kalerkantho


অ্যাপের ফাঁদ পাতা ভুবনে

দেশের রাইড শেয়ারিং অ্যাপ পাঠাও নিবন্ধন করা ব্যবহারকারীদের ফোনের সব তথ্য তাদের নিজস্ব সার্ভারে সংরক্ষণ করছে—এমন অভিযোগে কিছু দিন ধরে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। শুধু পাঠাও নয়, ইনস্টল করতে গেলে কৌশলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে নেয় অধিকাংশ অ্যাপ। কিভাবে ব্যক্তিগত তথ্য অ্যাপের দখলে যাচ্ছে, এসব বিষয়ে করণীয় কী—এসব নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আল-আমিন দেওয়ান

১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অ্যাপের ফাঁদ পাতা ভুবনে

মডেল : হিমেল ছবি : মোহাম্মদ আসাদ অলংকরণ: দেওয়ান আতিকুর রহমান

‘আমার মোবাইলের ফোনবুকের নম্বর, এসএমএস সব পাঠাও নিয়ে গেল’—এমন বিলাপ এখন ফেইসবুকের ওয়ালে ওয়ালে। আবার যেই ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন সেই ফেইসবুকের বিরুদ্ধে তো অভিযোগ আরো ভয়াবহ! শুধু ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়াই নয়, মোবাইলে আড়ি পেতেও নাকি শুনতে পারে ফোনালাপ। সব অ্যাপই কোনো না কোনো ভঙ্গিমায় আপনার তথ্য চায়। একেকটির একেক পন্থা—এই যা।

 

কাজে লাগায় উত্সুক মন

বেনামি বার্তা দেখিয়ে ২০১৭ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলো সারাহাহ। এরপর আরেক অ্যাপ ‘স্টুলিশ’ ভালোবাসা, রাগ, অভিমানের সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি—একান্ত গোপন কথা প্রকাশ করা যাচ্ছিল নাম না জানিয়েই। আরো আছে। বৃদ্ধ হলে আপনি দেখতে কেমন হবেন, আপনার বছরে কত আয় হবে—কত অ্যাপ যে ছড়িয়ে আছে ফেইসবুকে। এসব লিংকে ক্লিক ও শেয়ারও করেছেন অনেকে। ‘উত্সুক মন’ সায় দিতে গিয়ে আসলে হয়েছে ‘সর্বনাশ’।

কিভাবে? অ্যাপগুলো ইনস্টল করার সময় ক্যামেরা, লোকেশন, ফোন নম্বর ও স্টোরেজে প্রবেশের অনুমতি চায়। এ ধরনের অ্যাপ ব্যবহারে এসব তথ্য প্রয়োজন পড়ার কথা নয়। অ্যাপ ব্যবহারের শর্তে অনুমতি দেওয়ায় ফোনে থাকা ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ভিডিও ও ফোন নম্বর অ্যাপটির মাধ্যমে নিয়ে নেয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এভাবে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ফাঁদে পড়ছি আমরা। আর দিয়ে দিচ্ছি সব তথ্য।

ফেইসবুক, উবার, জিমেইল, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপের মতো বিশ্বখ্যাত অ্যাপ থেকে শুরু করে জনপ্রিয় ট্রুকলার, শেয়ারইট জাতীয় অ্যাপ বলতে গেলে ব্যবহার না করে আমরা পারি না। এ ছাড়া বর্তমান সময়ে আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনেই নানা ধরনের অ্যাপ স্মার্টফোনে ডাউনলোড করে নিই। কিন্তু ডাউলোডের সময় আমরা না দেখেই ফোনের অনেকে কিছু ‘Agree’ করে দিই। এতে স্মার্টফোনের ক্যামেরা, এসএমএস-এমএমএস, কললিস্ট, স্টোরেজ, ছবি-ভিডিও, ক্যালেন্ডার, ডিভাইসের আইডি ও অন্যান্য তথ্য, মাইক্রোফোন, অডিও রেকর্ডসহ আপনার অনেক ব্যক্তিগত তথ্যের অনুমতি পায় সেবাদাতা কম্পানিগুলো।

স্মার্টফোনের জিপিএস চালু না থাকলেও ফেইসবুকের অ্যাপ ব্যবহারকারীর অবস্থান জেনে যায়। আইপি ঠিকানা থেকে শুরু করে ফেইসবুক স্ট্যাটাস, চেকইন, বিভিন্ন প্রগ্রামে যোগ দেওয়াসহ সব কার্যক্রমের তথ্যই পর্যবেক্ষণে রাখে সে। 

এই অভিযোগ আছে টুইটারের বিরুদ্ধেও। লিংকডইন ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত মেসেজ সংগ্রহে রাখে এবং তা স্ক্যান করে। এ জন্য সে স্বয়ংক্রিয়  মেসেজ স্ক্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে। লিংকডইনের বিরুদ্ধে গ্রাহক তথ্য বিক্রি বা পাচারের অভিযোগ পুরনো। তথ্য চুরি নিয়ে অভিযোগ আছে উবারের বিরুদ্ধে। বিখ্যাতদের অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে বাকিদের অবস্থা একটু ভাবুন।

 

পকেটেও বিপদ

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড শোফেনস এক গবেষণার ফলাফল নিয়ে জানান, অ্যানড্রয়েড ফোনের প্রতিটি অ্যাপই ব্যবহারকারীর স্মার্টফোনের স্ক্রিনের সব কার্যক্রমের রেকর্ড রাখতে পারে। সেটির মধ্যে স্মার্টফোনে আমরা যা টাইপ করি তাও। আইওএসসহ অন্য প্ল্যাটফর্মগুলোও খুব বেশি নিরাপদ নয়।

অ্যাপগুলোর পক্ষে স্মার্টফোনের গোপনীয়তা খুব সহজে ভেঙে ফেলা সম্ভব। অনুমতি না দিলেও জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের মাধ্যমে আপনার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য রাখতে পারে অ্যাপ। এ ক্ষেত্রে ফোনের অ্যাক্সেলোমিটার দিয়ে ব্যবহারকারীর চলাফেরার তথ্য জানা যায়, কিভাবে কোন অ্যাঙ্গেলে ফোন ধরা আছে জাইরোস্কোপ জানায় সেই তথ্য। কম্পাস, অ্যালার্ম এসব ফিচার থেকেও অনায়াসে তথ্য নিতে পারে অ্যাপ। কোনো কোনো অ্যাপ তো স্মার্টফোনের ক্যামেরায় প্রবেশ করতে পারে। দেখতে ও শুনতে পারে অডিও-ভিডিও। ফোনে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের এসএমএস মনিটর করাসহ ফোন নম্বর, ছবি, ভিডিও ও ব্যাংকিং ডাটা সবই নিজের সার্ভারে নিয়ে নিতে পারে অ্যাপ। অ্যাপ বন্ধ রাখলেও তথ্য নেওয়ার কাজ চলতেই থাকে।

 

তথ্যের জন্য কেন এই হাপিত্যেশ!

পৃথিবীতে এখন তথ্যই শক্তি। আর সবচেয়ে মূল্যবান মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য। কিছু দিন আগে ফেইসবুকের ‘কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা’ কেলেংকারির পেছনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভোটারের মন বদলে দেওয়া। গবেষকরা গণহারে এসব তথ্য নিয়ে তাঁদের ‘ক্যারিশমা’ কাজে লাগিয়ে ছকে ফেলে প্রয়োগের জুতসই উপায় বের করেন। এসব তথ্য কখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে, কখনো প্রাতিষ্ঠানিক বা গোষ্ঠীগতভাবে ব্যবহার হয়।

বিজ্ঞাপনের বাজারে এসব তথ্যের দাম অনেক। ফেইসবুকের বিরুদ্ধে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রির অভিযোগ আছে। মামলাও হয়েছে। ডেটিং অ্যাপ ‘টিনডার’ তার ব্যবহারকারীর তথ্য অন্য সব ডেটিং সাইটের সঙ্গে লেনদেন করে। লিংকডইনকে মাইক্রোসফট কিনে নেওয়ার পর এর গ্রাহকের সব তথ্য মাইক্রোসফট ব্যবহার করার কথা বলল। অ্যামাজনও তার তথ্য তৃতীয় বিভিন্ন পক্ষের কাছে লেনদেন করতে পারে।

 

এখন উপায়?

নিজেই ঠিক করুন কী কী তথ্য দেবেন। অ্যাপ ইনস্টলের সময় দেখতে হবে অ্যাপটি কী কী অনুমতি চায়। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চাইলে সেগুলো অ্যানড্রয়েড সেটিংস থেকে বন্ধ করে দেন। যেমন গ্রাহকের সেবায় মেসেজ কোনো কাজে আসতে পারে না পাঠাওয়ের। তাহলে মেসেজ, ক্যামেরাসহ এমন অপশন বন্ধ করে দিন। পাঠাওয়ে শুধু লোকেশন অপশন চালু রাখতে পারেন। 

অ্যানড্রয়েড ব্যবহারকারীরা ফোনের ‘Settings’-এ গেলেই পাবেন ‘apps & notifications’। এখানেই আপনার অ্যাপগুলো দেখতে পাবেন।

আপনি যে অ্যাপের পারমিশন দেখতে চান এবং বাছাই করতে চান, সেই অ্যাপটি নির্বাচন করে ‘permissions’-এ ক্লিক করুন। তাহলে দেখে নিতে পারবেন অ্যাপটি আপনার ডিভাইসের কোথায় কোথায় প্রবেশ করতে চায়।

এবার একে একে ক্লিক করে সেখানে আপনি যে যে পারমিশন দেবেন সেগুলো ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ করে দিন। 

আইফোন ব্যবহারকারীরা প্রথমে ‘settings’-এ যান। সেখান থেকে ক্রল করে নিচে থাকা অ্যাপে ক্লিক করুন। তারপর ‘allow  to access’ অপশনে দেখা যাবে অ্যাপটি কী কী তথ্য নিচ্ছে। এরপর একইভাবে যে যে অনুমতি দেওয়া জরুরি সেগুলো ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ করে দিন। 

এর পরও সন্দেহ হলে কী করবেন? যদি মনে হয় কোনো অ্যাপের সেটিংসে তথ্য দেওয়ার স্বাধীনতা পাচ্ছেন না, সেই অ্যাপ ডিলিট করে দিন।

 

পাঁচ বাড়তি সাবধানতা

এক. সুপরিচিত বা প্রয়োজনীয় অনেক অ্যাপ দেখতে একই হলেও আসলে এক নয়। অনলাইন বা অ্যাপ বাজারে অনেক ভুয়া অ্যাপ রয়েছে। সেগুলোর ইউজার ইন্টারফেইস, লোগো ও নাম দেখতে আসল অ্যাপের মতোই। প্রথম দেখায় এটি যে ভুয়া তা চোখে পড়বে না। স্টোরগুলোতে ডাউনলোড সংখ্যা দেখে এ বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া যায়। কোথা থেকে ডাউনলোড করছেন, তার সোর্সটির খোঁজ নেওয়া এসব ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

 

দুই. লাইফস্টাইল, স্বাস্থ্য, হিসাব-নিকাশ, ট্র্যাকিংসহ  অনেক ক্যাটাগরিতে একই সেবা দিয়ে থাকে—এমন অনেক অ্যাপ ফ্রি ও পেইড সংস্করণে পাওয়া যায়। ফ্রি অ্যাপটি ডাউনলোড করে ভাবছেন কোনো দাম দিতে হলো না। আসলে আপনার তথ্যই ওই অ্যাপের দাম। তাই ফ্রি অ্যাপ ব্যবহারে একটু সচেতন থাকা উচিত। একান্তই ফ্রি নিতে হলে ওপেনসোর্স প্ল্যাটফর্ম হতে নেওয়া।

 

তিন. অ্যাপ ডাউনলোডের আগে অ্যাপের বিবরণ ভালো করে পড়ুন। নকল বা ভুয়া অ্যাপে বানান বা ব্যাকরণগত ভুল থাকতে পারে। যদি কোনো অ্যাপে এমন ভুল অনেক বেশি চোখে পড়ে, তাহলে ডাউনলোডের আগে সতর্ক হোন। মৌলিক বিবরণে এ ধরনের ভুল থাকা মানে অ্যাপটি ভুয়া হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

 

চার. মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোডের অপরিচিত ওয়েবসাইট রয়েছে অনেক। এগুলো থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করে ফোনে ইনস্টল করা নিরাপদ নয়। এতে বিভিন্ন ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার যুক্ত থাকতে পারে।

আপনি যদি অ্যানড্রয়েড ব্যবহারকারী হয়ে থাকেন, তাহলে গুগল প্লে থেকে ডাউনলোড করা নিরাপদ। যদি আইফোন ব্যবহার করেন, তাহলে ভরসা রাখুন অ্যাপল স্টোরেই।

 

পাঁচ. গুগল প্লে বা অ্যাপ স্টোর থেকেও কোনো অ্যাপ ডাউনলোডের আগে ব্যবহারকারীরা অ্যাপটি সম্পর্কে কী বলছে তা পড়ুন।

অ্যাপ ডাউনলোড অপশনের নিচে প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে গ্রাহকদের রিভিউ ও মতামতের অপশন রয়েছে। সেখানে গ্রাহকরা অ্যাপ সম্পর্কে তাদের ফিডব্যাক দেয়। যদি কোনো অ্যাপ ভুয়া থাকে বা যদি দেখেন যে ব্যবহারকারীরা অ্যাপ ব্যবহারে সমস্যার মুখে পড়েছে, সেটি মন্তব্য থেকে জেনে নিতে পারবেন।



মন্তব্য