kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হরেক রকম ডিসপ্লে

স্মার্টফোনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ‘ডিসপ্লে’। এর ওপর নির্ভর করে ফোনের নকশাও। দেখতে একই মনে হলেও কার্যকারিতা অনুযায়ী ডিসপ্লের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন তুহিন মাহমুদ

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হরেক রকম ডিসপ্লে

মডেল : রাজিব, ছবি: তারেক আজিজ নিশক

টিএফটি

‘থিন ফিল্ম ট্রানজিস্টর লিকুইড ক্রিস্টাল ডিসপ্লে’র সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে ‘টিএফটি’। এতে লিকুইডগুলো দুটো গ্লাস প্লাটের মাঝে অনেকটা স্যান্ডউইচের মতো থাকে।

টিএফটি গ্লাসে যতগুলো পিক্সেল প্রদর্শিত হয়, ঠিক ততগুলো ট্রানজিস্টর থাকে। মোবাইল হ্যান্ডসেটের পাশাপাশি টেলিভিশন সেট, কম্পিউটার মনিটরেও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পর্দা এটি।

সুুবিধা : টিএফটির তেমন কোনো বাড়তি সুুবিধা নেই। তবে উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় কম দামি স্মার্টফোন ও সাধারণ ফোনে এসব পর্দা ব্যবহার করা হয়।

অসুবিধা : সরাসরি আলো বা সূর্যের আলোতে এই পর্দায় কিছু দেখা যায় না বললেই চলে। বড় আকারের টিএফটি পর্দা মোবাইলের ব্যাটারির অনেক শক্তি নষ্ট করে। এই পর্দার লিকুইড বিষাক্ত, তাই চামড়ার সংস্পর্শে যেন না আসে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। যদি দুর্ঘটনাক্রমে তা শরীরের কোথাও লেগে যায়, অতিসত্বর সাবান ও পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

 

আইপিএস

‘ইন-প্লেন সুইচিং’য়ের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘আইপিএস’। টিএফটির তুলনায় এটি উন্নতমানের ডিসপ্লে প্রযুক্তি। সর্বোচ্চ রেজুলেশনের (৬৪০ বাই ৯৬০ পিক্সেল) আইপিএস ডিসপ্লেকেই বলা হয় ‘রেটিনা ডিসপ্লে’। আইফোন ৪-এ এ ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয়েছে।

সুবিধা : ছবি ও ভিডিও দেখতে খুব বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় না। তাই ব্যাটারির খরচও কম হয়। এতে যেকোনো কোণ থেকে মোটামুটিভাবে পরিষ্কার ছবি দেখা যায়।

অসুবিধা : সাধারণ এলসিডি থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি দামের বলে এই ডিসপ্লের স্মার্টফোনের দামও একটু বেশি হয়।

 

রেজিস্টিভ টাচস্ক্রিন

মোবাইল ফোনের টাচ স্ক্রিন দুই ধরনের। একটি ‘রেজিস্টিভ’, আরেকটি ‘ক্যাপাসিটিভ’। রেজিস্টিভ টাচস্ক্রিন দুই স্তরবিশিষ্ট। এই দুই স্তরের মধ্যে থাকে ছোট একটা ফাঁক। যখন প্রথম স্তরে চাপ দেওয়া হয় তখন তা দ্বিতীয় স্তরে গিয়ে মোবাইলের প্রসেসরে সংকেত পাঠায়। খোলা হাতের পাশাপাশি দস্তানায় ঢাকা আঙুল ব্যবহার করেও এই পর্দায় কাজ করা যায়।

সুবিধা : ধুলাবালি ও পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

অসুবিধা : মাল্টিটাচ সুবিধা নেই। সরাসরি সূর্যের আলোতে ডিসপ্লে দেখতে সমস্যা হয়। এর বাইরের স্তর নাজুক হওয়ায় কোনো ধারালো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

ক্যাপাসিটিভ টাচস্ক্রিন

ক্যাপাসিটিভ টাচস্ক্রিনে থাকে ‘ইনডিয়াম টিন অক্সাইড’-এর মতো ট্রান্সপারেন্ট উপাদান। এই পর্দায় মানুষের স্পর্শ মোবাইলের বিদ্যুতায়িত পর্দায় এক ধরনের বাধা সৃষ্টি করে। এ বাধাগুলো খুঁজে বের করে ফোনের প্রসেসর। সেই সূত্র ধরেই স্পর্শের মাধ্যমে সেলফোনগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া যায়।

সুবিধা : ক্যাপাসিটিভ টাচস্ক্রিনে শুধু হাতের সংস্পর্শে কাজ করা যায়। অতি মাত্রায় সংবেদনশীল এবং রেজিস্টিভ টাচস্ক্রিনের মতো এতে কোনো রকম চাপের প্রয়োজন পড়ে না। ডিউরেবল ও খুব দ্রুত টাইপ করা যায়। রেজিস্টিভ এলসিডি টাচ পর্দার স্পষ্টতা ৭০-৭৫ শতাংশ; কিন্তু তা ক্যাপসিটিভের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হয়। এতে রয়েছে উচ্চ সংবেদনশীল প্রযুক্তি এবং মাল্টি টাচব্যবস্থা। এ স্ক্রিন ব্যবহার করা হয় উচ্চ দামের স্মার্টফোনগুলোতে।

অসুবিধা : অতি মাত্রায় সংবেদনশীল হওয়ায় তা টাইপের সময় সতর্কতা বজায় রাখতে হয়। এটি মানবদেহের সংস্পর্শে চলে, তাই দস্তানা বা অন্য কিছু দিয়ে এ টাচস্ক্রিনে কাজ করা যায় না। ওপরের স্তর কাচের হওয়ায় যেকোনো সময় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

 

ওএলইডি

‘অর্গানিক লাইট ইমিটিং ডায়ড মনিটর’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ ওএলইডি। এতে ব্যবহার করা হয় কার্বনভিত্তিক কিছু উপাদান। ইদানীং ওএলইডি ব্যবহার করে টেলিভিশনের স্ক্রিন, কম্পিউটারের মনিটর, স্মার্টফোন এবং গেইমিং কনসোল তৈরি করা হচ্ছে।

সুবিধা : অন্ধকার রুমে এলসিডির চেয়ে এটিতে অনেক বেশি কন্ট্রাস্ট রেশিও পাওয়া যায়। প্লাস্টিক এবং অর্গানিক বা জৈব স্তরের ওএলইডি পর্দাটি অনেক চিকন, হালকা এবং নমনীয়। দ্রুত সাড়া দেওয়া ওএলইডি পর্দা এলইডির তুলনায় অনেক উজ্জ্বল। এ পর্দায় ১৭০ ডিগ্রি কৌণিকভাবে দেখা যাবে কোনো রকম বাধা ছাড়াই।

অসুবিধা : লাল ও সবুজ অর্গানিকের ওএলইডি পর্দার লাইফটাইমের তুলনায় নীল রঙের অর্গানিকের লাইফটাইম প্রায় অর্ধেক। এর উৎপাদন খরচ অনেক বেশি এবং এর বড় শত্রু পানি।

 

অ্যামোলেড

‘অ্যাকটিভ-ম্যাট্রিকস অর্গানিক লাইট-এমিটিং ডায়োড’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো অ্যামোলেড। এতে অর্গানিক বা জৈব পদার্থ ব্যবহার করা হয়। এ পর্দায় রং, হালকা ওজন এবং ব্যাটারির শক্তি সঞ্চয়সহ ওএলইডির অনেক গুণই রয়েছে। দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া এ পর্দাটি উচ্চ দামের বিভিন্ন স্মার্টফোন, মিডিয়া প্লেয়ার, ক্যামেরা, বিশাল পর্দার টিভি তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সুবিধা : এই ডিসপ্লেতে এলইডি থেকে কম শক্তির প্রয়োজন পড়ে। ফলে ব্যাটারি খরচ হয় কম। খরচ কম, বিদ্যুত্শক্তি সঞ্চয়ী, দেড় গুণ বেশি লুমিনেন্স (আলোর পরিমাপক), দেখার ভঙ্গির মান অনেক ভালো, সাড়া দেয় দ্রুত এবং অনেক নমনীয়। এর পর্দা অনেক বেশি সংবেদনশীল।

অসুবিধা : সরাসরি সূর্যালোকে এর ডিসপ্লে দেখা কষ্টকর। এর ভেতরের অর্গানিক উপাদান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় কম দীর্ঘস্থায়ী। এ ডিসপ্লে তৈরির খরচ বেশি।

 

সুপার অ্যামোলেড

অ্যামোলেড ডিসপ্লের পরবর্তী সংস্করণ হলো সুপার অ্যামোলেড। স্যামসাং এ প্রযুক্তির উদ্ভাবক। গ্যালাক্সি ডিভাইসগুলোতে এ ডিসপ্লে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সুবিধা : এ ডিসপ্লেটি সবচেয়ে হালকা। এটি অ্যামোলেডের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল, শক্তি সঞ্চয়ী এবং স্পর্শ করলে সাড়া দেয় দ্রুত।

অসুবিধা : এলসিডির চেয়ে চিকন ও উজ্জ্বল হলেও এর রেজ্যুলেশনের মান বেশ খারাপ।  

 

রেটিনা ডিসপ্লে

স্মার্টফোনের ডিসপ্লের সর্বাধুনিক সংস্করণ ‘রেটিনা’। অ্যাপলের আইফোন, আইপ্যাড, আইপড, ম্যাকবুক এয়ারে ব্যবহার করা হয়েছে এই পর্দা।

সুবিধা : এই পর্দার পিক্সেল এত সূক্ষ্ম যে খালি চোখে তা চিহ্নিত করা যায় না। তাই একে ‘রেটিনা’ বলা হয়।

অসুবিধা : অতিরিক্ত উজ্জ্বলতা এবং রঙের তারতম্যের জন্য রেটিনা ডিসপ্লে হলুদ দেখা যায়। বেশি ঘনত্বের জন্য অধিকসংখ্যক এলইডি ব্যবহার করায় ফোনের চার্জ শেষ হয় যায় দ্রুত। রেটিনা ডিসপ্লে ডিভাইসের বেশি মেমোরি স্পেস দখলে রাখে।

 

হ্যাপটিক টাচস্ক্রিন

হ্যাপটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে ব্ল্যাকবেরি স্মার্টফোনে। প্রথম দিকে এই পর্দা ব্যবহার করা হতো বিমানে। এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি প্রজন্মের হ্যাপটিক টাচস্ক্রিন বের হয়েছে। ভিডিও গেইম কনসোল, পার্সোনাল কম্পিউটার এবং মোবাইল ফোনে ব্যবহার করা হয়েছে এই পর্দা।

সুবিধা : হ্যাপটিক প্রযুক্তি মূলত মোবাইলে ব্যবহার করা হয় ‘কম্পন সুবিধা’র জন্য। এতে হাতের র্স্পশে মোবাইলে ‘ভাইব্রেশন’ বা কম্পন পেতে সুবিধা হয়।

অসুবিধা : এই পর্দার জন্য মোবাইলের ভিজ্যুয়াল সেন্সর অনেক সময় ওভারলোড হয়ে পড়ে।

 

গরিলা গ্লাস

অ্যালকালি-অ্যালোমিনোসিলিকেট যৌগের তৈরি এক ধরনের মজবুত ও শক্তিশালী ডিসপ্লে হচ্ছে গরিলা গ্লাস। খ্যাতনামা স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্মার্টফোনে পর্দাটি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশি স্মার্টফোন ব্র্যান্ডও তাদের বেশি দামের ডিভাইসগুলোতে গরিলা গ্লাস ব্যবহার করছে। এই গ্লাস তৈরির উপাদানগুলো প্রক্রিয়াজাত করে পুনরায় ব্যবহার করা যায়। এর সর্বশেষ সংস্করণ ‘গরিলা গ্লাস ৫’-এর ঘোষণা এসেছে সম্প্রতি।

সুবিধা : এটি স্মার্টফোনের পর্দাকে আঁচড় ও দাগ থেকে সুরক্ষা দেয়। গরিলা গ্লাসে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে মোবাইলে এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম জীবাণুর জন্ম হয়।

অসুবিধা : গরিলা গ্লাসের অসুবিধা নেই বললেই চলে। তবে এই ডিসপ্লে ‘বেশ দামি’।  


মন্তব্য