kalerkantho


মাছ চাষেও ডিজিটাল প্রযুক্তি

প্রতিনিয়ত বাড়ছে মাছের চাহিদা। আগামী দিনগুলোতে এ চাহিদা বাড়তেই থাকবে। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে তাই কম খরচে উত্পাদন বাড়ানোর পদ্ধতি খুঁজছেন আধুনিক খামারিরা। মাছের খামারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবটসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিবিসি অনলাইন অবলম্বনে লিখেছেন মিজানুর রহমান

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মাছ চাষেও ডিজিটাল প্রযুক্তি

খাবারের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয় বিশেষ অডিও প্রযুক্তিতে। ছবি : বিবিসি অনলাইন

২০১৭ সালে বিশ্ব মাছের বাজারের আকার আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার কোটি ডলারে। বিশ্বের এই মত্স্য ক্ষুধার ৮০ শতাংশ সামুদ্রিক মাছের। ঊর্ধ্বমুখী এই চাহিদার জোগান দিতে প্রয়োজন হচ্ছে ‘ওশান ফার্মিং’। সহজ কথায় সামুদ্রিক মাছের খামারের। বর্তমানে সামুদ্রিক মাছের মোট জোগানের ৫০ শতাংশ আসে ওশান ফার্মিং থেকে। জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন—ফাওয়ের ধারণা, ২০৩০ সাল নাগাদ ফার্মিং থেকেই জোগান আসবে মোট চাহিদার ৬২ শতাংশ।

সমুদ্রে ফার্মিংটা মিঠাপানির মাছ চাষের মতো নয়। আকারে যেমন এটি অনেক বিশাল, তেমনি এখানে মাছের সংখ্যাও হয় অনেক। বিপুল পরিমাণ মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিমিত খাবার দেওয়া বিশাল এক চ্যালেঞ্জ। লাখ লাখ মাছের একটি খামারে যদি কয়েক শতাংশ মাছও পরিমিত খাবারবঞ্চিত হয়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে বিশাল। সেই সঙ্গে যদি প্রতিটি মাছ ভালোভাবে বড় করে তোলা যায়, তাহলে লাভ আছে অনেক।

 

প্রযুক্তি বদলে অপচয় রোধ

প্রযুক্তির মাধ্যমেই এখন নির্ণয় করা যায় যে মাছগুলো পরিমিত খেলো কি না। এতে করে দুটি লাভ।

এক. মাছের খাবারের অপচয় রোধ।

দুই. সব মাছ পেটপুরে খেয়েছে কি না তা জানা যাবে।

সামুদ্রিক মাছের খামারে এমন প্রযুক্তি যোগ করেছে নরওয়ের খামার—লিঙ্গালাকস। ওই খামারে প্রতিবছর ৩০ লাখ স্যামন মাছ উত্পাদন হয়। এই বিপুল পরিমাণ মাছের উত্পাদনের জন্য তাদের প্রচুর খাবার ব্যবহার করতে হয়। সনাতন পদ্ধতিতে মাছের খাবার বিতরণে অপচয় হয় প্রচুর।

পূর্ববর্তী প্রযুক্তিতে পানিতে মাছের খাবারের কণার উপস্থিতি নির্ণয় করা হতো। যা থেকে ধারণা করা হতো সব মাছ খেয়েছে কি না। এ পদ্ধতি পুরোপুরি সঠিক তথ্য দিতে পারে না। কারণ সমুদ্রের পানির স্রোতে অনেক খাবার ভেসে যায়। এই অনিশ্চয়তা থেকে খাবারও দিতে হয় বেশি। এভাবে লাখ লাখ ডলার অপচয় হচ্ছে খামারের মালিক ইরল্যান্ড হুগারভোলের।

নতুন প্রযুক্তি ‘হাইড্রো অ্যাকোয়েস্টিক সিস্টেম’ ব্যবহারে অপচয় রোধ করে অন্তত ৫ শতাংশ ব্যয় কমিয়ে আনা যাবে বলে বলেছেন খামারের মালিক। শতাংশের হিসাবে বিষয়টি ছোট মনে হলেও এই ৫ শতাংশের পরিমাণ হচ্ছে ৯-১৩ লাখ ডলার।

এই প্রযুক্তিতে খাবার দেওয়ার পর স্যামন মাছগুলো দলবেঁধে খাবে। খাবারের এই প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয় বিশেষ অডিও প্রযুক্তিতে। মাছগুলো যখন খায় তখন শব্দ অনেক বেশি থাকে। খাওয়া শেষে সরে গেলে শব্দ কমতে থাকে। প্রযুক্তিটি ‘পানিতে খাদ্যকণা পর্যবেক্ষণ’ প্রযুক্তি বা প্যালেট ডিটেকটর থেকে ভিন্ন।

নরওয়ের সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্রের সহায়তায় প্রযুক্তিটির উন্নয়ন করেছে কেজআই নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্রের ওলে ফকেডাল মনে করেন, এই পদ্ধতিতে ভবিষ্যতে মাছের খাবারের সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি নির্মাণ করা সম্ভব। যেখানে মানুষ শুধু কম্পিউটারে বিষয়টির দেখভাল করলেই হবে।

সমুদ্রে স্যামন চাষের আরেক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এক ধরনের সামুদ্রিক পোকা ‘সামুদ্রিক উকুন’। এই পোকাগুলো অনেকটা জোঁকের মতো স্যামন মাছের গায়ে লেগে স্যামনের শরীরে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। উকুন আক্রান্ত মাছ খাওয়াও যায় না। উকুনের সমস্যা রোধ করার চলমান পদ্ধতি হচ্ছে সিসিটিভির দ্বারা খামার থেকে আক্রান্ত মাছ শনাক্ত করে সেটির গা থেকে উকুন সরিয়ে দেওয়া। এই পদ্ধতিকেও স্বয়ংক্রিয় করা হচ্ছে। এক প্রকারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সামুদ্রিক রোবট উকুন শনাক্ত করে সেটিকে নিজেই লেজার নিক্ষেপ করে মেরে ফেলতে পারবে। স্যামনের গায়ের আঁঁশ আলো প্রতিফলনশীল হওয়ায় লেজার প্রতিফলিত হয়, তাই মাছের কোনো ক্ষতি হবে না।

বিশ্বব্যাপী স্যামনের বাজার চাঙ্গা হওয়ায় এই মাছের উত্পাদনে প্রযুক্তির ব্যবহারও ব্যাপক হচ্ছে। লন্ডনভিত্তিক স্যামন ফার্ম হিমাং রিশি এমন একটি মেশিন তৈরি করেছে, যা স্যামনের খাবার থেকে শুরু করে প্রতিদিনের স্বাস্থ্যও দেখভাল করতে পারে।

আগামী দিনে বিশ্বে মাছের চাহিদা মেটাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের সময় যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে থাকবে, তারাই ভবিষ্যতে এগিয়ে যাবে। সমুদ্র উপকূলবর্তী সব দেশই এসব প্রযুক্তির সুফল নিতে পারে।



মন্তব্য