kalerkantho


স্বাধীন মোবাইল নম্বর চাই

১৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



স্বাধীন মোবাইল নম্বর চাই

এমএনপির সবচেয়ে বড় সুবিধা গ্রাহকের স্বাধীনতা। মডেল: কাশফিয়া, পিংকি, জুবায়ের ছবি: মোহাম্মদ আসাদ

অনেক অপেক্ষার পর চালু হলো এমএনপি সুবিধা। তবে চালুর পরও সুবিধা পেতে নানা সমস্যায় পড়ছেন গ্রাহকরা। এমএনপি সেবা নিতে কোথায় যেতে হবে, নিয়ম-কানুনই বা কী—বুঝতে পারছেন না অনেকে। বিষয়গুলো নিয়ে ব্যবহারকারী, নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ও মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আল-আমীন দেওয়ান

 

এমএনপি (MNP)  বা মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি হলো নিজের মোবাইল নম্বরকে পছন্দের অপারেটরের নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করার উপায়।

ধরুন, আপনি X মোবাইল ফোন অপারেটরের গ্রাহক। আপনার নেটওয়ার্কও তাই X-এ। এখন আপনি মোবাইল নম্বর ঠিক রেখেই Y অপারেটরের গ্রাহক হতে চান। এমএনপি সুবিধায় এটা সম্ভব হচ্ছে। Y নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার X অপারেটরের নম্বর বদলাল না; কিন্তু নেটওয়ার্ক বদলে গেল।

এমএনপির সবচেয়ে বড় সুবিধা গ্রাহকের স্বাধীনতা। নিজের মোবাইল নম্বরের প্রতি মালিকানা বা অধিকার অর্জন।

 

এমএনপি সেবা পেতে

প্রথমে গ্রাহক যে নেটওয়ার্কের আওতায় যেতে আগ্রহী, অর্থাৎ অপারেটর বদলে যেটায় যাবেন সে অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার বা এজেন্ট পয়েন্টে যেতে হবে। সঙ্গে থাকতে হবে বর্তমান অপারেটরের সিম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি। 

কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি গ্রাহকের এনআইডির বিপরীতে আঙুলের ছাপ যাচাই করে মিল পেলে পরবর্তী ধাপে যাবেন।

এবার তিনি আগের অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। এখানে সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনলাইনে আগের অপারেটর থেকে ‘ক্লিয়ারেন্স’ চাওয়া হবে। ছাড়পত্র মিললে এমএনপি অপারেটর, মানে যার মাধ্যমে এই স্থানান্তর হবে সেখানে নম্বরটি সংযোগ বা পোর্টিং করার অনুরোধ পাঠানো হবে। এমএনপি অপারেটর এটি আবার গ্রাহক যে অপারেটর ছাড়তে চাইছে ছাড়পত্রের জন্য সেখানে পাঠাবে। ছাড়পত্র মিললে গ্রাহকসেবা প্রতিনিধি অপারেটরের একটি সিম দেবেন। এরপর এমএনপি অপারেটর গ্রাহকের আগের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে নতুন নেটওয়ার্কে গ্রাহকের সংযোগ চালু করতে বলবে।

এমএনপি অপারেটর ইনফোজিলিয়ন টেলিটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাবরুর হোসেইন জানান, এমএনপি গাইডলাইন অনুয়ায়ী কোনো গ্রাহক এই সেবা নিতে চাইলে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাকে সেবা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এমএনপি চালুর পর আমরা দেখছি কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি কাজ শুরুর পর পুরো প্রক্রিয়া শেষে গ্রাহকের নতুন সিম পেতে এবং নতুন নেটওয়ার্কে সংযোগ সচল হতে লাগছে মাত্র ১০ হতে ১৫ মিনিট। সব মিলে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে সেবাটি গ্রাহককে দেওয়া সম্ভব।

গাইডলাইন অনুযায়ী গ্রাহক একবার এমএনপি সেবা নিলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে আর সেবাটি পাবে না, মানে নতুন আসা অপারেটর থেকে এই সময়ের মধ্যে আর কোথাও যেতে পারবে না।

 

কত খরচ?

সেবাটির আনুষ্ঠানিক চার্জ ভ্যাটসহ সাড়ে ৫৭ টাকা। সঙ্গে সিম পরিবর্তন কর হিসেবে রাজস্ব বোর্ড পায় সিমপ্রতি ১০০ টাকা। এই টাকাটাও গ্রাহকের কাছ থেকে নিচ্ছে অপারেটরগুলো। হিসাবে সব মিলে ১৫৭ টাকা ৫০ পয়সা হলেও অপারেটররা ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা নিচ্ছে।

কেউ জরুরি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেবাটি পেতে চাইলে দিতে হবে বাড়তি ১০০ টাকা। এখানেও ১৫ শতাংশ কর রয়েছে। তখন মোট খরচ ২৭২ টাকা ৫০ পয়সা। তবে প্রিপেইড গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সেবাটি এমনিতেই ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে দেওয়া যাচ্ছে। তাই এই গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ‘জরুরি ফি’ প্রয়োজন হবে না বলে জানিয়েছেন ইনফোজিলিয়ন টেলিটেক সূত্র। 

এদিকে বিটিআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহুরুল হক বলেছেন, এমএনপির জন্য গ্রাহককে এখন যে টাকা দিতে হচ্ছে, ধীরে ধীরে তা কমানো হবে।

 

নাও মিলতে পারে!

কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলোর একটি থাকলে গ্রাহক এমএনপি সুবিধা পাবেন না।

❏ গ্রাহক যে অপারেটর ছাড়তে চাইছেন সে অপারেটরের কাছে কোনো বকেয়া থাকলে।

❏ ছাড়তে চাওয়া অপারেটরের সঙ্গে কোনো চুক্তিভিত্তিক লেনদেন, যেমন অপারেটরগুলোর বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে কিস্তিতে হ্যান্ডসেট কিনেছেন সেখানে কিস্তি বাকি, পোস্টপেইডে বিল বকেয়া ও ইমার্জেন্সি ব্যালান্স অপরিশোধিত রয়েছে এমন পরিস্থিতিতে।

❏ গ্রামীণফোনের জিপে ও রবির রবিক্যাশ ওয়ালেটে গ্রাহকের নিয়ম অনুযায়ী ব্যালান্স না থাকলে।

❏ কারিগরি কোনো কারণ, যেমন ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ না হওয়ার মতো বিষয়, ভুল নম্বর পোর্টিং।

❏ এমএনপিতে পোস্টপেইড থেকে প্রিপেইড বা প্রিপেইড থেকে পোস্টপেইডে যেতে পারবেন না গ্রাহক। 

 

না পেলে সমাধান কী?

যে অপারেটর ছাড়তে চাইছেন সে অপারেটরের ইমার্জেন্সি ব্যালান্স পাওনা, পোস্টপেইড বিলসহ সব লেনদেন মিটিয়ে দিন। মূলত এই পাওনার জন্যই আপনি সেবাটি পাবেন না।

গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশন সৈয়দ তালাত কামাল কালের কণ্ঠ’কে বলেন, বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রামীণফোনের জিপের ওয়ালেটে গ্রাহকদের ব্যালান্স শূন্য থাকলে তারা এমএনপি সেবা নিতে পারবেন। আর শূন্যের অধিক ব্যালান্স থাকলে গ্রাহক পাওনা ত্যাগ করে ১ নভেম্বর থেকে সেবাটি নিতে পারবেন।

রবি জানিয়েছে, গ্রাহক রবিক্যাশে থাকা ব্যালান্স ব্যবহার করে শূন্যে এনে এমএনপি সেবা নিতে পারেন। অথবা ব্যালান্স থাকলে সেটির বিষয়ে একটি ডিক্লারেশন দিয়ে গ্রাহক সেবাটি গ্রহণ করতে পারবেন। গ্রাহক যদি জিপে বা রবিক্যাশে ব্যালান্স রেখে ডিক্লারেশন দিয়ে এমএনপি সেবা নেন সে ক্ষেত্রে ছেড়ে যাওয়া অপারেটরে দুই বছরের মধ্যে ফিরে এলে ওই ব্যালান্স ফেরত পাওয়া যাবে। দুই বছর পেরিয়ে গেলে সে অর্থ সরকারের কোষাগারে চলে যাবে।

 

অভিযোগের জায়গা কোথায়?

এমএনপি অপারেটর ইনফোজিলিয়ন টেলিটেকের সিইও লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, এমএনপি বিষয়ে সমস্যায় পড়লে গ্রাহক প্রথমে মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে যোগাযোগ করবে। এ ছাড়া ইনফোজিলিয়ন টেলিটেকের ওয়েবসাইটে (https://infotelebd. com/faq/) এ বিষয়ে ২৪টি প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা নিয়ে তৈরি একটি ভিডিও টিউটরিয়াল রয়েছে। এর পরও সমস্যায় পড়লে রহভড়—রহভড়ঃবষবনফ.পড়স মেইলে বিস্তারিত জানাতে পারেন। তিনি বলেন, নতুন ধরনের কার্যক্রম হওয়ায় শুরুতে কিছু সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক। তবে কিছুদিন পর কারিগরি এসব সমস্যা একদমই থাকবে না। তখন গ্রাহকের সমস্যা কমে আসবে। এ ছাড়া বিটিআরসির শর্টকোড ১০০ নম্বরে কল করে এবং consumer.inquiries@btrc.gov.bd  মেইল ঠিকানায়ও অভিযোগ দিতে পারবেন গ্রাহক।

 

এমএনপি চালুর পর যা ঘটেছে

১ অক্টোবর চালুর পর প্রথম পাঁচ দিনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিটিআরসি। এতে দেখা যায়, এমএনপির আবেদন করে অপারেটর বদলাতে পারেননি অর্ধেকেরও বেশি গ্রাহক। এই সময়ে আবেদন করেছে ১০ হাজার ১২২ জন। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৮৬২ জন সেবা পাননি। অপারেটর বদলাতে পেরেছেন চার হাজার ১৮১ জন। আর আবেদন করে অপেক্ষায় আছেন ৭৯ জন।

সবচেয়ে বেশি গ্রাহক চলে যেতে চাইছেন গ্রামীণফোন থেকে। তাঁদের চার হাজার ৬১৬ জন গ্রাহক চলে যাওয়ার আবেদন করেছেন। তবে যেতে পেরেছেন এক হাজার ৮৩৪ জন। বিপরীতে এসেছেন ৬৮২ জন। রবিতে এসেছেন দুই হাজার ৩৪১ এবং চলে গেছেন ৯৭২ জন। বাংলালিংকে এসেছেন এক হাজার ৮৯ এবং গেছেন এক হাজার ২৭৬ জন। টেলিটকে পেয়েছে ৮৯ জন। অপারেটরটি ছেড়েছে ১৩০ জন গ্রাহক।

 

সময় লাগল এক দশক

২০১৭ সালের নভেম্বরে বিটিআরসি ইনফোজিলিয়ন টেলিটেক বিডিকে এমএনপি সেবা চালুর লাইসেন্স দেয়। তবে সেবাটি চালুর প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ১০ বছর আগে, ২০০৮ সালে। এরপর ২০১৪ সালে বিটিআরসি এসংক্রান্ত নীতিমালা করে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর চলতি বছরের অক্টোবরের প্রথম দিন থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে এই সেবা দিতে শুরু করেছে অপারেটরগুলো।

বর্তমানে বিশ্বের ৭২টি দেশে এমএনপি সেবা চালু রয়েছে। পাশের দেশ ভারতে এই সেবা চালু হয় ২০১১ সালে। আর পাকিস্তানে চালু হয়েছে ২০০৭ সালে।



মন্তব্য