kalerkantho


পোশাকশিল্পের বন্ধুঅ্যাপ ‘কুটুম্বিতা’

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পোশাকশিল্পের বন্ধুঅ্যাপ ‘কুটুম্বিতা’

কর্মবিরতি, বিক্ষোভ, ধর্মঘট, লিঙ্গবৈষম্য, যৌন হয়রানি। আছে কর্মী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে দূরত্ব ও সমন্বয়হীনতা। দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত পোশাকশিল্পের এমন সব অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় বিদায় করে সব স্তরের কর্মীদের মধ্যে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে তৈরি হয়েছে মোবাইল অ্যাপ—কুটুম্বিতা। এরই মধ্যে অ্যাপটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। সুফলও পাচ্ছে অনেকে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মুহম্মদ খান

 

প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অনেক কৌশলই হাতে নেয় কর্তৃপক্ষ। এসব কৌশল তৈরির সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ কর্মীদের মতামত নেওয়া হয় না। তাই কর্মীদের প্রত্যাশা ও উদ্দীপনার বিষয়-আশয় নিয়ে অন্ধকারে থাকেন পরিচালক পর্ষদের কর্তাব্যক্তিরা। একেবারে নিম্নস্তরের কর্মীদের জন্য পরিচালনা পর্ষদের কাছে পৌঁছানোও প্রায় অসম্ভব। পোশাকশিল্পের কর্মীদের জন্য এই বাস্তবতা আরো কঠিন। যোগাযোগের এই ঘাটতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুই পক্ষই। নানা সমস্যায় জর্জরিত কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্ত থাকেন না বলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হয় না। এতে ক্ষতির মুখে পড়ে মালিকপক্ষও। মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেও তারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ছুঁতে হিমশিম খায়। এ সমস্যার সমাধান দিতেই তৈরি হয়েছে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ‘কুটুম্বিতা’।

 

কুটুম্বিতা কী

সহজ যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণে কার্যকর অ্যাপ কুটুম্বিতা। এটি কর্মী ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এক সুতায় গেঁথে দেয়।কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের অধিকারসংক্রান্ত তথ্য, বিপদে সতর্কতা সংকেত পাঠানো, কর্মতালিকা যাচাই, কর্মঘণ্টা, কারখানা-অফিস বন্ধ-খোলার তথ্য ছাড়াও কর্মস্থল ও কর্মীর প্রয়োজনীয় প্রায় সব তথ্য ও যোগাযোগের উপায় রয়েছে এই অ্যাপে।

 

কিভাবে কাজ করে

ভিজ্যুয়াল ইন্টারফেসের কারণে সব ধরনের কর্মীদের কাছে কুটুম্বিতা সহজ ব্যবহারযোগ্য একটি অ্যাপ। ড্যাশ বোর্ডের মাধ্যমে অ্যাপটি সহজেই চালানো যায়। স্বল্পশিক্ষিত কর্মীরাও অ্যাপটির মাধ্যমে কারখানার উচ্চপর্যায়ে তাদের দাবি বা অভিযোগ তুলে ধরতে পারে। অ্যাপটি এনক্রিপ্টেড পদ্ধতিতে কাজ করে, তাই কে কোন তথ্য পাঠাচ্ছে তা চাইলে গোপনও রাখা যায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নকশায় তৈরি করা হয়েছে এর ডাটা সেন্টার এবং নেটওয়ার্ক অবকাঠামো। ফলে কোনো কর্তা চাইলেও অভিযোগকারীর প্রতি বিরাগভাজন হয়ে তাকে হেনস্তা করতে পারবেন না।

 

কী আছে অ্যাপে

কাজকে কর্মী ও কর্তাদের কাছে আনন্দময় করে তুলতে কুটুম্বিতা অ্যাপটির মধ্যে কারখানা কর্মযজ্ঞে নিয়োজিতদের প্রফাইল, তাদের দৈনন্দিন কাজে সহায়ক সব তথ্য রয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য ছাড়াও এতে কর্মীর ব্যাংক হিসাব, এমনটি শারীরিক অবস্থার নানা তথ্যও থাকে।

দিনপঞ্জি : আছে ছুটির দিনগুলোর হালনাগাদ করার সহজ আয়োজন।

নিউজফিড : অ্যাপের মাধ্যমে কারখানার সব কার্যক্রমই স্ক্রিনে দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ব্রেকিং নিউজের মতো বিশেষভাবে উপস্থাপন করা হয়।

নির্দেশিকা : এখানে রয়েছে কারখানাকর্মীদের অধিকার ও দায়িত্ব, শ্রম আইন, অগ্নি ও নিরাপত্তা বিধিমালা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সহায়ক নির্দেশনা।

ডিজিটাল নোটিশ : অ্যাপের মাধ্যমে দাপ্তরিক নোটিশ কিংবা জরুরি বার্তা একযোগে পৌঁছে যাবে সব কর্মীর কাছে।

কণ্ঠস্বর : এই ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বরাবর তাদের অধিকার ও অসন্তোষের কথা প্রকাশ করতে পারে। কর্মীরা প্রয়োজনে প্রমাণ হিসেবে ছবি, ভিডিও ফুটেজসহ সরাসরি শীর্ষ কর্তাদের কাছে অভিযোগ করতে পারে।

কাজ : ছুটির আবেদন, মজুরিসহ আর্থিক লেনদেন বিষয়াদিও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

জরিপ : কর্মপরিবেশ নিয়ে কর্মীদের মতামত জানতে জরিপ করার সুযোগ রয়েছে অ্যাপটিতে।

 

বাংলাদেশের ‘কুটুম্বিতা’

কুটুম্বিতার আনুষ্ঠানিক সদর দপ্তর সিঙ্গাপুরে হলেও মূল কর্মক্ষেত্র বাংলাদেশ। এখানে কুটুম্বিতার সার্বিক কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে আছেন কান্ট্রি ব্যবস্থাপক শাহরিয়ার রহমান। তিনি বললেন, সাসটেইনেবল অ্যাপারেল কোয়ালিশনের ‘হিগস ইনডেক্স’ আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মানদণ্ড মাথায় রেখে অ্যাপটি তৈরি করেছি আমরা। তাই অ্যাপটি ব্যবহার করলে পোশাক কারখানাগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে সুবিধা হবে। স্কোরও বেড়ে যাবে অনেকাংশে। তাই তৈরি পোশাকশিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠানই অ্যাপটি ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

তিনি বলেন, কর্মীদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে ও কারখানা পরিচালনার খরচ কমাতে কার্যকর অ্যাপ এটি। কুটুম্বিতার মিশন হলো তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে এমন এক মেলবন্ধন রচনা করা, যাতে কর্মীরা সন্তুষ্টি ও নিরাপদ কর্ম পরিবেশে কাজ করতে পারে।

স্প্ল্যাশ, নেক্সট ওয়েবসহ উদ্যোক্তাদের নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অ্যাপটি সুনাম কুড়িয়েছে বলেও জানালেন তিনি।

 

ছোট অ্যাপে বড় কাজ

আকারে ছোট হলেও কুটুম্বিতা অ্যাপটির কাজের ব্যাপ্তি অনেক বড়। সার্বিকভাবে কারখানাকে অটোমেশনের আওতায় নিয়ে এসেছে অ্যাপটি। যেমন অ্যাপটি ব্যবহারে কাগজ অপচয় কমছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ চলায় জনবলের কর্মঘণ্টার অপচয়ও কম হচ্ছে। অ্যাপটি সার্বিকভাবে ৪ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পরিচালন ব্যয় কমাতে সক্ষম বলে উদ্যোক্তারা দাবি করেন।

 

শুরু হয়েছে ব্যবহার

বর্তমানে তিনটি কারখানায় এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর একটি—এসকিউ সেলসিয়াস। কারখানাটির মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক ওয়ারিসুল আবিদ জানান, কুটুম্বিতার মাধ্যমে আমরা কর্মীদের কাছে সহজেই যেকোনো তথ্য পৌঁছে দিতে পারছি। তাদের অভাব-অভিযোগগুলো নিয়ে সরাসরি কাজ করতে পারছি।

একই প্রতিষ্ঠানে ‘কাটার’ হিসেবে কর্মরত তফায়েল আহমেদ জানান, কুটুম্বিতা থাকার জন্য তাকে আর কাজ ফেলে ছুটির আবেদন নিয়ে বারবার সইয়ের জন্য যেতে হচ্ছে না। এতে বাঁচছে সময়, কাজে ঘটছে না কোনো ব্যাঘাত। সেলিমা বানু কাজ করছেন প্রায় দুই বছর একই ফ্যাক্টরিতে। তিনি জানালেন, কোনো সমস্যার অভিযোগ করলে কুটুম্বিতার মাধ্যমে সমাধান মিলছে সহজেই।

অ্যাপটির করিৎকর্মা গুণে মুগ্ধ হয়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউনিসেফসহ বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা। কুটুম্বিতা থেকে তারা বাংলাদেশে কারখানার কর্মপরিবেশ সম্পর্কে তথ্য নিচ্ছে। স্বল্প আয়ের পোশাকশ্রমিকরা যেন সহজেই কুটুম্বিতা অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারে, এ জন্য অ্যাপের সঙ্গে স্মার্টফোন সুবিধাও চালু করেছে কুটুম্বিতা বাংলাদেশ লিমিটেড। সাড়ে চার হাজার থেকে ছয় হাজার টাকায় আইটেল এবং আট হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় এলজি স্মার্টফোন সরবরাহ করছে তারা। স্মার্টফোন কিনতে কিস্তি সুবিধাও চালু করা হয়েছে।

আবার নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগের জন্য মোবাইল অপারেটর রবির সঙ্গে মিতালি করেছে কুটুম্বিতা। কারখানার জনবহুল স্থানে কিওস ব্যবহার করে কর্মীদের স্বতন্ত্র অ্যাকাউন্টে এই অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগও করে দেওয়া হয়েছে।

অ্যাপটির বিষয়ে এরই মধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশের বাইরের বেশ কিছু শ্রমঘন পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠানও। এরই মধ্যে স্টেটটাইমস, ফ্রান্সের সবচেয়ে পুরনো পত্রিকা লেফিগারো, চেকরিপাবলিকের রেস্পেক্টসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রশংসিত হয়েছে অ্যাপটি।

ডাউনলোড লিংক : https://play.google.com/store/apps/details?id=com.kutumbita.kutumbita


মন্তব্য