kalerkantho


ই-কমার্সে ‘বিদেশি’ দুশ্চিন্তা

আলীবাবা চলে এসেছে, আমাজনও আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ অবস্থায় দেশি ই-কমার্স খাতের উদ্যোক্তারা নিজেদের সুরক্ষায় একজোট। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আল-আমীন দেওয়ান

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ই-কমার্সে ‘বিদেশি’ দুশ্চিন্তা

দেশে সক্রিয় ই-কমার্স সাইটের সংখ্যা প্রায় ৫০০। এর বাইরে ফেসবুকে পেইজ খুলে পণ্য বেচাকেনায় যুক্ত উদ্যোগের সংখ্যা অর্ধ লক্ষাধিক। এই হিসাব ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাবের দেওয়া।   

গত সপ্তাহে ঢাকায় দেশীয় ই-কমার্স খাত নিয়ে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকদের দেওয়া তথ্য মতে—দেশের ই-কমার্স খাতে গত পাঁচ বছরে বিনিয়োগ ১০০ কোটি টাকার মতো। বার্ষিক বেচাকেনা হয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকার। কর্মসংস্থান হয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। গড়ে দৈনিক অর্ডারের পরিমাণ ৩০ হাজার। এর ৬৫ শতাংশ আসে তিন জেলা—ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে। বাকি ৩৫ শতাংশ সারা দেশের। অর্ডারের গড় মূল্য প্রায় ৮০০ টাকা।

পণ্য হাতে পেয়ে দাম নগদ শোধ করে দেন ৮০ শতাংশ। এ পদ্ধতি ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ হিসেবে পরিচিত।

বাকি ২০ শতাংশের বেশির ভাগই হয় বিকাশ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল লেনদেন সেবায়। ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডে দাম শোধ করেন খুব কম ক্রেতাই।

 

বিদেশি বিনিয়োগে কিসের আশঙ্কা?

দেশীয় উদ্যোক্তাদের দাবি—বাংলাদেশে ই-কমার্স ব্যবসার সুসময় আসছে। বাজার প্রায় তৈরি। কিন্তু এ অবস্থায় আনতে গত সাত বছরে অর্থ, সময় ও শ্রম দিয়েছেন তাঁরা। তৈরি করেছেন দক্ষ জনশক্তি। প্রচারণা ও সচেতনতা তৈরিতে সরকারের পাশাপাশি তাদের শ্রমও কম নয়। প্রস্তুতপ্রায় এই খাতে ঢুকে পড়ছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্বের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান চীনের আলীবাবা এরই মধ্যে বাংলাদেশের বাজারে সেবা দেওয়া শুরু করেছে। বৃহত্তম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজনও শুরুর পথে।

দেশের অন্যতম ই-কমার্স সাইট প্রিয়শপ ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা আশিকুল আলম খান ই-ক্যাবের রুরাল ই-কমার্স স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান। বেসিস ডিজিটাল কমার্স স্ট্যান্ডিং কমিটিরও তিনি সহসভাপতি।

তিনি বলেন, বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিয়ে আসা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসেই বাজার প্রস্তুত অবস্থায় পাচ্ছে। দেশের ই-কমার্স খাত গড়ে তুলতে কোনো অবদান নেই তাদের। বাজার তৈরিতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মতো তাদের ব্যয় করতে হচ্ছে না। প্রচারণার বেশির ভাগ টাকা তারা খরচ করতে পারবে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের বিপণনে। প্রায় শর্তহীন প্রবেশের সুযোগ পেতে যাচ্ছে তারা। এতে সাত বছর ধরে ভর্তুকি দিয়ে আশা দেশি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলো শুরুতেই পড়বে অসম প্রতিযোগিতায়। বাজার দখলে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দক্ষ জনশক্তিও নিয়োগ দেবে তারা। সব মিলে দেশের ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।

ই-কমার্স খাতের সার্বিক উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিদের নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, ভোক্তাদের জন্য বিভিন্ন বিধি-বিধান নিয়ে চলতি বছরের ১৬ জুলাই পাস হয় ‘জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা ২০১৮’। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘ডিজিটাল কমার্স বা ই-কমার্স খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কম্পানি ও অনুরূপ বিদেশি কম্পানি ৫১:৪৯ ইক্যুইটিভিত্তিক মালিকানা ব্যবস্থায় প্রযোজ্য হবে।’ নীতিমালাটি পাস হওয়ার পর স্থানীয় উদ্যোক্তারা একে স্বাগত জানিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত তা আর থাকেনি। কারণ জাতীয় বিনিয়োগনীতিতে শতভাগ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ হিসেবে ডিজিটাল কমার্স নীতিমালার ‘৫১:৪৯ ইক্যুইটিভিত্তিক মালিকানা’র শর্তটি সাংঘর্ষিক। তাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এটির সংশোধন চায়। শর্তটি সংশোধনে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।

 

সুরক্ষার পথ কোথায়?

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশীয় উদ্যোক্তারা বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন কিছু শর্ত আরোপের কথা বলছেন, যেগুলো জাতীয় বিনিয়োগনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না বা আবার স্থানীয়দের সুরক্ষাও মিলবে। আজকের ডিলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এবং বেসিস পরিচালক ফাহিম মাসরুর বলছেন, বিদেশি কম্পানি শতভাগ বিনিয়োগ করতে পারবে, তবে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কোনো একক বিনিয়োগকারী হিসেবে আসতে পারবে না। ‘বিদেশে নিবন্ধিত হোল্ডিং ইনভেস্টমেন্ট কম্পানি’ হিসেবে আসতে হবে এবং বিদেশে নিবন্ধিত হোল্ডিং কম্পানিতে কমপক্ষে পাঁচ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার থাকতে হবে।

 

এ ছাড়া এ খাতে বিনিয়োগের সাধারণ শর্তের মধ্যে ই-কমার্স কম্পানির প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিবিদের মাধ্যমে তৈরি করা, সব ধরনের ডাটা বাংলাদেশে হোস্ট করা, তাদের ট্যাক্স দ্বিগুণ করা, শুধু ‘মার্কেটপ্লেস’ মডেলে বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের নামে এবং বিদেশি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ৪৯ শতাংশ সীমা নির্ধারণ করে দিলে সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর সঙ্গে একমত প্রিয়শপ, বাগডুম ডটকম, কিকসা, রকমারি, পিকাবু, অথবা এনআরবি বাজার, হাংরিনাকিসহ অন্য উদ্যোক্তারা।

ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগ দেশে এলে বাজার বড় হবে। তাই বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করা যাবে না। আবার দেশীয় উদ্যোক্তারাও যেন সুরক্ষা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় উদ্যোগগুলোকে ভ্যাট-ট্যাক্সে ছাড়সহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। পক্ষান্তরে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ স্থানীয় কর্মী নিয়োগ, পণ্য সরবরাহে স্থানীয় সেবা নেওয়া এবং পাঁচ বছরের মধ্যে আইপিওভুক্তির শর্ত দেওয়া যেতে পারে।

 

ডিজিটাল কমার্স নীতিমালায় এখন কী আছে

►   ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তা অধিকারের বিধিগুলো মানবে।

►   পণ্যের যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

►   ওয়েবসাইটে পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করবে।

►   মার্কেটপ্লেস, উদ্যোক্তা, ডেলিভারি সিস্টেম, পেমেন্ট সিস্টেম ইত্যাদির মধ্যে যথাযথ চুক্তি করবে, যাতে ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত হয়।

►   সব ক্ষেত্রে ই-পেমেন্ট ও মোবাইল পেমেন্ট চালু করা এবং ইলেকট্রনিক লেনদেন সহজ ও নিরাপদ করার ব্যবস্থা নেবে।

►   আন্তঃব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং ডিজিটাল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (ডিএফএস) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।

►   বৈধ উপায়ে আন্তর্জাতিক অনলাইন কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ানোর জন্য ট্রাভেলার্স কোটা ও অনলাইন লেনদেনের কোটা বাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

►   তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইট বা মার্কেটপ্লেস তৈরিতে মান নিয়ন্ত্রণ করবে।

►   ডিজিটাল কমার্স-সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রমাণ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

►   ডিজিটাল কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সরকার মনোনীত সংস্থা, সংগঠন দেশের ডিজিটাল কমার্স ব্যবস্থাসংক্রান্ত কার্যক্রম কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।

►   ভোক্তাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ প্রণয়ন করা হবে।

►   লেনদেনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল স্বাক্ষর ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

►   ডিজিটাল কমার্স খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান নিয়ম মানতে হবে। তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ ছাড়া এককভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না।

►   ভবিষ্যতে নীতিমালার সংশোধন বা পরিমার্জনের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ আন্ত মন্ত্রণালয় সভার পরামর্শ নিয়ে তা কার্যকর করবে।

 



মন্তব্য