kalerkantho


বাংলাদেশের চোখও ফাইভজিতে!

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশের চোখও ফাইভজিতে!

দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে একদমই পাল্টে দেবে ফাইভজি প্রযুক্তি। ওয়ান থেকে ফোরজি পর্যন্ত এত দিন যে ধরনের প্রযুক্তি আমরা দেখেছি এর সঙ্গে কোনো মিলই থাকবে না ফাইভজির। বলা হচ্ছে, এই প্রযুক্তিতে যুক্ত হলে দেখা যাবে নতুন এক পৃথিবীকে। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে উন্নত বিশ্বের কয়েকটি দেশ ফাইভজি চালু করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে চায় না বাংলাদেশও। তাই বিটিআরসির সহায়তায় বুধবার ঢাকায় প্রথমবারের মতো ফাইভজি পরীক্ষা করবে হুয়াওয়ে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আল-আমীন দেওয়ান

 

টুজি নেটওয়ার্কে খুব অল্প পরিসরে ইন্টারনেট ডেটা সংযোগ পাওয়া যেত। ভয়েস কলে যোগাযোগের সঙ্গে টেক্সট মেসেজই ছিল মূলকথা। এ অবস্থা বদলে দিল থ্রিজি। লাইভ ভিডিও কল, মোবাইল থেকেই বাজার করা, ডাক্তার দেখানো, টিকিট কাটা, বিল পরিশোধসহ নিত্য জীবনের অনেক কাজ শুরু হলো থ্রিজি ব্যবহার করে। প্রতিষ্ঠিত হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’ নামের নতুন খাত ও ধারা।

এরপর ফোরজি এসে আমাদের নিয়ে গেল ইন্টারনেটের সুপার হাইওয়েতে। ফোরজিতে গতি ১০০ এমবিপিএস  থেকে ১ জিবিপিএসও হতে পারে। যদিও বাংলাদেশে ফোরজির গতি ৭ এমবিপিএস ঠিক করে দেওয়া।

থ্রিজিতে দুই জিবির এইচডি মুভি ডাউনলোড হতে যেখানে লাগত ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট সময়, ফোরজি এসে সময় কমিয়ে আনল তিন মিনিটে। সবার মনে তাই স্বাভাবিক প্রশ্ন—ফাইভজি হলে কী লাভ হবে?

 

ফাইভজির পরীক্ষা-নিরীক্ষা

২০১৮ সালের শেষে দিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো ফাইভজি প্রকল্পের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর কথা রয়েছে। মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে অপারেটর টি-মোবাইল ও স্প্রিন্ট ফাইভজি নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত হতে যাওয়া শহরগুলোর নাম প্রকাশ করেছে। স্প্রিন্টের ফাইভজি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকবে শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, আটলান্টা, ওয়াশিংটন ডিসি ও হিউস্টন। টি-মোবাইল ফাইভজি নেটওয়ার্ক চালু করবে নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, লাস ভেগাস ও ডালাসে। শুরুতে ৩০টি শহরে ফাইভজি চালুর লক্ষ্য তাদের।

২০১৯ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং ২০২০ সালে চীনে এ প্রযুক্তি চালুর সম্ভাবনা প্রবল।

এদিকে পর্তুগালে ফাইভজি নেটওয়ার্ক চালুর জন্য কাজ করে যাচ্ছে অলটিস ও হুয়াওয়ে। সম্প্রতি লিসবনে সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ গিগাবাইট গতিসম্পন্ন হুয়াওয়ের রাউটার ব্যবহার করে ফাইভজির প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। দেশটির ব্যবহারকারীরা ২০২১ বা ২০২২ সাল নাগাদ ফাইভজির আওতায় আসবে।

চলতি বছরের শেষ দিকে ইংল্যান্ডের বড় ১০ শহরের সাতটিতে ফাইভজি মোবাইল নেটওয়ার্ক পরীক্ষা শুরু করবে ভোডাফোন।

ইতালির টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এজিকম জানিয়েছে, সরকার সেপ্টেম্বরে ফাইভজি মোবাইল সার্ভিস চালুর জন্য তরঙ্গের নিলাম আয়োজন করবে।

২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফাইভজি বাজার হওয়ার আশা করছে চীন। এ সময়ের মধ্যে ৪৩ কোটি ফাইভজি সংযোগ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন বা জিএসএমএ এবং গ্লোবাল টিডি-এলটিই ইনিশিয়েটিভ বা জিটিআইয়ের প্রতিবেদন মতে, সংখ্যাটা বৈশ্বিক মোট সংযোগের এক-তৃতীয়াংশ।

 

ফাইভজিতে বিশ্বের ভবিষ্যৎ!

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফাইভজি প্রযুক্তি দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে একদমই পাল্টে দেবে। এমন কিছু ঘটতে চলেছে, যা হয়তো কল্পনাকেও হার মানাবে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ি চালানো, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি, স্মার্ট সিটি ও  নেটওয়ার্ক যুক্ত রোবটের খরবদারি এমন অনেক কিছু। নতুন করে ভাবতে হতে পারে প্রচলিত আইন-কানুন, নগর পরিচালনা এমনকি রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়েও।

চলতি বছরেই ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হাজার কোটি নিরাপদ সংযোগ তাত্ক্ষণিকভাবে গড়তে পারবে ফাইভজি প্রযুক্তি। বড় প্রভাব পড়বে পরিবহন, স্বাস্থ্য, জরুরি সেবা, উৎপাদন ও বিতরণ ক্ষেত্রে। পুরো অর্থনীতির মোড় আর সামাজিক ব্যবস্থা পাল্টে ফেলার মতো প্রযুক্তি এটি।

অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ফাইভজির প্রভাবে আসা নতুন পণ্য ও সেবার মূল্য হবে ১২ লাখ কোটি ডলার। ফাইভজির অগ্রগতির ফলে মোবাইল নেটওয়ার্ক মানুষের সঙ্গে শুধু মানুষ ও তথ্যের সংযোগের বদলে মানুষের সঙ্গে প্রতিটি জিনিসের সংযোগ তৈরি হবে।

 

আছে ঝুঁকিও

প্রযুক্তিগত উন্নয়নের যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে এই প্রযুক্তি, তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে উল্টো নানা বিপদের মধ্যে পড়তে হবে। খ্যাতনামা কনসালট্যান্সি ফার্ম ম্যাকিনসি  গ্লোবাল ইনস্টিটিউট বলছে,  রোবটের কারণে ২০৩০ সাল নাগাদ ৪৬টি দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারাবে। এতে বিশ্বজুড়ে পাঁচ ভাগের এক ভাগ চাকরিজীবী মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বের ৮০ কোটি মানুষের চাকরি দখল করে নেবে রোবট।

 

বাংলাদেশ যা ভাবছে

থ্রিজি বা ফোরজি প্রযুক্তির পথে বিশ্বের সঙ্গে সমানতালে না থাকতে পারলেও এবার ফাইভজি প্রযুক্তিতে উন্নত বিশ্বের সঙ্গেই পথ চলতে চায় বাংলাদেশ। ‘ফাইভজির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এবার প্রযুক্তিবিশ্বের সর্বাধুনিক উন্নয়নের সঙ্গে সমানতালেই পথ চলবে বাংলাদেশ’—কালের কণ্ঠ’কে বলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

ইন্টারনেট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বিডিনগ বোর্ড অব ট্রাস্টি সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘যেহেতু বিশ্বের সর্বাধুনিক এই প্রযুক্তি এখনো কোথাও চালু হয়নি তাই বাংলাদেশের কাছে এখনো কোনো মডেল নেই। তাই প্রস্তুতি শুরুর জন্য জানতে হবে কেমন করে প্রস্তুতি নিতে হবে।’

আর তা জানতেই এই ২৫ জুলাই বাংলাদেশে ফাইভজি প্রযুক্তির পরীক্ষা করছে সরকার। এতে বিশ্বের যে অল্প কয়েকটি দেশে এই পরীক্ষা হয়েছে সে তালিকায় ঢুকে যাবে বাংলাদেশ। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে চীনা প্রযুক্তি কম্পানি হুয়াওয়ে এ পরীক্ষা চালাবে। এ ক্ষেত্রে সহায়তা দেবে দুই মোবাইল ফোন অপারেটর রবি ও টেলিটক।

ফাইভজির পরীক্ষা চালাতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) হুয়াওয়েকে এক সপ্তাহের জন্য প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম বরাদ্দ দিয়েছে।

ইতিমধ্যে চীন থেকে হুয়াওয়ে প্রযুক্তি এনে পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে।

 

হচ্ছে ফাইভজি সামিট

ফাইভজি পরীক্ষার একই দিনে এবং একই মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ ফাইভজি সামিট। ফাইভজি গবেষণা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে থাকা একটি কম্পানির শীর্ষ প্রকৌশলীরা এই সামিটে বিস্তারিত তুলে ধরবেন। অংশ নেবেন খাতসংশ্লিষ্টরা। 

মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আমরা ফোরজিতে যখন গিয়েছি তখন চিন্তা করেছি গড়ে এর গতি হবে ৪ থেকে ২০ এমবিপিএস। আর ফাইভজির গতি হবে ৪ জিবিপিএস থেকে ২০ জিবিপিএস। পরিবর্তনটা এতটাই ব্যাপক যে কারো পক্ষে ধারণা করাও কঠিন। ফাইভজির সঙ্গে যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আওটি বা রোবটিক্স কিংবা বিগ ডেটা এ রকম বিষয়গুলো একদম জড়িত হয়ে যাবে তখন আমাদের সমাজ কাঠামো হতে প্রযুক্তি চিন্তার সঙ্গে এসবের সমন্বয় করতে না পারলে আমরা হুট করে এমন যুগে গিয়ে পড়ব যে যুগে খাপ খাওয়াতে পারব না। সামিটের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ফাইভজি প্রযুক্তি কী সেটা স্বচক্ষে দেখা, পরীক্ষা করা এবং ফাইভজির যে সুবিধা পাওয়া যাবে সে সম্পর্কে ধারণা নেওয়া।

 

লক্ষ্য ২০২১

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং দেশের টেলিকম খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পঞ্চম প্রজন্মের প্রযুক্তিসেবা ব্যবহারে আরো অন্তত চার-পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতের সঙ্গে সরকারের লক্ষ্যেরও খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না। সরকার দেশে ফাইভজি চালুর লক্ষ্য ঠিক করেছে ২০২১ সালে। সে সময় নাগাদ দেশে ফাইভজি চালুর জন্য অবকাঠামো দাঁড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন মোস্তাফা জব্বার।

 

কী হবে ফাইভজি হলে!

প্রযুক্তিবিদরা ধারণা দিতে গিয়ে বলছেন, ফাইভজির সময়ে নতুন এমন পৃথিবীকে দেখবেন আপনি যেখানে শুধু সব মানুষ-মানুষে নয়, বিশ্বের সব যন্ত্রপাতিও একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। যেমন—গাড়ি সংযুক্ত হবে রাস্তার আর চালকের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে, ডাক্তাররা সংযুক্ত হবে রোগীদের শরীরে স্থাপন করা মেডিক্যাল ডিভাইসের সঙ্গে, অগমেন্টেড রিয়ালিটির মাধ্যমে যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে থেকেই যা ইচ্ছে দেখে-শুনে কিনে ফেলতে পারছেন, বাসার দরজা-জানালা, ফ্রিজ-ওয়াশিং মেশিন, টিভি, এসি—সব চলবে মুখের কথায়! রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত হবে রোবটের আরেক দুনিয়া।

যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষকদল বলছে, ফাইভজিতে একজন চিকিৎসক ভার্চুয়াল রিয়ালিটির সরঞ্জাম ও হ্যাপটিক গ্লাভস পরে রোগী থেকে দূরে অবস্থান করেও প্রেশার মাপতে পারবেন। রোবট বা ডিভাইসে কোনো রকম বিঘ্ন ছাড়াই রিমোট সার্জারি সম্ভব হবে। গ্লাভস থেকেই চিকিৎসকরা পেয়ে যাবেন প্রয়োজনীয় তথ্য। ফাইভজির গতি ২০ জিবিপিএসও ছাড়িয়ে যাবে বলেই এসব সম্ভব হবে।



মন্তব্য