সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তরুণদের গঠনমূলক বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন সোলায়মান সুখন। সমসাময়িক বিষয়ে ভ্লগের (ভিডিও ব্লগ) মাধ্যমে কাজটি করে চলেছেন আট বছর ধরে। ফেইসবুক লাইভ চালুর পর স্মার্টফোন থেকে সরাসরি ভিডিওতে পরামর্শ দেন তিনি। সম্প্রতি নিয়োগ পেয়েছেন সুইডেনভিত্তিক ইনোভেশন ও সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠান জুটবর্গের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দূত হিসেবে। বিস্তারিত লিখেছেন মুহম্মদ খান ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি শুরু করেন সুখন। প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু নিয়ে লিখছেন। সুখনের মতে, ‘অস্থির সমাজ মানুষকে অসহিষ্ণু করে দেয় সহজেই। তাই গ্রহণযোগ্য সহনশীল ভাষায় মতপ্রকাশ করাটাকেই বেছে নিয়েছি কৌশল হিসেবে।’ সুখন মূলত তরুণদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ২০১১ থেকে, ভিডিও ব্লগ শুরু করার পর। আর এ মাধ্যমই খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেছে নৌবাহিনীর এই সাবেক কর্মকর্তাকে। যা নিয়ে কথা বলেন উন্নত বিশ্বে ভিডিও ব্লগিং আগে থেকেই জনপ্রিয় হলেও পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। বলা যায়, সুখনের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ভিডিও ব্লগিং প্রতিষ্ঠা পায় ও বিস্তৃত হয়। ভিডিও ব্লগ আর ফেইসবুক পোস্টগুলোর মাধ্যমে শুরুর দিকে তিনি সামাজিক সমস্যা আর তার সমাধান নিয়ে কথা বলতেন। বিশেষ করে প্রযুক্তি, শিক্ষা, চিকিৎসা, পেশা বাছাইসহ জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো তুলে ধরতেন সহজ করে। স্মার্টফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরা দিয়ে তিন বা চার মিনিট কোনো বিষয় নিয়ে শালীন ভাষায় উপস্থাপন আর মতামত নিয়েই তৈরি হয় তাঁর ভিডিও ব্লগ (https://goo.gl/M6kScG)। প্রাণচঞ্চল প্রকাশভঙ্গির কারণে সব বয়সী মানুষের কাছে দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছেন তিনি। গায়ের রং নিয়ে আমাদের হীনম্মন্যতা কিংবা সিজিপিএকেন্দ্রিক পড়াশোনাও আছে তালিকায়। ২০১২ সালে ‘ইভ টিজিং’-এর বিরুদ্ধে তাঁর আট মিনিটের একটি ভিডিও ব্লগ সারা ফেলে দেশ-বিদেশে। পাবলিক বনাম প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, চলো গ্রামে ফিরে যাই, ব্র্যান্ড ইওর ভিলেজ ইন সোশ্যাল মিডিয়া, কৃষক, গার্মেন্টকর্মী আর প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরাই যে আসল সেলিব্রিটি—এমন অনেক বিষয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন নিয়মিত। অনুপ্রেরণা দেন সামনে এসেও এখন আর ভার্চুয়াল জগতে আটকে নেই সুখনের প্রয়াস। বিভিন্ন শিক্ষা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান ডাকলে চলে যান সশরীরে। কথা বলেন, অনুপ্রেরণা দেন। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড, আইসিটি এক্সপোসহ বিভিন্ন সম্মেলনে হাজার হাজার তরুণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনেন তাঁর অনুপ্রেরণামূলক কথা। সুখন বলেন, ‘কাউকে না কাউকে তো তরুণদের কাছে গিয়ে ওদের ভাষায়, ওদের ভঙ্গিতে জীবনের ভালো-মন্দ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে।’ কোনো রকম সম্মানী ছাড়াই কাজটি করে চলেছেন তিনি। জুটবর্গের সঙ্গে সুইডেনের সংগঠন জুটবর্গ। কাঁচা পাটের তৈরি পণ্যকে বিশ্বে জনপ্রিয় করা তাদের কাজ। এই উদ্যোক্তা সংগঠনটির প্রধান দুই সদস্য এবং সুইডেনের নাগরিক স্থপতি ক্রিস্টিনা অস্তারগ্রেন এবং ভলভো অটোমোটিভ থেকে সদ্য অবসর নেওয়া প্রকৌশলী এলসে মারি মালমেক গত বছর এসেছিলেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সোনালি আঁশের কথা সরেজমিনে জানতেই তাঁদের এই সফর। ঢাকায় এসে তাঁরা অবাক হন পাটপণ্যের ব্যবহারে অপ্রতুলতা দেখে। ঘটনাক্রমে পরিচয় হয় সুখনের সঙ্গে। সব জেনে তাঁদের সঙ্গী হন সুখনও। ভিডিও ব্লগের মাধ্যমে পাটপণ্যের সুফল ছড়িয়ে দিতে থাকেন তিনি। অক্টোবরে সুইডেনে সুখনকে আমন্ত্রণ জানানো হয় জুটবর্গের পক্ষ থেকে। আনুষ্ঠানিকভাবে জুটবর্গের ‘সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাম্বাসাডর’ হিসেবে সম্মানজনক দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। সুখন বলেন, ‘আমার কাজ আরো বেড়ে গেল। এখন আমি বাংলাদেশের সোনালি আঁশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করে যাব।’ সুখ খুঁজে পান তাই! ‘কেন করেন এ কাজ?’ জানতে চাইলে প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়েন। বলেন, ‘‘কেন নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাতে রাজি না। ‘কেন’ চিন্তাটা মানুষকে হিসেবি করে দেয়। আমার মনে হয়েছে—এটা করা উচিত, তাই করছি। এ কাজে সুখ খুঁজে পাই, তাই করি!’’ জানান, স্কুল থেকেই ভালো বিতার্কিক ছিলেন। কথা বলতেন খোলামেলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে পেশাগত জীবনে সফলতা পেয়েছেন। চাকরি করেছেন বাংলালিংক, ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো, এলিট, আমরা টেকনোলজিসহ স্বনামধন্য সব করপোরেট প্রতিষ্ঠানে। নৌবাহিনীতে ছিলেন সাব-লেফটেন্যান্ট হিসেবে। ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে শিখেছেন অনেক কিছু। জীবনকে দেখেছেন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। এসব অভিজ্ঞতাই তিনি তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। ভয় নেই, আছে রোমাঞ্চ! থাইল্যান্ডে গিয়ে স্কাই ডাইভ (ভিডিও লিংক: https://goo.gl/hz9kNz), সিঙ্গাপুরে জেট ব্লেডিং, বুদাপেস্টে কালাশনিকভ রাইফেল ফায়ারিং আর নেপালে গিয়ে বাঞ্জি জাম্প করার ছবি আর ভিডিও আপলোড করে ভার্চুয়াল জগতে আলোড়ন তোলেন সুখন। সংগীত তারকা তাহসানকে সঙ্গে নিয়ে স্কাই ডাইভের প্রচারণায়ও দেখা গেছে তাঁকে। এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘উন্নত দেশের তরুণরা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় হলেও আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশি তরুণরা অনিশ্চয়তায় ভোগে। তারা ভীতু না হলেও অনেক ঘরকুনো স্বভাবের। এই খোলস থেকে তাদের বের করে আনতে চাই। আমি চাই আমাদের তরুণরা হবে প্রাণচঞ্চল, উচ্ছল। যেকোনো জায়গায়ই তারা থাকবে সামনের কাতারে। এই এক্সট্রিম গেইমগুলো যে খুব বেশি বিপজ্জনক নয়; বরং রোমাঞ্চকর, নিজে করেই সবার সামনে তা প্রকাশ করতে চেয়েছি। তাই আকাশ কিংবা সাগরে ঝাঁপ দিয়েও ছড়িয়ে দিয়েছি অসীম ভার্চুয়াল জগতে।’ ফেইসবুক লাইভ বিভিন্ন আনন্দ উদ্যাপনে ফেইসবুক লাইভ ব্যবহার হলেও সুখন প্রযুক্তিটি ব্যবহার করছেন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। গত বছর তাঁর এক করা লাইভ সাড়া জাগিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। কুড়িয়েছেন অকুণ্ঠ সাধুবাদ। ঘটনাটা ফরিদপুরের। স্থানীয় ক্রিকেট কোচ মিঠু আহম্মেদের নবজাতক সন্তান গালিব হায়াত পৃথিবীতে এসেছিল সময়ের আগেই। জন্মের পরপরই স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কয়েক ঘণ্টা পর কবর দিতে নিয়ে যাওয়ার সময় নড়েচড়ে ওঠে গালিব। প্রতিবেশী এক তরুণ ঘটনাটি ফেইসবুকে পোস্ট করে। বিষয়টি জেনে ফেইসবুক লাইভের মাধ্যমে ঘটনাটি সবার নজরে আনেন সুখন। এর পরই আলোড়ন ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এখানেই থেমে থাকেননি সুখন। গালিবকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য নিজ উদ্যোগে বন্ধুদের সহযোগিতায় হেলিকপ্টার পাঠিয়ে ঢাকায় আনার ব্যবস্থাও করেন। শুধু গালিবের ঘটনাই নয়, জটিল অসুখে পড়ে বিপর্যস্ত মা-বাবা, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এ গিয়ে শিশুদের অবস্থা সরাসরি তুলে ধরা, বিপন্নদের জন্য ত্রাণ চেয়ে কিংবা ভালো চাকরির খবরগুলো ছড়িয়ে দিতে ফেইসবুক লাইভ ব্যবহার করেন তিনি।