kalerkantho


নকিয়ার পুনরুত্থান!

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নকিয়ার পুনরুত্থান!

নকিয়ার মালিকানা হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তৎকালীন মাইক্রোসফট সিইও স্টিভ বলমার ও নকিয়ার সিইও স্টিফেন ইলোপ

মাইক্রোসফটের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর নামটাই হারিয়ে গিয়েছিল। দুই বছর বিরতির পর আবার হ্যান্ডসেট বাজারে আনল ‘নকিয়া’।

এত দিন কেন বন্ধ ছিল, বিক্রি হয়ে যাওয়ার পরও কিভাবে আবার স্বনামে বাজারে এলো, বাজার দখলে কী কী করছে তারা—এসব জানাচ্ছেন মিজানুর রহমান

 

একসময় মানুষের কাছে মোবাইল ফোন মানেই ছিল নকিয়া। ২০০৭ সালের কথা, তখনো মোবাইল ফোন বাজারে প্রতিযোগীহীন চ্যাম্পিয়ন ফিনল্যান্ডের এই ব্র্যান্ড। সে বছরের ২৯ জুন অ্যাপলের প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস আইফোন বাজারে আনার ঘোষণা দেন। সেই সঙ্গে এও বলেন, এটি পুরো মোবাইল ইন্ডাস্ট্রিকেই পাল্টে দিতে যাচ্ছে।

কথাটা আমলে নেয়নি নকিয়া। তাই অন্য কম্পানিগুলো যেভাবে মোবাইলে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করতে গবেষণায় লেগে গিয়েছিল, নকিয়া তেমনটি করেনি। ফলে তারা ধীরে ধীরে বাজার থেকে সরতে থাকে। কয়েক বছরের ব্যবধানে মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি যখন পুরো নতুন চেহারায় তত দিনে নকিয়ার জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্রতিযোগিতা থেকে এতটাই পিছিয়ে পড়ে যে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অবশেষে নকিয়া যখন বুঝতে পারল তাদের অপারেটিং সিস্টেম সিম্বিয়ান এখন আর চলে না, তারা তা না শুধরে করল আরেকটি ভুল। মোবাইলে অ্যানড্রয়েড সফটওয়্যার না নিয়ে নিল মাইক্রোসফট অপারেটিং সিস্টেম। খুব বেশি দেরি হয়নি নকিয়া লুমিয়া সেটের মাইক্রোসফট থিওরি ব্যর্থ প্রমাণিত হতে। নকিয়ার প্রতিষ্ঠাতারা ধৈর্যহারা হয়ে পড়লে দৃশ্যপটে আসে মাইক্রোসফট। তারা ৫৪০ কোটি ডলারের বিনিময়ে নকিয়ার মোবাইল ফোনের ব্যবসা কিনে নেয়। মাইক্রোসফটও অনেকটা খুশি মনেই কম্পানিটি কিনে নেয়। কারণ একসময় নকিয়ার বাজারমূল্য ছিল তিন হাজার কোটি ডলারের বেশি।

নকিয়া অবশ্য নিরাশ করেনি মাইক্রোসফটকে। এক লাখ দক্ষ নকিয়াকর্মী মাইক্রোসফটের অপারেটিং সিস্টেমে চলা মাইক্রোসফট ফোনকেও শত কোটি ডলারের লাভ এনে দেয় ২০১৫ সালে। এতেও মন ভরেনি মাইক্রোসফটের। তারা নকিয়ার কাছে আরো অনেক বেশি আশা করেছিল। নিরাশ মাইক্রোসফট এবার নকিয়াকে আরেকবার বিক্রি করল দুই ভাগে—ব্র্যান্ডটি কিনে নিল নকিয়ার পুরনো কর্মীদের কম্পানি ফিনল্যান্ডের এইচএমডি এবং মোবাইল ফোন তৈরি, বিক্রয় ও বিপণন অংশ কিনে নিল ফক্সকন, যারা আইফোন তৈরি করে থাকে। দুই কম্পানিই পানির দরে কিনে নিল একসময়ের সোনার খনি। মাত্র ৩৫ কোটি ডলারে বিক্রি হলো দ্বিধাবিভক্ত নকিয়া।

তবে ভাগ হলেও যেন বাড়ি ফিরে পেয়েছে নকিয়া। এইচএমডি কম্পানি নকিয়ার আগের কর্মীদের দ্বারা তৈরি, তাই নকিয়াকে কিভাবে চালাতে হয় তা তারা জানে বলে মনে করেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। কেনার পরই তারা বিদায় জানায় মাইক্রোসফটকে, আপন করে নেয় অ্যানড্রয়েডকে। সেই সঙ্গে কম্পানিতে ফিরিয়ে আনে নকিয়ার ১৭ বছরের মার্কেটিং বস পেক্কা রেনটালাকে, যিনি নকিয়াকে একসময় সাফল্যের চূড়ায় তুলেছেন। রেনটালাও এসেই জানান দিলেন তিনি আবারও নকিয়াকে নিয়ে যাবেন সাফল্যের চূড়ায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি নকিয়াকে ভালোবাসি, এটিকে আবারও সাফল্যের চূড়ায় তুলতে পারলে আমার ভালো লাগবে। ’

রেনটালা ও এইচএমডির কর্মীরা যারা নকিয়ার উত্থানের সঙ্গে জড়িত, তাদের পেয়ে ফক্সকনও যেন শক্তি পেয়েছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা মোবাইল ফোন প্রস্তুতকারী এই প্রতিষ্ঠানটি নকিয়ার জন্য বিশ্বের সেরা ফোনই তৈরি করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। আশা করা যাচ্ছে চলতি বছরের শুরুর দিকেই বাজারে আসছে আনকোরা নতুন নকিয়া-সিক্স।

 

ভুলটি ছিল কোথায়?

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, নকিয়া আসলে ছিল হার্ডওয়্যার কম্পানি। তারা জানত কিভাবে একটি অসাধারণ যন্ত্র তৈরি করা যায়। কিন্তু তারা জানত না ভালো সফটওয়্যারও একটি মোবাইলকে পরিবর্তন করে দিতে পারে। সেই সঙ্গে তারা নিজেদের ব্র্যান্ডের প্রতি এত বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিল যে তারা আইফোন, অ্যানড্রয়েড, অ্যাপস ইত্যাদিকে পাত্তাই দিতে চাইত না। ফলত তারা আইওএস ও অ্যানড্রয়েডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আর বাজারে টিকে থাকতে পারেনি। বর্তমানে মোবাইল ফোনের বাজারে নকিয়ার দখল মাত্র ৩ শতাংশ।

 

আবার সফল হওয়ার টনিক

আবার নকিয়ার সফল হওয়ার টনিক খুবই সাধারণ। নকিয়ার প্রতি ভালোবাসাকে আবার মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তোলা। ফক্সকনের তৈরি অসাধারণ ডিভাইস ও অ্যালুমিনিয়াম ডিজাইনের অ্যানড্রয়েড ফোন দিয়ে নকিয়া এই ভালোবাসা পুনরুদ্ধার করতে চায়। পুনর্জন্মের খবরে ইতিমধ্যেই বেশ সাড়া পড়েছে মোবাইল বাজারে। তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকিয়ার নিজস্ব কিছু অসাধারণ প্রযুক্তি আছে, যেমন ওজো ভিআর ক্যামেরা, ডিজিটাল হেলথ ইত্যাদির সঙ্গে অ্যানড্রয়েডের সর্বশেষ ভার্সন যুক্ত হলে আর ব্যাটারিটা ভালো হলেই লুফে নেবে ভোক্তারা। নকিয়া চীনের বাজারে ছাড়ার মাধ্যমেই রাজ্যে পুনরাভিষেক করতে যাচ্ছে।

 

নকিয়ার নতুন ফোন

নকিয়া-সিক্স বাজারে এলো ১৯ জানুয়ারি। সেটটিতে চার গিগাবাইট র‌্যাম ও ৬৪ গিগাবাইট ইন্টারনাল স্টোরেজের সঙ্গে আছে মেমোরি কার্ড লাগানোর সুবিধাও। স্ন্যাপড্রাগন ৪৩০, অক্টাকোর প্রসেসরের ডিভাইসটিতে ১৬ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা থাকছে। সামনে থাকছে আট মেগাপিক্সেলের সেলফি ক্যামেরা। সাড়ে পাঁচ ইঞ্চির পর্দা ১০৮০ পিক্সেলে ভিডিও দেখাতে সক্ষম। সেটটি চলবে অ্যানড্রয়েড সেভেনে। ব্যাটারিটি খুব বেশি বড় নয়। ৩০০০ মিলি অ্যাম্পিয়ার ক্ষমতার ব্যাটারিতে চলবে নকিয়া-সিক্স।

 

তুলনা

কাগজে-কলমে নকিয়া সিক্স আইফোনের সর্বশেষ ফোন আইফোন সেভেন প্লাসকে হারিয়ে দিচ্ছে সব ক্ষেত্রেই। তবে এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি। ব্যবহারের পরই বোঝা যাবে নকিয়া মানুষের মনে জায়গা করে নিতে পারবে, নাকি আবারও একটি ব্যর্থতার গল্প হয়ে থাকবে।


মন্তব্য