kalerkantho


দিনাজপুর

উর্বর মাটি পুড়ছে ভাটায়

দিনাজপুর প্রতিনিধি   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উর্বর মাটি পুড়ছে ভাটায়

উর্বর মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। ছবিটি দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের নথুপাড়া এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভাটায় মাটির চাহিদা মেটাতে দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় তিন ফসলি জমির ‘টপ সয়েল’ হিসেবে পরিচিত উর্বর মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ভাটা মালিকরা। এ ব্যাপারে কোনো আইনকেই তোয়াক্কা করছে না তারা। জেলায় ফসলি জমির পরিমাণ ছয় লাখ ৯০ হাজার ৫৫৩ হেক্টর এবং ভাটা রয়েছে ২৩৩টি। ভাটাগুলোতে ৬০ লাখ হিসাবে প্রতি মৌসুমে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ পিস ইট। এই ইট উৎপাদনের জন্য পোড়ানো হচ্ছে ১৩ কোটি সিএফটিরও বেশি মাটি। এই মাটি আসছে কৃষিজমি থেকে। অভিযোগ রয়েছে, কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে বা ফুসলিয়ে কৃষিজমির মূল্যবান অংশ (উপরের মাটি) কেটে ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। জমির দরিদ্র মালিকরা স্বল্পমূল্যে জমির উর্বর মাটি ভাটা ও গৃহ নির্মাণকারীদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে।

ভাটার চাহিদা মেটাতে কৃষিজমির গুরুত্বপূর্ণ অংশের এমন বিনাস হলেও এ নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া নেই সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের। ফলে কৃষিজমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদনের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে কৃষি ও পরিবেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। অথচ ভাটার সর্বশেষ আইন অনুযায়ী কৃষিজমির মাটি ভাটায় ব্যবহার নিষিদ্ধ। পরিবেশ অধিদপ্তর, কৃষক ও কৃষি বিভাগ, ইটভাটা মালিকসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, গ্রামের দরিদ্র কৃষকরা অর্থাভাবে, আবার কেউ কেউ সচেতনতার অভাবে ফসলি জমির উর্বর মাটি ভাটায় বিক্রি করছেন। সামান্য প্রয়োজনে বা কোনো প্রয়োজন ছাড়াই মাটির উপরিভাগ তুলে দিচ্ছেন ভাটা মালিকদের কাছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল ধারণা থেকেও তারা মাটি বিক্রি করছেন।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত কৃষকদের ফুসলিয়ে বা ভুল বুঝিয়ে জমির মাটি কেটে নিচ্ছে ভাটা মালিকরা। কৃষকদের বোঝানো হয় উঁচু জমিতে ধান আবাদ হবে না, জমি থেকে সেচের পানি নেমে যাবে, ওপর থেকে মাটি বিক্রি করে দেওয়া ভালো, ওপরের মাটিতে ভাইরাস-ময়লা আছে, ওপরের মাটি বিক্রি করে নিচের ভালো মাটিতে চাষ করলে বেশি ফসল হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এ বিভ্রান্ত ও কৃষককে প্ররোচিত করার কাজে সক্রিয় রয়েছে ভাটা মালিকসহ মাটি সরবরাহকারী এক শ্রেণির দালালচক্র।

জেলার ইট প্রস্তুতকারীদের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে ভাটাপ্রতি ৬০ লাখ হিসাবে জেলায় ২৩৩টি ভাটা থেকে প্রতি মৌসুমে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ ইট উৎপাদিত হয়। আর এ জন্য প্রতি ভাটায় ৮ থেকে সাড়ে ৮ হাজার ট্রাক মাটি দরকার হয়। ভাটার সর্বশেষ আইন অনুযায়ী, কৃষিজমির মাটি ভাটায় ব্যবহার নিষিদ্ধ। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ এ উল্লেখ রয়েছে, ‘আপাতত বলবৎ অন্য আইনে যাহাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে কৃষিজমি বা পাহাড় বা টিলা হইতে মাটি কাটিয়া বা সংগ্রহ করিয়া ইটের কাঁচামাল হিসাবে উহা ব্যবহার করিতে পারিবেন না। এই আইন লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।’

দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জেলায় অনুমোদিত ভাটার সংখ্যা ২৩৩টি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৮টি, বিরল উপজেলায় ১৯টি, বোচাগঞ্জে ১৯টি, কাহারোলে ছয়টি, বীরগঞ্জে ২৪টি, খানসামায় ছয়টি, চিরিরবন্দরে ৩৫টি, পার্বতীপুরে ৩৪টি, ফুলবাড়ীতে ১২টি, বিরামপুরে ১০টি, হাকিমপুরে একটি, নবাবগঞ্জে ২৯টি ও ঘোড়াঘাট উপজেলায় ১০টি ভাটা রয়েছে। এ ছাড়া চলছে অনুমোদনহীন অনেক ভাটা।

চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘ফসলি জমির উপরিভাগের ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি পরিমাণ মাটি উর্বর। এ মাটির সঙ্গে জৈব উপাদানের সম্পর্ক রয়েছে। ফসলি জমিতে ৫ শতাংশ জৈবসার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে আছে মাত্র ১ শতাংশ। ফসলি জমির মাটি এভাবে বিক্রি হয়ে ভাটায় গেলে ভবিষ্যতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হারে ফসল উৎপাদন হ্রাস পাবে।’

এদিকে ভাটাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আদায় করা হচ্ছে জরিমানাও। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক খায়রুল আলমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আগামীতে ফসলি জমির ‘টপ সয়েল’ কেটে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমরা আরো গুরুত্বের সঙ্গে দেখব।



মন্তব্য