kalerkantho


‘একটি অনুপ্রেরণাদায়ক ভবন’

২২ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



‘একটি অনুপ্রেরণাদায়ক ভবন’

অ্যাপলের সদর দপ্তরে কাজ করেন ১২ হাজারের মতো কর্মী। এঁদের সবাইকে এক ছাদের নিচে আনতে বিশাল এক ভবন নির্মাণ করছে অ্যাপল।

এই অ্যাপল পার্কে খোলা জায়গাই থাকবে ৮০ শতাংশ। শতভাগ নবায়নযোগ্য শক্তিতে চলবে। ছয় হাজার গাছ থাকবে।   স্পেসশিপের মতো এই পার্কের খুঁটিনাটি নিয়ে লিখেছেন মিজানুর রহমান

 

অ্যাপলের সব কিছুতেই আছে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির তাগিদ। এভাবেই অ্যাপলের কাছ থেকে বিশ্ববাসী পেয়েছে ব্যতিক্রমী সব পণ্য। এমন সৃষ্টিশীল কম্পানির একটি সৃষ্টিশীল কার্যালয় থাকবে না, তা কী করে হয়।

পারিবারিক গ্যারেজে অ্যাপলের কার্যক্রম শুরু করা স্টিভ জবস স্বপ্ন দেখতেন—একদিন বিশ্বের সেরা অফিস হবে তাদের। যেখানে সব কর্মী একসঙ্গে কাজ করতে পারবে। কিন্তু ১২ হাজার কর্মীকে এক ছাদের নিচে আনা সহজ কাজ নয়।

এ ক্ষেত্রে উপায় ছিল দুটি। এক. ওপরের দিকে নির্মাণ অর্থাৎ উঁচু ভবন। এ ক্ষেত্রে এত কর্মীর জন্য শত তলার ওপর ভবনের প্রয়োজন। আরেকটি উচ্চতায় কম কিন্তু আকারে বড় ভবন তৈরি। স্টিভ জবসের কাছে দুটিই একঘেয়ে। তিনি চাইলেন ব্যতিক্রমী কিছু। এই কাজে নরম্যান ফস্টারের ওপর ভরসা রাখলেন তিনি। স্থাপত্যশিল্পে নরম্যান ফস্টারের নামডাক অনেক। হাজার ফুট উঁচু মিলাও ভায়াডাক্টের (ফ্রান্স ও স্পেনের মাঝে রিভার ট্রানের উপত্যকার দুটি পাহাড়ের মাঝে নির্মিত ঝুলন্ত ব্রিজ) নকশা করে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন তিনি।

ভবন নির্মাণের জন্য স্থপতিদের সাধারণত মোকাবেলা করতে হয় বিরূপ জলবায়ু, পরিবেশ ও ভূমির চ্যালেঞ্জ। আর অ্যাপল পার্কের নকশা করতে নরম্যানকে মোকাবেলা করতে হয়েছে কিভাবে পরিবেশকে রক্ষা করে বিশ্বের সেরা অফিস ভবন তৈরি করা যায়। স্টিভ জবস চেয়েছিলেন ‘একটি অনুপ্রেরণাদায়ক ভবন’। যেখান থেকে দূষিত কোনো পদার্থ বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হবে না। এ জন্য অ্যাপল যেকোনো অঙ্কের টাকা খরচ করতে প্রস্তুত। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর নরম্যান এমন একটি নকশা নিয়ে আসেন, যেটির মতো দেখতে আর একটি ভবনও পৃথিবীতে নেই। মাত্র চারতলা উঁচু বৃত্তাকার ভবন এটি। ব্যাস এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং থেকেও বড়। দেখে মনে হয় যেন স্পেসশিপ নেমে এসেছে আকাশ থেকে।

শুরুতে বাজেট ৫০ কোটি ডলার থাকলেও নরম্যানের নকশা অনুযায়ী বানাতে খরচ হবে ৫০০ কোটি ডলার। এটা জেনেও মানা করতে পারেননি জবস। অনুমোদন দিয়ে দিলেন! ভবনটি নির্মাণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়েছে কাচ। বৃত্তাকার ভবনের জন্য প্রয়োজন ছিল বাঁকানো কাচ। বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করেই এই কাচ সরবরাহ করা হয়।

 

স্থান নির্বাচন

মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৬৮ সালে স্টিভ জবসকে একটি পার্টটাইম চাকরি দেন এইচপির প্রতিষ্ঠাতা বিল হিউলেট (হিউলেট প্যাকার্ড)। তখন তাদের অফিস ঠিক এ জায়গাতেই ছিল। পরে এইচপির খারাপ সময়ে জমিটি কিনে নেন স্টিভ জবস। পরে এর সঙ্গে আরো কিছু জমি কেনা হয় অ্যাপলের কার্যালয়ের জন্য।

 

যা থাকছে

মূল ভবনে ফ্লোর স্পেস ২৮ লাখ বর্গফুটের। একসঙ্গে বসতে পারবেন ১২ হাজারের বেশি কর্মী। অফিসের মধ্যেই তাঁদের যাতায়াতের জন্য থাকছে সাইকেলে চলার ব্যবস্থা। পার্কিংয়ে থাকছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার গাড়ি রাখার ব্যবস্থা। পরিবেশ রক্ষার্থে এ বিশাল পার্কিংয়ের স্থানটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মাটির নিচে। এখানে থাকবে তিন শতাধিক গাড়ি চার্জ করার জায়গা। বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহ দিতেই এ ব্যবস্থা।

পাশে আরেকটি ভবনে থাকছে গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ। এই ভবনটি তুলনামূলক ছোট। তবে এটিকে অ্যাপলের ‘মস্তিষ্ক’ বললে ভুল হবে না। এখান থেকেই বের হবে বিশ্ব বদলে দেওয়ার মতো সব আইডিয়া। এ ছাড়া থাকছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, থিয়েটার (যেটিকে স্টিভ জবস থিয়েটার নামে ডাকা হয়) ও এক লাখ বর্গফুটের একটি শরীরচর্চা কেন্দ্র।

 

পরিবেশের সুরক্ষা

পুরো কার্যালয়ে যা বিদ্যুৎ লাগবে তার সবই আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। বৃত্তাকার ভবনটির বিশাল ছাদজুড়ে লাগানো সৌর প্যানেল দিনের বেলায় পুরো কার্যালয়ের চাহিদার ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উত্পন্ন করতে পারবে। বাকি যেটুকু লাগবে সেটি আসবে অ্যাপলের নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎও উৎপাদন হবে প্রাকৃতিক জ্বালানি ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে।

অ্যাপল জায়গাটি কেনার সময় মাত্র ২০ শতাংশ জায়গা ফাঁকা ছিল। বাকি জায়গাজুড়ে ছিল পার্কিং ও ছোট ছোট ভবন। অ্যাপল পার্কের কাজ শেষ হলে ৮০ শতাংশ জায়গাই খোলা থাকবে। এসব জায়গায় লাগানো হবে ছয় হাজারেরও বেশি গাছ।

কী ধরনের গাছ লাগানো হবে সেটি নির্ধারণ করছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ। স্বাভাবিকভাবেই এত বড় কার্যালয় নির্মাণের পর শহরের রাস্তার পর যানবাহনের চাপ বাড়বে। অ্যাপল এই সমস্যার সমাধান করেছেন নিজেদের গাড়ি সার্ভিস চালু করে। অ্যাপলের কয়েকটি বাস তাদের নিজেদের কর্মীদের সঙ্গে বহন করবে সাধারণ যাত্রীদেরও।

অ্যাপল পার্কে পর্যটকদের জন্যও আলাদা একটি কেন্দ্র থাকছে।

আগামী মাসে কিছু কর্মী এখানে কাজ শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশাল এই ভবনে সব কর্মীকে স্থানান্তর করতে সময় লাগবে প্রায় ছয় মাস।

 


মন্তব্য