kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

ফোন কেনার আগে...

স্মার্টফোন কেনার সময় কে না চান নিজের ফোনটা যতটা সম্ভব হালনাগাদ হোক। ফোনের ক্যামেরা আর ব্যাটারির মান না হয় মেগাপিক্সেল ও এমএএইচ দেখে বুঝলেন কিন্তু ফোনটি হ্যাং করবে কি না কিংবা গেইম খেলার সময় অতিরিক্ত গরম হবে কি না—এসব অনেকেই কেনার সময় বুঝতে পারেন না। ফোনের প্রযুক্তিগত সুবিধা জানা থাকলে নিজেই বের করে নেওয়া যায় নিজের জন্য যথাযথ ফোনটি। আর এসব জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ফোন কেনার আগে...

ছবি : তারেক আজিজ নিশক

প্রসেসর

স্মার্টফোনের ফিচার লিস্টে বড় বড় করে লেখা ‘অক্টা কোর প্রসেসর, ৩ গিগাবাইট র‍্যাম’ দেখেই অনেকে গলে যান। এখানে আসলে ঘেঁটে দেখার মতো অনেক কিছুই আছে।

প্রথমত দেখা যাক ‘ডুয়াল কোর’, ‘কোয়াড কোর’ বা ‘অক্টা কোর’-এর মতো বিষয়গুলো। এসবের অর্থ হচ্ছে ২, ৪, ও ৮টি প্রসেসর কোর। সাধারণত যত বেশি কোর, তত দ্রুত কাজ করতে পারবে আপনার ফোনটি। তবে কোরগুলো সব ফোনের জন্য এক নয়। কোরের কাজের ক্ষমতার পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে। হাল আমলের ফোনগুলোর প্রসেসরে মূলত চার ধরনের কোর ব্যবহার হয়ে থাকে, যা হচ্ছে কর্টেক্স এ-৩৫, ৫৩, ৫৭ ও ৭২। এখানে কর্মক্ষমতা অনুসারে কোরগুলোর নম্বর দেওয়া হয়েছে। সাধারণত কম ক্ষমতার কোরগুলো কম চার্জ ব্যবহার করে আর স্বাভাবিকভাবেই গরমও কম হয়। তাই প্রসেসরগুলো দুটি ভিন্ন রকমের কোর ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। কম কাজের সময় স্বল্প ক্ষমতার কোর এবং বেশি চাপের সময় শক্তিশালী কোর প্রসেসরে কাজ করে থাকে। যেমন—‘কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৮১০ প্রসেসরে’ চারটি ‘এ৫৩’ ও চারটি ‘এ৫৭ কোর’ আছে। মোট আটটি কোর থাকায় এই প্রসেসরটি হচ্ছে অক্টা কোরের। তবে কিছু কিছু কম্পানি দেখা যায় স্বল্প ক্ষমতার আটটি কোর ব্যবহার করেই অক্টা কোর বলে ফোন বিক্রি করছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতারা ভোগান্তির মধ্যে পড়েন।

যাদের কাছে সব কিছু পড়েও মনে হচ্ছে বিষয়টি খুব জটিল, তাহলে এটা মাথায় রাখুন—আটটি এ৫৩ কোরের চেয়ে দুটি এ৫৩ আর দুটি এ৭২ কোর বেশ দ্রুত কাজ করবে।

 

জিপিউ

প্রসেসরের কোরের ধরন ও পরিমাণের সঙ্গে প্রসেসরে ব্যবহার হওয়া জিপিউটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে কোন জিপিউ কিনছেন সেটি বেছে নেওয়ার সুযোগ কম থাকে। অন্যভাবে এই অসুবিধা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। এ জন্য ফোনের স্ক্রিনের রেজ্যুলেশনের দিকে নজর ফেরাতে হবে। ধরুন, আপনি ১০ হাজার বা এর কমের মধ্যে ফোন কিনতে চাইছেন। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া যেতে পারে প্রসেসর ও জিপিউ খুব বেশি পিক্সেলসমৃদ্ধ স্ক্রিন চালাতে সমস্যায় পড়বে। অতএব এইচডি স্ক্রিনের স্মার্টফোন না কেনাই ভালো, বেশি হলে শুধু এইচডি (১২৮০ বাই ৭২০) স্ক্রিনের মধ্যেই থাকতে হবে। ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে ১০৮০পি এবং এর ওপরের বাজেটে ১০৮০পির রেজ্যুলেশন কেনা যেতে পারে সহজেই। এর পরও হাল জমানার জিপিউগুলো সম্পর্কে জেনে রাখা ভালো।

অ্যাড্রিনো : চিপনির্মাতা কোয়ালকম তাদের

প্রসেসরে অ্যাড্রিনো জিপিউ ব্যবহার করে থাকে। মূল্য অনুযায়ী সেসব ৩০০, ৪০০ ও ৫০০ সিরিজে ভাগ করা। সাধারণত ৩০০ সিরিজ এইচডি বা এর কম রেজ্যুলেশন, ৪০০ সিরিজ এইচডি ও ফুল এইচডি পর্যন্ত এবং ৫০০ সিরিজ বাকি সব রেজ্যুলেশনে সব কিছু কোনো ঝামেলা ছাড়াই চালাতে সক্ষম।

মালি : মালি সিরিজের জিপিউগুলো সাধারণত স্যামসাংয়ের ‘এক্সিনস প্রসেসর’, মিডিয়াটেক ও হুয়াউইয়ের ‘কিরিন প্রসেসর’-এ ব্যবহার হয়ে থাকে। ৪০০-৪৫০ সিরিজের জিপিউ সাধারণত এইচডির চেয়ে কম রেজ্যুলেশনে কাজ করে থাকে, ‘টি৬০০ সিরিজ’ এইচডি, ফুল এইচডি ও ‘৮০০ সিরিজ’ ফুল এইচডি ও এর বেশিতেও ঝামেলা ছাড়াই কাজ করতে পারে। তবে এই জিপিউটি মিডিয়াটেক প্রসেসরে কম শক্তিশালী প্রসেসর কোরের সঙ্গে ব্যবহার হওয়ার ফলে ফোনে একটু খারাপ পারফরম্যান্স দেয়।

অন্যান্য : পাওয়ারভিয়ার জিপিউ একসময় মিডিয়াটেক ব্যবহার করলেও আজ মূলত ইন্টেল প্রসেসরেই দেখা যায়। ‘জি৬২০০ জিপিউটি’ ‘অ্যাড্রিনো ৪০০ সিরিজ’-এর কাছাকাছি বলা যেতে পারে। এনভিডিয়া টেগ্রা প্রসেসরে জিফোর্স জিপিউ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

 

র‍্যাম

র‍্যাম নিয়ে যদিও তেমন কিছু বলার নেই। সাধারণত যতটা সম্ভব বেশি র‍্যাম কেনা উচিত। তবে এইচডির নিচের রেজ্যুলেশনের ফোনের জন্য ১ গিগাবাইট, এইচডিতে ২ গিগাবাইট, ফুল এইচডিতে ৩ গিগাবাইট থেকে ৪ গিগাবাইট পর্যন্ত র‍্যাম পর্যাপ্ত। আজকাল র‍্যামের ক্ষেত্রে ‘ডিডিআর৩’, ‘ডিডিআর৪’ শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে আসলে র‍্যামে খুব একটা বেশি পার্থক্য হয় না। ফলে এসব নিয়ে চিন্তার কোনো প্রয়োজন নেই।

 

স্ক্রিন

একটা সময় ছিল যখন মোবাইল স্ক্রিনের আকারই ছিল শেষ কথা। বড় স্ক্রিনের মোবাইল কিনতে পারলেই খুশি হতেন মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীরা। এখানে রেজ্যুলেশনের কোনো বালাই ছিল না। কয়েক বছর ধরে ব্যবহারকারীরা মোবাইলের স্ক্রিনের রেজ্যুলেশনের দিকে নজর দিয়েছেন। প্রথমে নজর দেওয়া উচিত স্ক্রিনের পিক্সেল ঘনত্বের (পিপিআই) দিকে। এটি ৩০০ পিপিআইয়ের কাছাকাছি বা এর বেশি হলেই যথেষ্ট। তবে কার্ডবোর্ড ভিআর ব্যবহার করলে স্ক্রিনের পিপিআইয়ের ৪০০-এর বেশি হওয়াই ভালো। সাধারণত ৫ ইঞ্চির নিচে স্ক্রিনে ৭২০পিএইচডি, ৫ ইঞ্চি থেকে ৫.৫ ইঞ্চি স্ক্রিনে ১০৮০পি ফুল এইচডি ও এর বেশি স্ক্রিনে কিউএইচডি ১৪৪০পি হলে ভালো হয়। তবে মোবাইলের স্ক্রিনের রেজ্যুলেশন কম থাকলে সাধারণত গেইম আরো ভালোভাবে খেলা যায়।

পরিশেষে বলা যেতে পারে, ‘আইপিএস এলসিডি’ বা ‘এলপিটিএস এলসিডি’ স্ক্রিন প্রযুক্তি ছাড়া ফোন কেনা উচিত নয়। সম্ভব হলে ‘ওলেড’ বা ‘অ্যামোলেড’ কিনতে পারলে মোবাইলে দেখা ছবির রং হবে আরো বেশি প্রাণবন্ত।

 

ফাস্ট চার্জ ও ব্যাটারি

মোবাইল ফোনের ব্যাটারির ক্ষমতা যত বেশি তত ভালো। তবে এটিই ব্যাটারির জন্য শেষ কথা নয়। প্রথমত, আজকাল ২৫০০ এমএএইচের কম ধারণক্ষমতার ব্যাটারি কেনার কোনো মানে নেই। এই সময়ের স্মার্টফোনগুলোর ব্যাটারি ন্যূনতম ৩০০০ থেকে ৩৩০০ এমএএইচের হওয়া উচিত। আর প্রযুক্তিগতভাবে দেখতে গেলে লিথিয়াম আয়নের চেয়ে লিথিয়াম পলিমার ব্যাটারি অনেক এগিয়ে। কেননা লিথিয়ান পলিমার ব্যাটারি দীর্ঘক্ষণ চার্জ ধরে রাখতে সক্ষম। তবে এসবের চেয়ে জরুরি বলা যেতে পারে ফাস্ট চার্জ প্রযুক্তি।

ফোন চার্জ হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে—এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য একেক মোবাইল ফোন তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান একেকটি প্রযুক্তি তৈরি করেছে। অনেকেই সাধারণ চার্জার কিন্তু বেশি বিদ্যুৎ চালনা করতে পারে এমন সার্কিট ব্যবহার করছে, যা সর্বোচ্চ ২এ (অ্যাম্পিয়ার) পর্যন্ত হতে পারে। কোয়ালকম বিদ্যুৎ না বাড়িয়ে ভোল্টেজ ৫ থেকে ৯ বা ১২ পর্যন্ত উন্নতি করেছে, যা ‘কোয়ালকম কুইকচার্জ’ নামে পরিচিত। তবে এই সুবিধা পেতে হলে ফোনে এটির সাপোর্ট এবং সঠিক কেবল ও অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করতে হবে।

স্যামসাংও এ রকম একটি পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তবে এটি ব্যবহারে ফোন অনেক গরম হয়ে যাওয়ায় আরেক মোবাইল ফোন তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ানপ্লাস’ শুধু কারেন্টের পরিমাণ ২এ থেকে ৪এ-তে উন্নতি করেছে। এটিকে তারা বলছে ‘ড্যাশচার্জ’। তবে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারেই অন্তত ৬০ শতাংশ চার্জ ৩০ মিনিটেই হয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে।

শেষে এটা বলা যেতেই পারে, স্মার্টফোন কেনাটা আজকাল অনেকটাই কম্পিউটার কেনার মতোই হয়ে গেছে। অতএব কেনার সময় নির্দিষ্ট মোবাইল ফোনের বেশ কিছু রিভিউ দেখে এবং বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করে কেনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।


মন্তব্য