kalerkantho

অলিকের নাসা জয়

নাসার উদ্যোগে আয়োজিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যাকাথন প্রতিযোগিতা ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ’। এতে অংশ নিয়ে ‘বেস্ট ইউজ অব ডাটা’ বিভাগে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর দল ‘অলিক’। বিস্তারিত জানাচ্ছেন নুরুল ইসলাম রুদ্র

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



অলিকের নাসা জয়

বাঁ দিক থেকে—আবু সাবিক মাহদী, সাব্বির হাসান, কাজী মঈনুল ইসলাম ও এস এম রাফি আদনান

নাসা অ্যাপস চ্যালেঞ্জ

‘নাসা অ্যাপস চ্যালেঞ্জ’ শুরু ২০১২ সাল থেকে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা নাসা আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বের ৭৫টি দেশের ২০০ শহরে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। তবে বাংলাদেশে নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জের হ্যাকাথন অনুষ্ঠিত হচ্ছে চার বছর ধরে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), বেসিস স্টুডেন্টস ফোরাম বাংলাদেশের ৯টি শহর—ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায় এ আয়োজন করে। এ প্রতিযোগিতাগুলোর মোট ২০০০টি প্রকল্প থেকে বাছাই করা ৪০টি নিয়ে গত বছরের ১৯ থেকে ২০ অক্টোবর ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয় টানা ৩৬ ঘণ্টার হ্যাকাথন। সেখান থেকে শীর্ষ ৮টি প্রকল্পকে নাসার চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়। বিভিন্ন দেশের মনোনীত প্রজেক্টগুলো নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জের বিচারকরা পর্যালোচনা করে ছয় বিভাগে ২৫টি দলকে ‘গ্লোবাল ফাইনালিস্ট’ হিসেবে মনোনীত করেন। বাংলাদেশের মনোনয়নপ্রাপ্ত আটটি প্রকল্প থেকে দুটি প্রকল্প দুটি বিভাগের শীর্ষ চারে জায়গা করে নেয়। এতে বিশ্বের ৭৫টি দেশের এক হাজার ৩৯৫টি দল অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় বিভাগ ছিল ৬টি। বিভাগগুলো হচ্ছে—‘বেস্ট ইউজ অব ডাটা’, ‘বেস্ট ইউজ অব হার্ডওয়্যার’, ‘বেস্ট মিশন কনসেপ্ট’, ‘গ্যালাক্টিক ইমপ্যাক্ট’, ‘মোস্ট ইন্সপিরেশনাল’ ও ‘বেস্ট ইউজ অব সায়েন্স’।

‘বেস্ট ইউজ অব ডাটা’ বিভাগে অংশ নেয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ‘অলিক’ আর ‘বেস্ট ইউজ অব হার্ডওয়্যার’ বিভাগে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্লানেট কিট’।

‘লুনার ভি আর’ নামে একটি ভার্চুয়াল রিয়ালিটি অ্যাপ তৈরি করে ‘বেস্ট ইউজ অব ডাটা’ বিভাগে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়াকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘অলিক’। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এস এম রাফি আদনান, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী মঈনুল ইসলাম, আবু সাবিক মাহদী ও সাব্বির হাসান। এই চারজনকে নিয়েই ‘অলিক’।

বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্যই ছিল গত তিন আসরের তুলনায় ভালো করার। প্রথমবারের মতো নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জে জয়ী হওয়া একটা বড় অর্জন। এতে আরেকটি বড় মাইলফলক অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।’ ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ ২০১৮’-এর যুগ্ম আহ্বায়ক দিদারুল আলম বলেন, ‘এই অর্জন গোটা বাংলাদেশের।’

বেসিসের সাবেক পরিচালক এবং ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ ২০১৮’-এর যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল হাসান অপু বলেন, ‘অলিকের এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, আমাদের তরুণ বিজ্ঞানীরা বিশ্বের তরুণ বিজ্ঞানীদের চেয়ে মেধায় পিছিয়ে নেই। একই সঙ্গে নাসার বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার পথও অনেকটা সুগম হলো আমাদের।’

 

লুনার ভিআর অ্যাপস

লুনার ভিআর মূলত একটি ভার্চুয়াল রিয়ালিটি অ্যাপস। ভিআরের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা চাঁদে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পাবেন। নাসার অ্যাপোলো-১১ মিশনের ল্যান্ডিং এরিয়া ভ্রমণ, চাঁদ থেকে সূর্যগ্রহণ দেখা এবং চাঁদকে একটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আবর্তন করা—এই তিন পরিবেশকে ভার্চুয়ালভাবে তৈরি করেছে অলিক।

 

তৈরি হলো অ্যাপ

প্রথম দিকে থ্রিডি এনিমেশন নিয়ে কাজ করলেও পরে গেইম, ভিজ্যুয়াল ইন্টার-অ্যাকটিভ ও ভার্চুয়াল রিয়ালিটির প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ে। সেই ধারাবাহিকতায় নাসার লুনার ভিআর অ্যাপস তৈরি করছে। মূলত নাসা প্রদত্ত বিভিন্ন ডাটা ব্যবহার করে এই অ্যাপটি তৈরি করা হয়।

নাসার সরবরাহ করা বিভিন্ন উপাদান থেকে থ্রিডি মডেল এবং তথ্য সংগ্রহ করেন অলিকের সদস্যরা। একক থ্রিডি, ব্লেন্ডার, সি প্রগ্রামিং, অ্যাডবি ফটোশপ ও গুগল কার্ডবোর্ড এসডিকের সাহায্য নিয়ে এই অ্যাপ তৈরি করা হয়।

কিভাবে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেন? এ প্রশ্নের উত্তরে দলটির অন্যতম সদস্য সাব্বির হাসান বলেন, “ছোটবেলা থেকেই প্রগ্রামিংয়ের প্রতি আগ্রহ। স্কুল ও কলেজে পড়ার সময়ও দিনের বেশির ভাগ সময় প্রগ্রামিং নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরও এই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ মোটেও কমেনি; বরং দিন দিন আগ্রহ বেড়েই চলেছে। হঠাৎ একসময় অ্যাপসের প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয় এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন বই পড়ে অ্যাপ তৈরি করতে চেষ্টা করি। একসময় জানতে পারি যে বাংলাদেশ থেকে ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ’-এ অংশ নেওয়া যায়। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেব।”

কেনই বা লুনার ভিআর অ্যাপ বানাতে গেলেন? দলের আরেক সদস্য আবু সাবিক মাহদী বলেন, “অনেকগুলো সমস্যার মধ্যে আমরা এই সমস্যাকে বেছে নিয়েছিলাম। কারণ এ সমস্যাটা আমাদের কাছে অনেকাংশে সহজ মনে হয়েছিল এবং এর আগে সমস্যাটির কাছাকাছি অনুরূপ একটি সমস্যা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আমাদের ছিল।” তাঁর কথার সঙ্গে কাজী মঈনুল ইসলাম যোগ করেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল পৃথিবীতে বসে চাঁদের অবস্থানের অনুভূতিটা কেমন হতে পারে তা লোকজনকে বোঝানো। তাই আমরা এই সমস্যাটি বাছাই করেছি।”

 

মেন্টরের কথা

‘অলিক’-এর মেন্টর ছিলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহকারী অধ্যাপক বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তী। শাবিপ্রবি থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তরুণ ও শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক হওয়ায় তাঁর কাছে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত তুলনামূলক অনেকটাই সহজ। সেভাবেই ‘অলিক’ টিমের সদস্যরা তাঁর কাছে আসেন বিভিন্ন পরামর্শের জন্য। একসময় এই অ্যাপসের সঙ্গে জড়িয়ে যান তিনি নিজেও। বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তী বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। এই অর্জন শুধু শাবিপ্রবির নয়, এটি বাংলাদেশের অর্জন।’

 

নাসার আমন্ত্রণ

এই বিজয়ের ফলে নাসা ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ পাচ্ছে অলিক। আনন্দের সঙ্গে কিছুটা দুশ্চিন্তাও আছে। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া-আসাসহ বিশাল খরচ কিভাবে জোগাবেন, তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত তাঁরা। তবে তাঁদের আশা, হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শাবিপ্রবি প্রশাসন, বেসিস কিংবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এগিয়ে আসবে।

 

এবং প্লানেট কিট

‘বেস্ট ইউজ অব হার্ডওয়্যার’ বিভাগে শীর্ষ চারে জায়গা করে নেয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির দল ‘প্লানেট কিট’। তারা তৈরি করেছিল এমন একটি নমুনা ডিভাইস, যা মানুষকে মঙ্গল গ্রহে বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে। এটা দিয়ে তারা মঙ্গলের পরিবেশের ডাটা আদান-প্রদান, প্রাথমিক স্তরের রাসায়নিক পরীক্ষা, জরুরি সতর্কতা, মাটির গঠন মূল্যায়ন, পানযোগ্য পানি সংগ্রহ, পথ পরিকল্পনা করতে পারবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে বারবার মহাকাশযাত্রা, ভ্রমণের খরচ হ্রাস, মূল্যবান গবেষণা তথ্য সংরক্ষণসহ পৃথিবীতে বিভিন্ন গবেষণার কাজেও সাহায্য করবে তাদের গবেষণা।



মন্তব্য