kalerkantho


আসছে চতুর্থ প্রজন্ম

বিশ্বের অনেক দেশেই শুরু হয়েছে ‘ফোরজি’র ব্যবহার। বাংলাদেশেও চলছে প্রস্তুতি। কী আছে এ প্রযুক্তিতে? জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আসছে চতুর্থ প্রজন্ম

‘ফোরজি’ কী

‘ফোরজি’, ‘ফোর্থ জেনারেশন’ বা ‘চতুর্থ প্রজন্ম’ হলো দ্রুততম সময়ে যোগাযোগে ব্যবহৃত মোবাইল টেলিযোগাযোগপ্রযুক্তি, যাকে আবার ‘লং টার্ম ইভাল্যুয়েশন’ বা ‘এলটিই’-ও বলা হয়ে থাকে। এই প্রযুক্তি বর্তমানে বাংলাদেশে চালু থাকা তৃতীয় প্রজন্ম বা থ্রিজির পরের ধাপ।

‘ফোরজি’র আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়ে ‘ফোরজি’ বোঝা যায়। ‘আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন-রেডিও যোগাযোগ’ শাখার ‘ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন অ্যাডভান্সড’ (আইএমটিএ) ফোরজির জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করিয়েছে। সেখানে ‘ফোরজি’ হতে হলে বেশ কয়েকটি যোগ্যতা উতরাতে হয়।

আইএমটিএর ওই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটের গতি খুবই দ্রুতগতির হবে। কোনো দ্রুতগতির যানবাহন অর্থাৎ বাস বা ট্রেনে এই সেবার ইন্টারনেট গতি হবে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মেগাবাইট। এ ছাড়া আবাসিক ব্যবহারে বা স্থিরাবস্থায় ‘ফোরজি’ নেটওয়ার্কের গতি হবে প্রতি সেকেন্ডে এক গিগাবাইট।

 

বৈশিষ্ট্য

ফোরজির সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর এ বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন।

যার মধ্যে প্রথম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে গতি। এ ছাড়া এই প্রযুক্তিতে তথ্য আদান-প্রদান পুরোপুরি ‘ইন্টারনেট প্রটোকল প্যাকেট সুইচ নেটওয়ার্ক’ভিত্তিক হবে। একই স্পেকট্রাম থেকে সর্বাধিকসংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এর ব্র্যান্ডইউথ ন্যূনতম ৫ থেকে ২০ মেগাহার্ডজ এবং কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ৪০ মেগাহার্ডজ পর্যন্ত হবে। এ ছাড়া এর ডাউনলিংকের ক্ষেত্রে লিংক স্পেকট্রাল এফিসিয়েন্সি প্রতি সেকেন্ডে ১৫ বিট এবং আপলিংকের ক্ষেত্রে ৬ দশমিক ৭৫ বিট হবে।

 

সুবিধা

ফোরজির মূল সুবিধা—এই নেটওয়ার্কে সর্বোচ্চ গতিতে তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব। বলাই হচ্ছে এর গতি হবে সর্বনিম্ন ১০০ মেগাবাইট। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চ ডেফিনেশন টেলিভিশন ও ভিডিও কনফারেন্সের সুবিধা পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া এই প্রযুক্তিতে গ্রাহক সব সময়ই মোবাইল অনলাইন ব্রডব্যান্ডের আওতায় থাকতে পারবে। ফোরজির মাধ্যমে মোবাইলে কথোপকথন ও তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপত্তা অনেক বেশি ও শক্তিশালী।

এ ছাড়া ফোরজি মোবাইল গ্রাহকদের ভয়েস মেসেজ, মাল্টিমিডিয়া মেসেজ, ফ্যাক্স, অডিও-ভিডিও রেকর্ডিংসহ নানা ধরনের সুবিধা দেয়।

 

ফোরজির সূচনা

বেশির ভাগ উন্নত দেশেই ফোরজি নেটওয়ার্ক ব্যবহার শুরু হয়েছে। যাত্রার শুরু থেকে দুটি ফোরজি স্ট্যান্ডার্ড বাণিজ্যিকভাবে মোবাইলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একটি মোবাইল ‘ওয়াইম্যাক্স’ এবং আরেকটি ‘লং টার্ম ইভাল্যুয়েশন’ বা ‘এলটিই’। ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ায় চালু হয় ফোরজি। এর পর একটু বড় পরিসরে ২০০৯ সালে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলে (ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন) অপারেশন শুরু করে এই প্রযুক্তি। এ ছাড়া ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্প্রিন্ট নেক্সটেল মোবাইল ওয়াইম্যাক্স এবং ২০১০ সালে মেট্রো পিসিএস এলটিই সার্ভিস চালু করে।

অবশ্য শুরুতে ফোরজি ইউএসবি মডেমে থাকলেও ২০১০ সালে সর্বপ্রথম ওয়াইম্যাক্স স্মার্টফোন এবং ২০১১ সালে এলটিই স্মার্টফোনে বাজারে আসে। আর এখন প্রায় সব অপারেটিং সিস্টেমচালিত স্মার্টফোনেই এটি ব্যবহার করা যায়।

 

বাংলাদেশে ফোরজি

দেশে প্রথমবারের মতো ফোরজি বা এলটিই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেখিয়েছিল বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ লিমিটেড (বিআইইএল)। সেটাও বছর দুয়েক আগের কথা। দেশে ফোরজি নেটওয়ার্কের ব্যবহার শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে অপারেটরগুলো। তবে বাস্তবতা হচ্ছে এখনো দেশের সব জায়গায় পূর্ণাঙ্গভাবে থ্রিজি নেটওয়ার্ক দেওয়াই সম্ভব হয়নি।

 

গাইডলাইন ও নিলাম

২০১৫ সালের শেষ দিকে ফোরজি নেটওয়ার্ক লাইসেন্সের গাইডলাইন তৈরি করেছে বাংলাদেশের টেলি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বিটিআরসি’। তখন বলা হয়েছিল চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের দিকে ফোরজি তরঙ্গের নিলাম করবে এই সংস্থা। সেই লক্ষ্যেই তৈরি করা ওই গাইডলাইনটি জানুয়ারিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনও পেয়েছে।

বিটিআরসি তার গাইডলাইনে ৭০০ এবং ১৮০০ মেগাহার্ডজ তরঙ্গের প্রযুক্তি নিরপেক্ষ ব্যবহার নীতিমালা করছে, যাতে অপারেটররা একটি তরঙ্গের মাধ্যমেই থ্রিজি ও ফোরজি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে পারে।

গত মার্চে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এবং কমিশনের চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, অল্প দিনের মধ্যেই ফোরজি তরঙ্গের নিলাম হবে। তবে ঠিক কোন মাসে হবে, সেটা তাঁরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।

শাহজাহান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, সরকারের কাছ থেকে সব ধরনের অনুমতি পাওয়া গেছে। কমিশনও সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এখন অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি উন্মুক্ত নিলামের আহ্বান করবে কমিশন।

২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর থ্রিজি সেবা দিতে এক নিলামে অংশ নিয়েছিল গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল। তবে ‘বিশেষ’ সুবিধায় সরকারি মোবাইল সেবাদান প্রতিষ্ঠান টেলিটক সে সময় নিলামের আগেই থ্রিজি সেবা চালু করে।

তবে ফোরজি নেটওয়ার্কের নিলাম হলে সেখানেও এই অপারেটরগুলোই অংশ নেবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বিটিআরসি এটাও উল্লেখ করেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটককেও এ নিলামে অংশ নিতে হবে।

অপারেটরদের মধ্যে গ্রামীণফোন ও রবি ফোরজি সেবা দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি কুমিল্লা ও সিলেটেও তাদের সব প্রযুক্তিকে ফোরজিতে রূপান্তরের কাজ শুরু করেছে।

২০১৩ সালে চার মোবাইল ফোন অপারেটর যখন থ্রিজি নেটওয়ার্কের লাইসেন্স পায়, তখন একই তরঙ্গে ফোরজি সেবা দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছিল। সেখানে শর্ত হিসেবে বলা ছিল, এ সেবা চালুর আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির অনুমোদন নিতে হবে।

অপারেটর দুটির ফোরজি সেবার কাজ করছে প্রযুক্তিপণ্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এরিকসন বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজ জেইন সম্প্রতি অপারেটর দুটির ফোরজি কার্যক্রম শুরুর কথা স্বীকার করেছেন।

অপারেটর দুটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফোরজি কার্যক্রমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ জন্য তারা টুজির সঙ্গে থ্রিজির নেটওয়ার্কেও বড় পরিবর্তন আনছে। একই সঙ্গে ফোরজির প্রস্তুতিও সেরে রাখছে বলে জানিয়েছিলেন জেইন।

তবে অপারেটর দুটি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে রাজি হয়নি। তবে এরই মধ্যে মোবাইল অপারেটর রবি দেশে ফোরজি সেবা চালুর বিষয়ে বিটিআরসিকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে।

এদিকে ফোরজি তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়ে অপারেটরদের মধ্যে দেখা দিয়েছে জটিলতা। রবি-এয়ারটেল একীভূত হলে হিসাব অনুযায়ী তারা বেশি তরঙ্গ বরাদ্দ পাবে। তখন অন্যরা তরঙ্গের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে—এমন কথা উল্লেখ করে বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছে অপর মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক।

তিন বছর আগে যখন থ্রিজির তরঙ্গ নিলাম হয়, তখন ২১০০ ব্যান্ডের তরঙ্গের মধ্যে শুধু গ্রামীণফোন ১০ মেগাহার্জ তরঙ্গ নিয়েছিল। অন্য তিন অপারেটর বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেল তরঙ্গ নিয়েছিল পাঁচ মেগাহার্জ করে।

তবে বাংলালিংকের পাশাপাশি মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনও চায় প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা বা ‘টেকনোলজিক্যাল নিউট্রালিটি’ চালু হওয়ার পরই দেশে ফোরজি সেবা চালু করা হোক।

মোবাইল অপারেটরগুলোর সংগঠন ‘অ্যামটব’-এর মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী টি আই এম নূরুল কবীর বলছেন, ‘ফোরজির জন্য বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুত কি না বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু স্পেকট্রাম বিক্রি করলেই এই নেটওয়ার্ক বাস্তবায়ন করা সফল হবে না। মাত্র ২৫ শতাংশ স্মার্টফোন পেনিট্রেশনের বাজারে ফোরজির জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হবে, তা ব্যবসায়িক মূল্যায়নে যুক্তিযুক্ত কি না সেটিও এক প্রশ্ন। এ ছাড়া স্মার্টফোন ডিভাইস ও ইন্টারনেটে ট্যাক্সের হারও বিবেচ্য। চাহিদা ও জোগান এবং অ্যাকসেসিবিটিলি ও অ্যাফোর্টেবিলিটি হিসাবে আনতে হবে। এখনো থ্রিজি নেটওয়ার্কও ঠিকমতো সম্প্রসারিত হয়নি।


মন্তব্য