতে তিস্তা ক্যানেলের অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে।

একটি সূত্র জানায়, ১৯৮৫ সালে সৌদি উন্নয়ন তহবিল ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং আবুধাবী উন্নয়ন তহবিলের প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা ব্যারাজসহ সেচযোগ্য কৃষিজমি ও জলকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়। উত্তর জনপদের বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলায় আমন মৌসুমে সম্ভাব্য খরা পরিস্থিতি থেকে আমন শস্যকে রক্ষা, শুষ্ক মৌসুমে রবিশস্যে সেচ সুবিধা প্রদান এবং বর্ষা মৌসুমে সেচ এলাকা থেকে পানি নিষ্কাশন, সম্পূরক সেচের মাধ্যমে শাখা ও প্রশাখা ক্যানেলগুলো দিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

এ লক্ষ্যে ১৯৮৫-৮৬ সালে রংপুর অঞ্চলে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিস্তা ক্যানেলের মূল শাখা থেকে প্রশাখা ক্যানেলগুলোর খননকাজ শুরু হয়। তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পটি নীলফামারীর পাঁচটি উপজেলা (সদর, জলঢাকা, সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, ডিমলা), রংপুরের চারটি উপজেলা (সদর, গঙাচড়া, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ) ও দিনাজপুরের তিনটি উপজেলা (চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর, খানসামা) উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত ছিল। ১৯৯১ সালের দিকে রংপুর সদর, গঙাচড়া, বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হয় শাখা-প্রশাখা ক্যানেল। ওই সময় ক্যানেলগুলো সম্পূর্ণ পাকাকরণ করা হয়। চাষিদের সুবিধার্থে ওই বছর থেকেই ক্যানেলগুলো দিয়ে পানি সরবরাহ শুরু হয়। কিন্তু গত শনিবার বদরগঞ্জ উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের শাকোয়াপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তা ক্যানেলটি কাটতে কাটতে চিকন করে ফেলা হয়েছে। আবার কোথাও মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে ভাটায়।

শাকোয়াপাড়া গ্রামের হাজি আনসার আলীর ছেলে আশরাফুল ইসলাম গত এক সপ্তাহ ধরে ট্রাক্টর দিয়ে মাটি কেটে বিক্রি করছেন ভাটায়। এতে দেখা যায়, সরকারের অধিগ্রহণ করা নির্মিত ক্যানেলটি মাটি কাটার ফলে বিলিন হওয়া পথে। এতে কেউ তাদের বাধা দিচ্ছে না।

ওই এলাকার আমিরুল ইসলাম ও রাশেদুল হক বলেন, ‘কৃষকের সুবিধার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ক্যানেলটি নির্মাণ করে। এ জন্য সরকার জমি অধিগ্রহণ করেছিল। ওই সময় এর প্রস্থ ছিল অন্তত ৪০ ফুট। কিন্তু পাশের জমির মালিকরা কেটে কেটে তা চিকন করে ফেলেছে। ইদানীং আবার ক্যানেলের মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ভাটায়।’ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাজি আনসার আলী বলেন, ‘মুই হাজি মানুষ। মোর ছইল (ছেলে) মাটি কাটা ভুল করছে। সবাই তো মাটি কাটি শেষ করছে। মোর ছেলে যদি মাটি কাটি নিয়ে যায়, তা হইলে পূরণ করি দেমো। তাতে কোনো সমস্যা হবার ন্যায়।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবার রহমান বলেন, ‘ক্যানেলগুলো নির্মাণের পর থেকে এর তদারকি করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এগুলো দেখভালের জন্য এলাকাভিত্তিক তাদের দল গঠন করা আছে।’

কিন্তু বদরগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো দপ্তর না থাকায় তাদের বক্তব্য জানা যায়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাশেদুল হক বলেন, ‘মাটি কেটে নেওয়ার বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার চেয়ারম্যান তহশিলদারদের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’


মন্তব্য