kalerkantho


ফোরজি কি দূরের তারা!

অপারেটরগুলো বেশ কিছুদিন আগে থেকে ফোরজি সিম বিক্রি শুরু করলেও এখনো চালু হয়নি ফোরজি। আটকে আছে কোথায়? আমরাই বা কতটা প্রস্তুত? এ নিয়ে লিখেছেন আল-আমিন দেওয়ান

১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ফোরজি কি দূরের তারা!

মডেল : মাহিয়া ছবি : তারেক আজিজ নিশক

ফোরজি স্বপ্নের শুরু এবং সরকারের প্রস্তুতি

১৬ কোটি মানুষের দেশে মোবাইল ব্যবহারকারী ১৪ কোটি। এ সংখ্যাই বলে দিচ্ছে টেলিযোগাযোগ খাতের নেটওয়ার্ক উন্নয়নের গুরুত্বের কথা।

এ বিবেচনায়ই থ্রিজির পর আরেক ধাপ উন্নয়নের তাগিদ দেখা গেছে নীতিনির্ধারকমহলেও। ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ফোরজি আনার কথা প্রথম বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘থ্রিজি আনা আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। আবার ক্ষমতায় এলে ফোরজি আনা হবে। ’

২০১৪ সালে ক্ষমতায় এলেও ফোরজি নিয়ে টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) তোড়জোড় শুরু করে ২০১৬ সালে এসে। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়।

জুনে খসড়া নীতিমালা সরকারের অনুমোদনের জন্য টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়।

 

অপারেটরগুলোর কারিগরি প্রস্তুতি

নীতিনির্ধারকমহলের তোড়জোড়ে অপারেটরগুলোও তাদের নেটওয়ার্ক ফোরজিতে উন্নয়নের কাজে হাত দেয়। দুই প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ও এরিকসন অপারেটরগুলোর ফোরজি নেটওয়ার্ক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়।

ফোরজি সেবার গতিও সফলতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হয়। ২০১৭ সালের শুরু থেকেই অপারেটরগুলো সিম ফোরজিতে রূপান্তরের কাজ শুরু করে। ফেব্রুয়ারি থেকে রবি গ্রাহকদের সিম ফোরজিতে রূপান্তরের কাজ শুরু করে। রবির সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর আরেক অপারেটর এয়ারটেল সিম ফোরজিতে রূপান্তরের কাজ শুরু করে আগস্টে। এর মাঝে জুলাইয়ে শুরু করে গ্রামীণফোন।

 

গোল বেধেছে যেখানে

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে মতামত নিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ওয়েবসাইটে ফোরজি নীতিমালা উন্মুক্ত করা হয়। বেশ কিছু বিষয়ে সংশোধন চায় অপারেটরগুলো।

প্রথম দফা সংশোধনে ফোরজির লাইসেন্স ফি ১৫ কোটি থেকে কমিয়ে ১০ কোটি টাকা করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়ন ফি সাত কোটি থেকে কমিয়ে করা হয় পাঁচ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ফোরজি গাইডলাইনে অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, গাইডলাইন চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় ৯০ দিনের মধ্যে নিলামের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু চূড়ান্ত গাইডলাইনে উল্লেখ করা স্পেকট্রাম ফি, গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণ সময়কাল, ব্যাংকঋণ ও বিনিয়োগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলসহ ২৩ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের কাছে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায় মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো।

তবে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন হয়ে যাওয়ায় অপারেটরগুলোর আপত্তি খুব বেশি আমলে নিতে চায়নি বিটিআরসি। সমাধানে এগিয়ে আসেন সজীব ওয়াজেদ। ১৮ অক্টোবর সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠকে ২৩টির মধ্যে স্পেকট্রাম ফি ছাড়া ২২টির সমাধান করার উদ্যোগ নেন তিনি।

 

এর পরও থেমে থেমে

৩০ অক্টোবর বিটিআরসি মোবাইল অপারেটরগুলোর সঙ্গে ফোরজির অগ্রগতি নিয়ে বৈঠক করে। পরে স্পেকট্রাম ফি কমিয়ে প্রতি মেগাহার্জ ৪০ লাখ ডলার ধরে ৭ নভেম্বর সর্বশেষ সংশোধিত নীতিমালা টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়। এরপর বিভাগ এটি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠাবে।

 

এ বছর কি দেখা মিলবে?

ফোরজি নীতিমালাটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘুরে অর্থ মন্ত্রণালয় হয়ে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। এ ছাড়া নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পরও অন্তত ৪৫ দিন লাগবে তরঙ্গের নিলাম করাসহ এই প্রক্রিয়া শেষ হতে।

তাহলে কি ফোরজির জন্য অপেক্ষা আরেকটু দীর্ঘায়িত হয়ে ২০১৭ সালও ফুরিয়ে যাবে!

 

‘ফোরজি’ কী

‘ফোরজি’, ‘ফোর্থ জেনারেশন’ বা ‘চতুর্থ প্রজন্ম’ হলো দ্রুততম সময়ে যোগাযোগে ব্যবহৃত মোবাইল টেলিযোগাযোগ-প্রযুক্তি, যাকে আবার ‘লং টার্ম ইভল্যুশন’ বা ‘এলটিই’ও বলা হয়ে থাকে। এই প্রযুক্তি বর্তমানে বাংলাদেশে চালু থাকা তৃতীয় প্রজন্ম বা থ্রিজির পরের ধাপ।

‘ফোরজি’র আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়ে ‘ফোরজি’ বোঝা যায়। ‘আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন-রেডিও যোগাযোগ’ শাখার ‘ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন অ্যাডভান্সড’ (আইএমটিএ) ফোরজির জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করিয়েছে। সেখানে ‘ফোরজি’ হতে হলে বেশ কয়েকটি যোগ্যতা উতরাতে হয়। আইএমটিএর ওই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটের গতি খুবই দ্রুতগতির হবে। কোনো দ্রুতগতির যানবাহন অর্থাৎ বাস বা ট্রেনে এই সেবার ইন্টারনেট গতি হবে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মেগাবাইট। এ ছাড়া আবাসিক ব্যবহারে বা স্থিরাবস্থায় ‘ফোরজি’ নেটওয়ার্কের গতি হবে প্রতি সেকেন্ডে এক গিগাবাইট।

 

বৈশিষ্ট্য

ফোরজির সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর এ বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন।   প্রথম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে গতি। এ ছাড়া এই প্রযুক্তিতে তথ্য আদান-প্রদান পুরোপুরি ‘ইন্টারনেট প্রটোকল প্যাকেট সুইচ নেটওয়ার্ক’ ভিত্তিক হবে। একই স্পেকট্রাম থেকে সর্বাধিকসংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এর ব্যান্ডউইডথ ন্যূনতম ৫ থেকে ২০ মেগাহার্জ এবং কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ৪০ মেগাহার্জ পর্যন্ত হবে। এ ছাড়া এর ডাউনলিংকের ক্ষেত্রে লিংক স্পেকট্রাল এফিসিয়েন্সি প্রতি সেকেন্ডে ১৫ বিট এবং আপলিংকের ক্ষেত্রে ৬ দশমিক ৭৫   বিট হবে।

 

সুবিধা

ফোরজির মূল সুবিধা এই নেটওয়ার্কে সর্বোচ্চ গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব। বলাই হচ্ছে, এর গতি হবে সর্বনিম্ন ১০০ মেগাবাইট। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে হাই ডেফিনিশন টেলিভিশন ও ভিডিও কনফারেন্সের সুবিধা পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া এই প্রযুক্তিতে গ্রাহক সব সময়ই মোবাইল অনলাইন ব্রডব্যান্ডের আওতায় থাকতে পারবে। ফোরজির মাধ্যমে মোবাইলে কথোপকথন ও তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপত্তা অনেক বেশি ও শক্তিশালী।

এ ছাড়া ফোরজি মোবাইল গ্রাহকদের ভয়েস মেসেজ, মাল্টিমিডিয়া মেসেজ, ফ্যাক্স, অডিও-ভিডিও রেকর্ডিংসহ নানা ধরনের সুবিধা দেয়।

 

ফোরজির সূচনা

বেশির ভাগ উন্নত দেশেই ফোরজি নেটওয়ার্কের ব্যবহার শুরু হয়েছে। যাত্রার শুরু থেকে দুটি ফোরজি স্ট্যান্ডার্ড বাণিজ্যিকভাবে মোবাইলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একটি মোবাইল ‘ওয়াইম্যাক্স’ এবং আরেকটি ‘লং টার্ম ইভল্যুশন’ বা ‘এলটিই’। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ায় চালু হয় ফোরজি। এরপর একটু বড় পরিসরে ২০০৯ সালে স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলে (ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন) অপারেশন শুরু করে এই প্রযুক্তি। এ ছাড়া ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্প্রিন্ট নেক্সটেল মোবাইল ওয়াইম্যাক্স এবং ২০১০ সালে মেট্রো পিসিএস এলটিই সার্ভিস চালু করে।

অবশ্য শুরুতে ফোরজি ইউএসবি মডেমে থাকলেও ২০১০ সালে সর্বপ্রথম ওয়াইম্যাক্স স্মার্টফোন এবং ২০১১ সালে এলটিই স্মার্টফোনে বাজারে আসে। আর এখন প্রায় সব অপারেটিং সিস্টেমচালিত স্মার্টফোনেই এটি ব্যবহার করা যায়।


মন্তব্য